দেশের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দের একটি বড় অংশই পরামর্শকদের পকেটে চলে যাওয়ার পুরোনো ও বিতর্কিত সংস্কৃতি যেন কোনোভাবেই থামছে না। প্রকল্প কারিগরি হোক কিংবা অবকাঠামোগত, পরামর্শক খাতের এই বিপুল ব্যয় বরাবরের মতোই প্রশ্নের জন্ম দেয়। এবার জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং পরিবেশ-বান্ধব টেকসই নগর গড়ে তোলার মহৎ লক্ষ্য নিয়ে দেশের চারটি পৌরসভাকে ঘিরে সরকারের নেওয়া একটি বিশেষ প্রকল্পে চরম অস্বাভাবিক ও বিস্ময়কর ব্যয়ের চিত্র সামনে এসেছে। অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৬৫ দশমিক ৫১ শতাংশ অর্থই সরাসরি বরাদ্দ রাখা হয়েছে দেশি ও বিদেশি পরামর্শকদের পেছনে। ফলে জলবায়ুর অভিঘাত সামাল দিতে বাস্তবমুখী অবকাঠামো তৈরি ও নাগরিক সেবা উন্নয়নের চেয়ে কাগুজে পরামর্শে বিপুল অর্থ ব্যয়ের এই পরিকল্পনা নীতি নির্ধারক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মাঝে গভীর অস্বস্তি ও তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উদ্যোগে প্রস্তাবিত এই উন্নয়ন প্রকল্পটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইনোভেশন ফর ক্লাইমেট স্মার্ট আরবান ডেভেলপমেন্ট’। সরকারের পক্ষে প্রকল্পটি মাঠপর্যায়ে সরাসরি বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব পেয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি। পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের পক্ষ থেকে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির বা একনেকের জন্য প্রস্তুতকৃত প্রকল্পের পুঙ্খানুপুঙ্খ সারসংক্ষেপ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে যে পুরো প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৭ কোটি ৪০ লাখ ২০ হাজার টাকা। অত্যন্ত লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বিশাল অঙ্কের সমুদয় অর্থই বৈদেশিক অনুদান হিসেবে জোগান দেবে জার্মান সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জিআইজেড। বাংলাদেশ সরকার ও জিআইজেডের মধ্যে এ সংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছিল বিগত বছরের ১০ এপ্রিল তারিখে।
তবে এই অনুদানের অর্থের সিংহভাগ কীভাবে খরচ হবে, তার বিস্তারিত খতিয়ান দেখে চোখ কপালে ওঠার উপক্রম হয়েছে পরিকল্পনা কমিশন সংশ্লিষ্টদের। মোট ৮৭ কোটি ৪০ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ৫৭ কোটি ২৬ লাখ টাকাই বরাদ্দ রাখা হয়েছে কেবল পরামর্শক সেবার পেছনে। সহজ গাণিতিক হিসাবে দাঁড়াচ্ছে যে এই প্রকল্পের প্রতি ১০০ টাকা ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৬৬ টাকাই খরচ হয়ে যাবে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের বেতন, পরামর্শ ফি ও আনুষঙ্গিক সুবিধায়। আর অবশিষ্ট মাত্র ৩৪ টাকা দিয়ে চার পৌরসভার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ এবং আসল নাগরিক সুবিধার ১২টি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের মতো জটিল কর্মকাণ্ড সম্পাদন করার অবাস্তব ছক কষা হয়েছে।
পরামর্শক ব্যয়ের অভ্যন্তরীণ বিভাজনটিও বেশ চমকপ্রদ ও বিশদ। প্রকল্পের নথি থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পরামর্শক খাতের মোট ৫৭ কোটি ২৬ লাখ টাকার মধ্যে জাতীয় বা স্থানীয় পরামর্শক সেবার জন্য নির্ধারিত রাখা হয়েছে ৪০ কোটি ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা। আর আন্তর্জাতিক পরামর্শকদের পেছনে ব্যয় করার পরিকল্পনা করা হয়েছে ১৬ কোটি ৫৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের জন্যও বরাদ্দ রাখা হয়েছে অবিশ্বাস্য অঙ্কের অর্থ। জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্র ঝুঁকিতে থাকা তৃণমূলের সাধারণ মানুষ যেখানে ড্রেনেজ, সুপেয় পানি ও জলাবদ্ধতার সংকটে দিনাতিপাত করছে, সেখানে পরামর্শকদের পেছনে এই ধরনের রাজকীয় খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে এখন বিভিন্ন মহলে জোরালো প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
