আপনারা যারা নিয়মিত আমার লেখা পড়েন তাঁদের অনেকের ধারণা হতে পারে আমি মোটামুটি ত্রুটিমুক্ত মানুষ। বাস্তবতা হচ্ছে, লেখক তাঁর লেখার মতো চমৎকার নাও হতে পারেন। আমার ক্ষেত্রেও তাই। আপনাদের জানার অধিকার আছে, কার লেখা আপনারা পড়ছেন? তিনি যা বলেন তা কি নিজে চর্চা করেন? ব্যাপারটি ক্লিয়ার করার জন্যই এ আত্মসমালোচনা। তবে আমি চেষ্টা করছি ত্রুটিগুলো কাটিয়ে ওঠার।
ঠান্ডা মাথার মানুষ হলেও আমি মাঝে মাঝে খুব রেগে যাই। এধরনের রাগ সম্পর্কের জন্য হুমকি। রাগান্বিত অবস্থায় বলা একটি বাক্যই সারা জীবনের জন্য সম্পর্ক নষ্ট করে দিতে পারে। অনেককিছুই ফেরত নেওয়া যায়, কিন্তু মুখ থেকে বের হওয়া শব্দ ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। রাগের কারণে আমি খুব আফসোসবোধ করি। তাহলে কি একেবারেই রাগ করব না? করব। মাঝে মাঝে রাগও দেখাতে হয়। এক্ষেত্রে আব্বার কথা খুব মনে পড়ে। তিনি যখন খুব রেগে যেতেন, তখন শীতল কণ্ঠে বলতেন, ‘ইট’স অ্যান অর্ডার।’ সাথে সাথে আমরা বুঝে যেতাম আর কোনো কথা চলবে না। তাঁর নির্দেশ আমাদের শুনতেই হবে। আসলে রাগ ভদ্রভাবে ঠান্ডা গলায়ও প্রকাশ করা যায়। চেঁচামেচি করা লাগে না। আমি সে চেষ্টাই করছি।
২। গীবত না করা, কিন্তু শোনা।
বেশ কয়েকবছর আগে আমার বন্ধু আশিক ইমরানের অফিসে একটি নোটিশ দেখতে পেয়েছিলাম। তাতে লেখা ছিল, ‘এখানে গীবত করা এবং শোনা হয় না।‘ এ বাক্যটি আমাকে ভালোই ধাক্কা দিয়েছিল। তারপর থেকে আমি এ ত্রুটি কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি। গীবত করার সমস্যা কাটাতে পেরেছি। এটা আমি ভুলেও করি না। তবে শোনার ব্যাপারটা পুরোপুরি কাটাতে পারিনি। অনেক সময় ভদ্রতার কারণে মানা করতে পারি না। এটি আমার অনেক বড় দোষ । তবে তা কাটিয়ে উঠার চেষ্টা করছি।
আমরা অনেকেই অন্যকে খাটো করে দেখি। তাদের পাত্তা দেই না। এতে মানুষটিকে অপমান করা হয়। আমরা ভাবি না যে, যাকে খাটো করছি, তাঁর হয়ত এমন কোনো জ্ঞান আছে যা আমার নেই। কিছুদিন আগে আমি সাইকেল চালানোর সময় ট্রাককে সাইড দেওয়ার সময় ভুল করলে একজন রিকশাচালক বলেছিলেন, ‘আপনি তো রাস্তার মাপই বুঝেন না। আরেকটু হলে গেছিলেন।‘ এটি আমার জন্য একটি হিরন্ময় শিক্ষা। আসলেই তো একজন অভিজ্ঞ রিকশাচালকের রাস্তার ব্যাপারে যে জ্ঞান, তা আমার নেই। সেদিন থেকে আমি শিক্ষা নিয়েছি, কোনোদিন কাউকে খাটো চোখে দেখব না। এ সমস্যা আমার কিছুটা আছে। আমার মেয়েও তাই মনে করে।।তার ভাষ্য অনুযায়ী কারো কথাবার্তা পছন্দ না হলে আমি তাকে পাত্তা দেই না। তার মতে এটি আমার অন্যতম ত্রুটি। আমি তার সাথে একমত।
