২০০৪ সাল।
আমার মেয়ে যখন মাতৃগর্ভে জানান দিলো, তখন আমি এবং তার মা ব্যাংককে।
বিদেশে এ উপচে পড়া আনন্দের খবর আমরা পেলাম একা। দৌড়ে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়া, বাবার জায়নামাজের পবিত্র কিনারে বসে মাথা নিচু করে আদর নেওয়া কিংবা ভাইবোনদের হাজার ওয়াটের আলোয় উদ্ভাসিত হাসি থেকে অনেক দূরে একাকী দুজন।
তখন যোগাযোগ এমন সহজ ছিল না।
আমরা আমাদের বাচ্চার পৃথিবীতে আসার রাজকীয় খবর নিজেদের মধ্যে পরম ভালোবাসায় ভাগাভাগি করে নিলাম।
তীব্র ভালো লাগার মধ্যে এমন নিঃসঙ্গ বেদনার দহন একদম অন্যরকম!
আমরা আমাদের অনাগত সন্তানের আল্ট্রাসোনোগ্রামের ফিল্মে পাওয়া আবছা ছবি বুকে নিয়ে পার করতে লাগলাম সেই দহনকাল।
প্রায় অস্পষ্ট সে ফিল্মের ছবি নিয়ে কত গবেষণা!
আমি বলি, ‘দেখ, দেখ, বাবু মনে হয় মাথা চুলকায়।’
আমার স্ত্রী লিজা বিজ্ঞের মতো উত্তর দেয়, ‘দূর, কয়েক সপ্তাহের বেবি, ওর কি হাত-পা হয়েছে নাকি, যে মাথা চুলকাবে? ও ঘুমাচ্ছে।’
আমি জোরে জোরে মাথা নাড়ি, ‘না না, মাথা চুলকায়…’
লিজা হাসে। প্রশ্রয়ের হাসি।
দুজনে গান শুনি। লিজা হঠাৎ বলে ওঠে, ‘এই বাবুর মনে হয় গান ভালো লাগছে, পা নাচায়!’
আমি বলি, ‘দূর, কয়েক সপ্তাহের বেবি…’
এভাবেই পার হয় দিনরাত্রি।
আমাদের আরও বেশ কিছুদিন ব্যাংককে থাকতে হবে। কয়েকদিন পর দেখা দিলো বিরাট সমস্যা। খাবার নিয়ে সমস্যা। লিজার স্থানীয় থাই খাবার আর ভালো লাগে না। বমি আসে। আমরা কাছেই এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় খেতে যাই। সেখানকার খাবারও গতানুগতিক। ফ্রোজেন মাছ, মাংস, সবজি। কিন্তু লিজার খেতে ইচ্ছে করে কচুশাক, টমেটো ভর্তা, শিং মাছের ঝোল, বুকফাড়া কাঁচা মরিচ ভাসছে এমন ঘন ডাল, মলা মাছের চচ্চরি। কিন্তু বিদেশ-বিভুঁইয়ে এগুলো পাবো কই?
আমার স্ত্রী খেতে পারে না, যাই খায় তার বমি আসে। আধখাওয়া অবস্থায় মন খারাপ করে দুজনেই উঠে আসি। আহা! বাড়িতে থাকলে কত কিছু রান্না হতো! যা ইচ্ছে তাই। আমাদের ওই হোটেলের খাবার খেতে ইচ্ছে করে না। তবু যেতে হয়, কারণ আমরা যেখানে থাকি সেখান থেকে অন্য বাংলাদেশী রেস্তোরাঁগুলো অনেক দূরে। সেগুলোর রান্নাও এর চেয়ে ভালো না।
একদিন খুব মন খারাপ করে খেতে গেছি, জানি, যাই দেওয়া হবে তাই খেতে পারব না। সেই তেলতেলে ফার্মের মুরগি, আলুভর্তা নামের কলঙ্ক, ডাল নামের তেলতেলে হলুদ পানি, আঁশটে গন্ধের মাছ। তারপরও যেতে হয় তাই যাওয়া।
দুজনে বেজার মুখে খাবারের অর্ডার দেব, এমন সময় চান মিয়া এগিয়ে এলেন। বয়স্ক এ ভদ্রলোক এখানকার বাবুর্চি। আমাদের চোখে দুনিয়ার সবচেয়ে অখাদ্য বাবুর্চি, যার হাতে এ হোটেলের খাবার নামের ‘কলঙ্ক’ রচিত হয়। আমাদের নিশ্চিত ধারণা, মালিক পয়সা বাঁচানোর জন্য রান্নার ‘র’ জানে না, এমন এই লোককে বাবুর্চি বলে চালিয়ে দিচ্ছে।
আমরা বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই চান মিয়া লাজুক হেসে লিজাকে বললেন, ‘মা, আপনার জন্য অল্প কচুশাক রান্না করছি, খাবেন?’
আমরা অবাক, ‘আপনি কচুশাক কেন রান্না করলেন? কোথায় পেলেন?’
‘বাবা, কাল দেখলাম, মা আপনাকে বলছেন, কচুশাক খেতে মন চায়। তাই সকালে বাজারে গিয়ে জোগাড় করছি। এখানে সব পাওয়া যায়। শুধু খুঁজতে হয়। বাচ্চা মানুষ খেতে চায়…’
গভীর কৃতজ্ঞতার সাথে মুখে নিয়ে দেখি, খুবই ভালো রান্না! এ লোক এ রান্না কীভাবে করলেন বুঝতে পারি না।
এরপর দিন আবার তিনি হাজির, ‘মাগো, অল্প শিং মাছের ঝোল রানছি, সাথে টমেটো ভর্তা।’
আরেকদিন নিয়ে এলেন বুকফাড়া কাঁচা মরিচ ভাসা ধনেপাতা মেশানো ঘন ডাল।
তারপর ছোটো মাছ।
শিম ভর্তা।
বেগুন ভাজা…
প্রতিদিন নতুন আইটেম। অমৃত।
আমরা বুঝতে পারি না এ অসম্ভব মায়াময় মানুষটা লিজার মনের কথা কীভাবে বুঝতে পারেন? এটাও বুঝতে পারি না, অপরিচিত এক তরুণী গর্ভবতী মায়ের জন্য মমতাই তাঁর রান্নার হাতকে রাতারাতি সোনা দিয়ে মুড়িয়ে দিয়েছে কি না?
যেদিন চলে আসব, তার আগের রাতে তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। তারপর কুণ্ঠিতভাবে চান মিয়ার কাছে গিয়ে কিছু ডলার দিয়ে বললাম, ‘আপনার জন্য, যদি কিছু মনে না করেন…।’
তিনি তাঁর প্রাচীন হাতে ডলারগুলো ফেরত দিয়ে লিজাকে দেখিয়ে বললেন, ‘বাবা, দেশে আমার মেয়ে গর্ভবতী। তার মা ফোনে প্রতিদিন বলে, মেয়ে এটা খেতে চায়, ওটা খেতে চায়। সে যা খেতে চায়, তাই আমি এখানে রান্না করে এ মেয়েকে খাইয়েছি। আমার প্রতিদিন মনে হয়েছে, আমার মেয়েটা খাচ্ছে। টাকা দিয়ে আমার এ আনন্দটুকু নষ্ট করবেন না বাবা।’
বলতে বলতে তাঁর কণ্ঠ থেকে ছিটকে এলো তীব্র বেদনা, ‘কতদিন মেয়েটাকে দেখি না, বড় আদরের মেয়ে…’
#আসুন মায়া ছড়াই