• সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫৭ পূর্বাহ্ন

আরাকান আর্মির উত্থানে কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ?

Reporter Name / ৩ Time View
Update : সোমবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের সুনীল জলরাশি আর পৃথিবীর দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন বালুকাবেলা ঘিরে গড়ে ওঠা পর্যটন নগরী কক্সবাজারকে একসময় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার হিসেবেই দেখত বিশ্ব। এমনকি নিকটবর্তী প্রবালসমৃদ্ধ ছোট্ট সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিও পরিচিত ছিল সাধারণ মানুষের অবকাশযাপনের কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এই শান্ত জলসীমাকে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর তীব্র সামরিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের এক উত্তপ্ত কেন্দ্রস্থলে পরিণত করেছে। একদিকে ওয়াশিংটনের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ও সমুদ্রপথে নজরদারির গভীর আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বেইজিংয়ের উচ্চাভিলাষী বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সমুদ্র সংযোগের অবিচ্ছেদ্য পথ হিসেবে বঙ্গোপসাগর আজ আধিপত্য বিস্তারের দাবার বোর্ডে পরিণত হয়েছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষণে ভারত ও জাপানের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর দৃষ্টিও এই সমুদ্রসীমায় নিবদ্ধ। তবে বৈশ্বিক এই পরাশক্তিদের ক্ষমতার মহড়ার ভিড়ে যে বিষয়টি বাংলাদেশ ও পুরো অঞ্চলের জন্য সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, তা হলো ঠিক সীমান্ত লাগোয়া মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা। নাফ নদীর ওপারে প্রতিনিয়ত তৈরি হতে থাকা চরম বিশৃঙ্খলা কার্যত কক্সবাজার ও সংলগ্ন অঞ্চলকে এক জীবন্ত টাইম বোমার ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

রাখাইন বা প্রাচীন আরাকানের এই অস্থিরতা কেবল মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ নয়, বরং এর প্রতিটি সংঘাতের প্রত্যক্ষ ধাক্কা এসে পড়ছে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে। এই ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে গভীরভাবে বুঝতে হলে পেছন ফিরে তাকাতে হবে শতাব্দী প্রাচীন জাতিগত সংঘাত ও সাম্প্রতিক সশস্ত্র উত্থানের দিকে। ২০১২ সালের জুন মাসে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া দাঙ্গা এই অঞ্চলে নতুন করে রক্তপাতের সূচনা করেছিল। সেই সংঘাতের জেরে শতাধিক প্রাণহানি এবং লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার পর তৎকালীন সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের অধীনে সেনাবাহিনী গোটা রাজ্যে কার্যত সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তবে এই সংকটের সমান্তরালে আড়ালে বিকশিত হচ্ছিল অন্য এক সশস্ত্র শক্তি। ২০০৯ সালের এপ্রিলে কাচিন রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মাত্র ছাব্বিশ জন উদ্যমী তরুণকে নিয়ে স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে যাত্রা শুরু করেছিল আরাকান আর্মি। শুরুর সেই ক্ষুদ্র দলটিই পরবর্তী দেড় দশকে এক অবিশ্বাস্য রূপান্তরের মধ্য দিয়ে ৫০ হাজারের বেশি প্রশিক্ষিত ও অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত এক দুর্ধর্ষ বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।