এ সমস্যা আমার খুব বেশি আছে। সামাজিক অনুষ্ঠানে তেমন যাই না। কিছুদিন আগে আমার খুব প্রিয় একজন বলেছিলেন, ‘তুমি কেউ দাওয়াত দিলে যেতে চাও না। কিন্তু অনিবার্য কারণ ছাড়া যাওয়া উচিত। কারণ যিনি দাওয়াত দেন, তিনি তোমাকে ভালোবেসে দাওয়াত দেন।’ কথাটি খুব সত্যি। এ দোষ আমার কাটানো উচিত। চেষ্টা করছি কাটানোর। মানুষের ভালোবাসার মূল্য অপরিসীম। সেটা শোধ করার চেষ্টা করা উচিত। কারো দাওয়াত অবজ্ঞা করে এ ভালোবাসাকে অপমান করা ঠিক নয়। (তবে অতি ব্যয়বহুল বিয়ে বা এজাতীয় অনুষ্ঠানকে আমি নিরুৎসাহিত করি। তাই সেখানে যাবো না।এগুলো অপচয়মাত্র।)
৫। মলাট দেখে বই বিচার করা।
সদ্য চাকরিতে জয়েন করার পর দেখতাম, একজন অধীনস্থ ভদ্রলোকের কাছে বিভিন্ন ধরনের লোক আসত। এলেবেলে টাইপ লোক বেশি। একদিন তাঁকে ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনার কাছে দুনিয়ার লোক আসে, কাজ করেন কখন?‘ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এরা সব ভুখা মানুষ, স্যার। আমি এলাকার হোটেল মালিকদের অনুরোধ করে তাদের বিনামূল্যে খাওয়ার ব্যবস্থা করি। অফিস সময় শেষে কয়েকঘণ্টা বেশি কাজ করে এর জন্য যে সময় ব্যয় হয় তা পুষিয়ে দেই।’
সৈয়দ আহমদ নামের সে ভদ্রলোক আমাকে সেদিন শিখিয়েছিলেন, বাইরের রূপ দেখেই একজন মানুষ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলা ঠিক নয়। সৈয়দ সাহেবের শিক্ষা যে আমাকে শতভাগ এ দোষমুক্ত করেছে তা নয়। তবে চেষ্টা করছি। হয়ত একদিন মলাট দেখে বই বিচারের ত্রুটি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারব।
অহংকার ব্যাপারটি আমি খুব অপছন্দ করি। নির্মম সত্য হলো আমার স্ত্রী মাঝে মাঝে বলেন, ‘তোমার মধ্যে সুক্ষ্ম অহংকার আছে। খুব খেয়াল করলে তা বোঝা যায়।’ আমি একটু অবাক হলেও মেনে নিলাম। কারণ স্বামীর জন্য সবচে খাঁটি আয়না হচ্ছে স্ত্রী। সেখানে ভুল কিছু প্রতিফলিত হয় না। আমি খুব চেষ্টা করছি এ সমস্যা কাটাতে। অহংকার বাকি সব গুণকে বাতিল করে পতন ঢেকে আনে।
Dawn Brown- এর লেটেস্ট বই The Secret of Secrets এর কয়েকটি বাক্য আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
When you die. You die.
Full Stop.
মৃত্যু মানে ফুলস্টপ। পৃথিবীতে আমার জীবনের আর পুনরাবৃত্তি হবে না। এই একটি মাত্র জীবন ত্রুটির মোড়কে কাটানো খুব দুর্ভাগ্যের ব্যাপার।
আমার ত্রুটিগুলো তো জানলেন। এখন সিদ্ধান্ত নিন আমার লেখা পড়বেন কিনা?