লাতিন সুরের মূর্ছনা, মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী নাচ আর পপ সম্রাজ্ঞী শাকিরার জমকালো পারফরম্যান্সের মধ্য দিয়ে পর্দা উঠেছে মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় যৌথভাবে আয়োজিত বিশ্ব ফুটবলের মহাযজ্ঞের। চার বছর পর পর আসা এই ফুটবলীয় উন্মাদনায় মেতে উঠেছে গোটা বিশ্ব। তবে মাঠের খেলা গড়ানোর সাথে সাথেই টুর্নামেন্টের জমকালো আবহকে কিছুটা মলিন করে দিয়েছে গ্যালারির ফাঁকা আসনের দৃশ্য এবং টিকিটের আকাশচুম্বী দাম। উত্তর আমেরিকা মহাদেশের এই যৌথ আসরে ফিফার বাণিজ্যিক কৌশল ও অতিরিক্ত মুনাফা লোটার নীতি এখন তীব্র বিতর্কের মুখে পড়েছে, যা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকেও নেতিবাচক মন্তব্য এসেছে।
আসরের প্রথম ম্যাচে মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার উদ্বোধনী লড়াইয়ে ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামে ৮০ হাজারেরও বেশি দর্শকের সমাগম হলেও পরবর্তী ম্যাচগুলোতেই ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। গুয়াদালাহারায় দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের মধ্যকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচে অফিশিয়ালি ৪৪ হাজার ৯৮৫ জন দর্শক উপস্থিত ছিলেন বলে ফিফা দাবি করেছে। তবে টেলিভিশন সম্প্রচার এবং মাঠে উপস্থিত সংবাদকর্মীদের চোখে ধরা পড়েছে স্টেডিয়ামের একাধিক সারির ফাঁকা আসন। ৪৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার এই ভেন্যুতে এমন ফাঁকা গ্যালারি ফুটবলপ্রেমীদের অবাক করেছে। মাঠে আসা সাধারণ সমর্থকরা স্পষ্টভাবেই জানিয়েছেন, টিকিটের চড়া মূল্যের কারণেই সাধারণ ফুটবলপ্রেমীরা মাঠে আসার আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এবারের আসরে টিকিটের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এতটাই সুদূরপ্রসারী যে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই নিয়ে নিজের অসন্তোষ লুকিয়ে রাখেননি। এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প সরাসরি জানান, নিজ দেশে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ বা যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ম্যাচ মাঠে বসে দেখার জন্য তিনি ১ হাজার ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজার টাকা) বা তার বেশি খরচ করতে মোটেও রাজি নন। মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন মন্তব্য প্রমাণ করে যে, এবারের বিশ্বকাপের টিকিট সাধারণ বা মধ্যবিত্ত সমর্থকদের ক্রয়ক্ষমতার কতটা বাইরে চলে গেছে। এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে ফিফার প্রাইসিং পলিসি বা মূল্য নির্ধারণ নীতির ওপর বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
বিশ্বকাপের টিকিটের দাম নিয়ে ইউরোপ এবং লাতিন আমেরিকার সমর্থক গোষ্ঠীগুলো ফিফার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) এক বিবৃতিতে ফিফার এই বাণিজ্যিক নীতিকে সাধারণ ফুটবল সমর্থকদের প্রতি সরাসরি ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ফাইনাল ম্যাচের সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির টিকিটের দাম যেখানে ছিল ১ হাজার ৬০০ ডলার, এবার উত্তর আমেরিকার এই আসরে সেই ফাইনালের টিকিটের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১১ হাজার ডলারে (প্রায় ১৩ লাখ টাকা)। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে টিকিটের দামের এই নজিরবিহীন জ্যামিতিক বৃদ্ধিকে ফুটবলকে কর্পোরেটদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার শামিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বজুড়ে আকাশচুম্বী টিকিটের দাম এবং ফাঁকা গ্যালারি নিয়ে তুমুল সমালোচনা চললেও নিজের বাণিজ্যিক কৌশলের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, অলিম্পিক বা সুপার বোলের মতো বিশ্বের অন্যান্য বড় বড় ক্রীড়া ইভেন্টের টিকিটের দামের সাথে তুলনা করলে বিশ্বকাপের টিকিটের মূল্য মোটেও বেশি নয়, বরং একই পর্যায়ে রয়েছে।
ইনফান্তিনো আরও তথ্য দেন যে, টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার আগেই বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬০ লাখের (৬ মিলিয়ন) বেশি টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে, যা আমেরিকার তিন দেশে ফুটবল নিয়ে মানুষের ব্যাপক আগ্রহের প্রমাণ। তার দাবি অনুযায়ী, এবার টিকিটের বৈশ্বিক চাহিদা আগের চেয়ে প্রায় ‘১০ গুণ বা তারও বেশি’ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে ফিফা প্রধানের এই দাবিকে বাস্তবতাবিবর্জিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন ফুটবল সমর্থকরা। তাদের মতে, বিপুল চাহিদা থাকার পরেও যদি গ্যালারি ফাঁকা থাকে, তবে বুঝতে হবে সাধারণ টিকিট কালোবাজারি ও কর্পোরেট স্পন্সরদের পকেটে গেছে, যা আসল ফুটবলপ্রেমীদের মাঠ থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
ফুটবলকে সবসময় বলা হয় সাধারণ মানুষের খেলা। কিন্তু উত্তর আমেরিকার এই বিশ্বকাপে গ্যালারির যে চিত্র দেখা যাচ্ছে, তাতে স্পষ্ট যে খেলাটি এখন কেবল উচ্চবিত্ত ও কর্পোরেটদের বিনোদনের মাধ্যমে পরিণত হচ্ছে। মেক্সিকো বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সাধারণ মানুষের গড় আয়ের তুলনায় টিকিটের ন্যূনতম মূল্যও অনেক বেশি। ফলে নিজের দেশের খেলা দেখার জন্য মাসের পর মাস জমানো টাকা শেষ করে দিতে হচ্ছে ভক্তদের। যাতায়াত, আবাসন এবং স্টেডিয়ামের ভেতরের অন্যান্য খরচের সাথে টিকিটের এই আকাশছোঁয়া দাম যোগ হয়ে ফুটবল ম্যাচ দেখতে যাওয়া এখন ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। ফুটবল বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ফিফা যদি অনতিবিলম্বে তাদের এই একচেটিয়া মুনাফামুখী নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তবে আগামী ম্যাচগুলোতে গ্যালারির শূন্যতা আরও বাড়বে, যা বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টের চিরন্তন সৌন্দর্য ও আবেগকে চিরতরে নষ্ট করে দেবে।