২০১৫ সালে কাচিন থেকে নিজেদের আদি জন্মভূমি রাখাইনে প্রবেশের পর দ্রুত জনসমর্থন ও শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে আরাকান আর্মি। ২০১৬ সালের শেষভাগে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী সংগঠন আরসার সংঘাতের সূত্র ধরে ২০১৭ সালে বর্মী জান্তা বাহিনী যখন ইতিহাসের অন্যতম বর্বরোচিত রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ শুরু করে, তখন আরাকান আর্মি সেই বিশৃঙ্খলার চরম সদ্ব্যবহার করে। সেনাবাহিনী যখন সাধারণ রোহিঙ্গাদের দেশছাড়া করতে ব্যস্ত ছিল, তখন আরাকান আর্মি লোকচক্ষুর অন্তরালে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে নিজেদের সামরিক ঘাঁটি ও গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক মজবুত করে। ২০১৯ সালে মিয়ানমার সীমান্ত পুলিশের ওপর সরাসরি হামলা চালালে জান্তা সরকার দলটিকে নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে জাপানের মধ্যস্থতায় সাময়িক যুদ্ধবিরতি হলেও ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর সামগ্রিক দৃশ্যপট দ্রুত বদলে যায়। ২০২৩ সালের শেষের দিকে বহুল আলোচিত ‘অপারেশন ১০২৭’ শুরুর মধ্য দিয়ে আরাকান আর্মি জান্তা বাহিনীর ওপর এক নজিরবিহীন সর্বাত্মক আক্রমণ শানায়। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের চলমান সংঘাতের ভেতর দিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে পুরোপুরি কোণঠাসা করে আজ রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশ ভৌগোলিক ভূখণ্ডের ওপর নিজেদের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে তারা, আর নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে জান্তা বাহিনী এখন কেবল বিমান ও ড্রোনের এলোপাতাড়ি হামলার ওপর নির্ভর করছে।

রাখাইনজুড়ে আরাকান আর্মির এই নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ বাংলাদেশের জন্য এক বহুমুখী ও অভূতপূর্ব সীমান্ত নিরাপত্তার সংকট ডেকে এনেছে। ২০১৭ সালের আগস্টে জান্তার নির্মম দমন-পীড়নের মুখে সাত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর বর্তমানে বাংলাদেশে আশ্রিত শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ লাখের বেশি। দীর্ঘ কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ সত্ত্বেও একজন রোহিঙ্গাকেও তাদের পৈতৃক ভিটায় ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগরের জলসীমায় আরাকান আর্মির আগ্রাসী তৎপরতা। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে বিভক্তকারী নাফ নদী এবং উপকূলীয় সমুদ্রসীমাকে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শনের মহড়াস্থল বানিয়ে তুলেছে সংগঠনটি। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত নাফ নদী ও সমুদ্রের মোহনা থেকে মাছ ধরার সময় ২২২ জন নিরীহ বাংলাদেশি জেলেকে অস্ত্রের মুখে অপহরণ করে নিয়ে যায় আরাকান আর্মির বিদ্রোহীরা। পরবর্তীতে বিজিবির কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক মধ্যস্থতায় ১৫৭ জন জেলেকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনো অন্তত ৬৫ জন হতভাগ্য জেলে আরাকান আর্মির বন্দিশালায় চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও সংলগ্ন উপকূলীয় এলাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও জীবিকা আজ এই সশস্ত্র গোষ্ঠীর বন্দুকের নলের মুখে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

সীমান্তের এই বাহ্যিক সামরিক উত্তেজনার চেয়েও বড় অশনিসংকেত তৈরি হয়েছে কক্সবাজার ও উখিয়ার শরণার্থী শিবিরগুলোর ভেতরে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে উখিয়া, টেকনাফ ও নোয়াখালীর ভাসানচরের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো এখন বিভিন্ন চরমপন্থী ও সশস্ত্র অপরাধী গোষ্ঠীর রক্তক্ষয়ী সংঘাতের রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। আরসা ও আরএসও-র মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো ক্যাম্পের অভ্যন্তরে আধিপত্য বিস্তার, চাঁদা আদায় এবং নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের খেলায় লিপ্ত। প্রতিনিয়ত ক্যাম্পের ভেতর গোলাগুলি, অপহরণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে। বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষকে পুঁজি করে এসব সংগঠন বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চলকে ব্যবহার করে মিয়ানমারে নতুন যুদ্ধ শুরুর পাঁয়তারা চালাচ্ছে। ফলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের বলি হয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে অনিচ্ছাকৃতভাবে এক সশস্ত্র সংঘাতের লঞ্চপ্যাডে রূপান্তরের গভীর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি রাখাইন অঞ্চলের এই বিশৃঙ্খলা বাংলাদেশের ভেতরে এক মারাত্মক অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিচ্ছে। মিয়ানমার সীমান্ত হয়ে আসা মাদক চোরাচালান আজ দেশের যুবসমাজকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। সীমান্তবর্তী এই অরক্ষিত করিডোর ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকার ইয়াবা, অত্যন্ত বিপজ্জনক ক্রিস্টাল মেথ বা আইস এবং ভারী স্বয়ংক্রিয় ছোট অস্ত্রের চালান দেদারসে দেশে প্রবেশ করছে। এই অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে সীমান্ত এলাকার এক শ্রেণির প্রভাবশালী চক্র। একই সাথে লাখ লাখ রোহিঙ্গার উপস্থিতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় শ্রমবাজারে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। অতি সস্তায় শ্রম বিক্রির কারণে স্থানীয় বাংলাদেশি নাগরিকরা কর্মহীন হয়ে পড়ছেন এবং নিত্যপণ্যের বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছে। পর্যটন ও মৎস্য আহরণের মতো অপার সম্ভাবনাময় একটি জেলাকে এই সীমান্ত অপরাধ চক্র ক্রমেই একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রবণ অঞ্চলে পরিণত করছে।

এই জটিল ও বিপজ্জনক সংকটের সবচেয়ে রহস্যজনক চরিত্রটি হলো আন্তর্জাতিক পরাশক্তি চীন। মিয়ানমার ও বাংলাদেশ—উভয় দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখা বেইজিং এই অঞ্চলে অত্যন্ত চতুর এক দ্বিমুখী খেলা খেলছে। চীনের ইউনান প্রদেশ থেকে শুরু হয়ে রাখাইনের কিয়াকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে তেল ও গ্যাসের পাইপলাইন এবং কৌশলগত রেলপথ। এটি মূলত বেইজিংয়ের মালাক্কা প্রণালীর দীর্ঘ সমুদ্রপথ এড়িয়ে সরাসরি ভারত মহাসাগরে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করার এক জীবনমরণ মহাপরিকল্পনা। নিজেদের এই শতকোটি ডলারের ভূরাজনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখতে চীন একদিকে জান্তা সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ মৈত্রী রক্ষা করছে, অন্যদিকে গোপনে ও কৌশলে আরাকান আর্মিকেও নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে অস্ত্র ও কৌশলগত সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে। নিজ স্বার্থের সুরক্ষায় চীন এই অঞ্চলের সংঘাতকে এক নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় জিইয়ে রাখছে, যার প্রত্যক্ষ বলি হচ্ছে বাংলাদেশ। কারণ রাখাইনের বর্তমান উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনাকে কার্যত চিরতরে হিমঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি বাংলাদেশকে যে অভাবনীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, বন্দর সুবিধা ও সমৃদ্ধির আশা দেখিয়েছিল, আরাকানের বারুদ আজ সেই সম্ভাবনার দরজায় আঘাত হানছে। রাখাইনে জান্তা সরকারের অনুপস্থিতি এবং আরাকান আর্মির মতো এক নন-স্টেট বা অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় সুরক্ষার সামনে এক স্থায়ী মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরাশক্তিগুলোর স্বার্থের দ্বন্দ্বে পড়ে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের ভূকৌশলগত নিয়ন্ত্রণ যাতে হাতছাড়া না হয়, সে বিষয়ে ঢাকাকে এখন সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা ও দূরদর্শী কূটনীতির পরিচয় দিতে হবে। একই সাথে সীমান্ত পাহারাকে আরও দুর্ভেদ্য করে তোলা, নাফ নদীতে আরাকান আর্মির যেকোনো অপতৎপরতা শক্ত হাতে প্রতিহত করা এবং ক্যাম্পের ভেতরের অপরাধীদের মূলোৎপাটন করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক কোনো খেলোয়াড় যেন বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও কক্সবাজারের সমুদ্রসীমাকে তাদের স্বার্থের হাতিয়ার বানাতে না পারে, সে ব্যাপারে এখনই কঠোর ও সমন্বিত জাতীয় নিরাপত্তা নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category