অনুমোদিত প্রকল্পের নথিপত্র অনুসারে, জলবায়ু ঝুঁকির মাত্রা বিবেচনায় নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের উত্তরাঞ্চলের চারটি পৌরসভাকে মূল কার্যক্রমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে। এই চারটি পৌরসভা হলো—চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভা, গাইবান্ধা পৌরসভা এবং সিরাজগঞ্জ পৌরসভা। এসব পৌর এলাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট অভিঘাতগুলো শনাক্ত করা, স্থানীয় পর্যায়ের উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সেগুলো বাস্তবায়নে টেকনিক্যাল সহায়তা দেওয়া হবে। এই চার পৌরসভায় সর্বসাকুল্যে মাত্র ১২টি ক্ষুদ্র পাইলট প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যার অর্থ প্রতিটি পৌরসভা গড়ে মাত্র তিনটি করে পাইলট প্রকল্প পাবে। এছাড়া পৌরসভার মেয়র, কাউন্সিলর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বিস্তৃতির অংশ হিসেবে উত্তরাঞ্চলের ক্লাস্টার পদ্ধতিতে আরও চারটি পৌরসভাকে ‘মাল্টিপ্লায়ার শহর’ বা সম্প্রসারণমূলক নগর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই চারটি পৌরসভা হলো বরগুনা, কুড়িগ্রাম, কুষ্টিয়া এবং নাটোর পৌরসভা। জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় পরবর্তীতে এই শহরগুলোতে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কাজ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হলেও সেখানে কোনো দৃশ্যমান অবকাঠামোগত উন্নয়ন হবে কি না, তা নিয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। ফলে স্থানীয় জনগণ আদৌ কোনো বাস্তব সেবা পাবে নাকি পুরো বিষয়টি কেবল সেমিনার, কর্মশালা আর কাগুজে প্রতিবেদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সেই সংশয় দূর হচ্ছে না।
প্রকল্পটির অনুমোদিত মেয়াদকাল পর্যালোচনায় আরও একটি বড় ধরনের অসঙ্গতি ও দীর্ঘসূত্রতা ধরা পড়েছে। প্রাথমিক কারিগরি প্রকল্প প্রস্তাবনা বা টিএপিপি অনুযায়ী, এই পাইলট প্রকল্পটি ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে সমাপ্ত করার কথা ছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের পর সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। নতুন সুপারিশ অনুসারে প্রকল্পের মেয়াদ তিন বছর পিছিয়ে ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ মূল সময়সূচির তুলনায় প্রকল্পটির শুরুতেই প্রায় দেড় বছরের একটি বড় বিলম্ব ঘটে গেছে।
পরামর্শকদের পেছনে এমন অস্বাভাবিক বরাদ্দের পক্ষে প্রকল্পের পটভূমিতে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তি তুলে ধরেছে বাস্তবায়নকারী সংস্থা এলজিইডি। তাদের দাবি, জলবায়ু সহনশীল নগর গড়ার বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে নানা জাতীয় কৌশল ও নীতিমালা থাকলেও তৃণমূল বা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে তার প্রায়োগিক ঘাটতি রয়েছে। ছোট ও মাঝারি পৌরসভাগুলোর নিজস্ব কোনো কারিগরি দক্ষতা বা উদ্ভাবনী সক্ষমতা নেই বললেই চলে। এছাড়া পৌরসভার টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটি বা টিএলসিসি এবং অন্যান্য স্থায়ী কমিটিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা দূর করতে বিশেষজ্ঞদের নিবিড় দিকনির্দেশনা প্রয়োজন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সক্ষমতা বাড়ানোর যুক্তি দিয়ে মোট বাজেটের দুই-তৃতীয়াংশ অর্থ পরামর্শকদের পকেটে তুলে দেওয়া কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এই প্রকল্পের কোনো পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা যাচাই বা ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনা করা হয়নি। একনেকের সারসংক্ষেপে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্ধারিত কলামে সরাসরি ‘প্রযোজ্য নয়’ লিখে দায়সারাভাবে পার পাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে যে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস বা সিইজিআইএস-এর মাধ্যমে একটি প্রাথমিক নগর নির্বাচন সমীক্ষা চালানো হয়েছে এবং সেই রিপোর্টের ভিত্তিতেই ঝুঁকিপ্রবণতা দেখে এই পৌরসভাগুলো নির্বাচন করা হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়া এত বড় অঙ্কের পরামর্শক বাজেট চূড়ান্ত করাকে বিশেষজ্ঞরা চরম অনিয়ম হিসেবে দেখছেন।
পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নেও সতর্কতামূলক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। কমিশনের মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে যে জলবায়ু মোকাবিলায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি অবশ্যই প্রয়োজনীয়, কিন্তু এই প্রকল্পের সামগ্রিক সাফল্য ও সার্থকতা নির্ভর করবে বরাদ্দের বিপরীতে তৃণমূলের মাটিতে কতটা কার্যকর পরিবর্তন আসছে তার ওপর। প্রায় ৮৭ কোটি টাকার প্রকল্পে যেখানে ৫৭ কোটি টাকাই যাবে পরামর্শকদের পকেটে, সেখানে মাত্র ১২টি পরীক্ষামূলক কাজের মাধ্যমে সাধারণ করদাতা ও নাগরিকদের কী উপকার হবে, তা প্রকল্প বাস্তবায়ন পর্যায়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে জবাবদিহিতার আওতায় আনা অপরিহার্য।
সরকারি ও বেসরকারি জলবায়ু বিশ্লেষকদের অভিমত হলো, বাংলাদেশে জলবায়ু অর্থায়নের নামে এমন ‘উপদেষ্টানির্ভর প্রকল্প’ অতীতেও বহুবার হয়েছে যা স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের কোনো উপকারে আসেনি। জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা বরগুনা, গাইবান্ধা কিংবা সিরাজগঞ্জের মতো নদীতীরবর্তী শহরগুলোর প্রধানতম সংকট হলো অতিবৃষ্টিতে সৃষ্ট তীব্র জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব এবং সুপেয় পানির তীব্র সংকট। এই ধরনের মৌলিক নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধান করতে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিভিল অবকাঠামো ও কার্যকর সরঞ্জাম সরবরাহ। কোটি কোটি টাকা খরচ করে দামি পরামর্শক এনে কেবল পরিকল্পনা তৈরি করলেই মাটির বাস্তবতা বদলায় না।
পরিশেষে বলা যায় যে বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের অনুদানের অর্থও কিন্তু আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জলবায়ু তহবিল হিসেবেই গণ্য হয়। তাই এই মূল্যবান সম্পদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। পরামর্শক নির্ভরতা কমিয়ে মূল বরাদ্দ যদি পৌরসভাগুলোর টেকসই ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক, খাল খনন, সবুজায়ন ও পানি শোধনাগারের মতো দৃশ্যমান কাজে ব্যয় করা না হয়, তবে এই ধরনের প্রকল্প কেবল একশ্রেণির পরামর্শক ও আমলাদের পকেট ভারী করবে, আর জলবায়ুর চরম ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক নগরবাসী আগের মতোই চরম দুর্ভোগ ও বঞ্চনার শিকার হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত