ডাইনিংয়ে গিয়ে অবাক হয়ে দেখি ও বিশাল এক মগ কফি নিয়ে বসে আছে। আমাকে দেখে বললো, “মর্নিং সৈয়দ।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “তুমি কখন উঠেছো?”
সে হাসতে হাসতে বললো, “সমুদ্রের তীরে বাস করে ভোরের ভার্জিন সূর্য না দেখা এক ধরনের অপরাধ মিস্টার। এখন তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করো। আমি করে ফেলেছি, তোমাকে লেফটওভার খেয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। হাহাহা।”
মেয়েটা এতো সরল! মুহূর্তেই আপন মনে হয়।
এরপর সারাদিন বিভিন্ন সরকারি অফিসে মিটিং। পলিন কোথায় কোথায় যাবে, কার সাথে কথা বলবে সব ঠিক করা হলো। ‘কোড অব কন্ডাক্ট’ নিয়ে আলোচনা করা হলো। আমার একটু অবাক লাগছিল, এগুলো তো সব আগেই ঠিক করা, তাহলে আবার এত কথা আবার বলার কী দরকার? কেউ কেউ আবার কার কত বড়ো দায়িত্ব, কতো বড়ো এলাকা তাঁকে দেখতে হয় তার ফিরস্তি ফেঁদে কয়েক ঘণ্টা খেয়ে দিলেন। এরপর সবার ছবি তোলার আবদার।
আফটার পলিন এমারসন, হলিউডের অভিনেত্রী তার সাথে একটি সেলফি ফেইসবুকে দিতে হবে না!
তবে পলিন বিরক্ত হলেও প্রকাশ করছে না, মুখে হাসি ধরে রেখেছে।
দিনভর এসব করে ঠিক হলো, পরদিন আমরা যাবো কুতুবপালং ক্যাম্পে। এরপর বাকি চারটি মেগা ক্যাম্পেও যাওয়া হবে। সাথে প্রশাসনের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। সিকিউরিটি থাকবে। পলিন সব মেনে নিলো,শুধু শর্ত দিলো, প্রতিটা ক্যাম্পে সে রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের সাথে কিছুক্ষণ একা কথা বলবে। প্রশাসন এতে প্রথমে তীব্র প্রতিবাদ করল। একা মিটিং করার অনুমতি দেওয়া যাবে না। পলিন হাসিমুখে আপত্তি শুনল, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, সৈয়দ, ইমার্জেন্সি হেলিকপ্টার রাইড পাওয়া যাবে? রেন্টেড হেলিকপ্টার?
আমি এবং অন্যরা অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলাম, তারপর জিজ্ঞেস করলাম, কেন?
“না, আমি তো তোমাদের সব শর্ত মেনে নিয়েছি। কিন্তু রোহিঙ্গাদের সাথে আমার একা কথা বলতেই হবে।
দুনিয়ার কোথাও শরণার্থীরা আশ্রয়দাতাদের সামনে সবকিছু বলে না। তাদের একান্ত কিছু কথা থাকে তা অন্যদের সামনে বলার সাহস তাদের থাকে না। তাই আমার একাকী তাদের কথা শুনতেই হবে। এটা আমরা আগেই বলে দিয়েছিলাম। তা যখন হচ্ছে না, তখন দ্রুত ফিরে যাওয়াই ভালো। সমস্যা হচ্ছে আমার সাথে মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবও ফিরে যাবে। কী আর করা।
তবে টাকাটা ফেরত যাওয়ার জন্য কিন্তু তোমরা দায়ী, আমি নই।”
হঠাৎ করেই তার চেহারায় বুনো কাঠিন্য ফুটে উঠেছে।
এরপর স্থানীয়দের আপত্তি উবে গেলো। আপত্তিটা করাই উচিত হয়নি। আসলেই পলিনের টার্মস অব রেফারেন্সে এটা বলা ছিল। শুধু শুধু ক্ষমতা দেখানোর জন্যই ঝামেলা করা হয়েছিল। যেমন ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে আমরা চেয়ারের পিঠে ময়লা তোয়ালে ঝুলিয়ে রাখি অনেকটা সেরকম।
অবশেষে পলিনের শর্তই মেনে নেওয়া হল।
গাড়িতে উঠে বললাম, “তুমি যে এত জেদি তা কিন্তু আগে বুঝিনি।”
ও হাসতে হাসতে বললো, ” টাফ না হলে মেয়েরা দুনিয়ায় কোথাও কাজ করে শান্তি পায় না।” তারপর কিছুটা রহস্যমাখা হাসি হেসে বলল, ” সবাই রাতের নির্জনতায় একটি মেয়ের সাথে সাঁতার না কাটার মতো ব্রহ্মচারী নয়।”
আমি কিছু না বোঝার ভান করে চুপ করে রইলাম।
পরদিন আমরা গেলাম কুতুবপালং ক্যাম্পে। ওখানে গিয়ে দেশহারা মানুষগুলোর চেহারা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল। আহ! কী অবস্থায় পড়লে কিছু মানুষ ভিটেমাটি ছেড়ে আরেক দেশের ক্যাম্পে আশ্রয় নেন তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
পলিন ঘুরে ঘুরে ক্যাম্পের অনেকের সাথে কথা বলল। আমি করছি অনুবাদকের কাজ। কারণ রোহিঙ্গাদের ভাষার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার অনেক মিল। আমাদের সাথে স্থানীয় চেয়ারম্যান সাহেব আছে। তিনিও সাহায্য করছেন। শফিক নামের প্রশাসনের তরুণ ম্যাজিস্ট্রেটও দেখলাম খুবই নিবেদিত।
ক্যাম্পের বাচ্চারা আমাদের পেছন পেছন ঘুরছে। কারণ চকোলেট। পলিন তার ব্যাকপ্যাক ভর্তি ও জিনিস এনেছে। সেগুলো বাচ্চাদের মাঝে মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। একটু পর দেখি ওর কাঁধে তিন চার বছরের একটি শিশু খিলখিল করে হাসছে। এরপর শুরু হলো বাচ্চাদের কোল বদল। সবাই মেম সাহেবের কোলে উঠতে চায়। মাঝখানে ম্যাজিস্ট্রেট ছেলেটি একবার আমতা আমতা করে বললো, বাচ্চাগুলো বিভিন্ন রোগে ভুগছে, ওদের কোলে নেয়াটা বোধহয় ঠিক হচ্ছে না। আমিও তাই ভাবছিলাম।
পলিনকে ব্যাপারটি বলতেই ও হেসে উত্তর দিল,
“যার কথা বলছি আমি তাঁর পায়ের নখেরও যোগ্য নই। কিন্তু বলো তো, সারাজীবন কুষ্ঠ রোগীদের সেবা করে মাদার তেরেসার কি ঐ রোগ হয়েছিল? হয়নি। ভালোবাসতে হলে ঝুঁকি নিতে হয়, তুমি যদি ফুলের আসল গন্ধ নিতে চাও, তবে কাদা মাড়িয়ে বাগানে নামতে হবে। দোতলার বারান্দায় বসে ঐ গন্ধ তু্মি পাবে না। লাভ ম্যাটারস হিয়ার, ডিয়ার ফ্রেন্ড।”
বলেই সে আরেকটি বাচ্চাকে কাঁধে নিয়ে উঁচু স্বরে গান ধরলো,
“ওল্ড ম্যাকডোনাল্ড হ্যাড আ ফার্ম—–“