রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক রূপান্তর ঘটানো ঢাকা মেট্রোরেল এখন আমলাতান্ত্রিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জটিল সমীকরণে জড়িয়ে পড়েছে| এই দ্রুতগতির গণপরিবহন সেবার ভবিষ্যৎ পরিচালনা এবং নজরদারির এখতিয়ারকে ঘিরে নীতিগত বিরোধে জড়িয়েছে দুই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠান—ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)| দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে মেট্রোরেল পরিষেবাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণার নামে মেট্রোরেল আইন, ২০১৫ সংশোধনের একতরফা উদ্যোগ| পরিচালনাকারী সংস্থা ডিএমটিসিএল সম্প্রতি সরাসরি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে আইনটির খসড়া সংশোধনী প্রস্তাব জমা দেয়| এর বিপরীতে নিয়ন্ত্রণকারী অভিভাবক সংস্থা হিসেবে ডিটিসিএ কড়া অবস্থান গ্রহণ করে জানিয়েছে, ডিএমটিসিএল তাদেরই গঠিত একটি অধীনস্থ কোম্পানি মাত্র| নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডিএমটিসিএলের এমন একক তৎপরতা কেবল প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডেরই চরম লঙ্ঘন নয়, বরং তা নীতিনির্ধারণী ভারসাম্যকে ধূলিসাৎ করার শামিল| দুই সংস্থার এই বিপরীতমুখী অবস্থানে মেট্রোরেল আইনের জরুরি সংস্কারের উদ্যোগটি এখন অনিশ্চয়তায় ঝুলছে|
বিরোধের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আইনের খসড়া সংশোধনী নিয়ে ডিটিসিএর মতামত জানতে চেয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ বিগত দুই বছরে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক চিঠি চালাচালি করেছে| ২০২৪ সালের নভেম্বর এবং ২০২৫ সালের মে মাসে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠির জবাবে ডিটিসিএ তাদের সুস্পষ্ট ও লিখিত আপত্তি তুলে ধরেছিল| এমনকি সর্বশেষ ২০২৬ সালের আগস্ট মাসের ১৮ তারিখে মন্ত্রণালয় থেকে পুনরায় মতামত চাওয়া হলে, ২৭ আগস্ট ডিটিসিএ তাদের আগের কঠোর অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে চিঠি পাঠায়| সংস্থাটির স্পষ্ট যুক্তি হলো, কোনো অধীনস্থ কোম্পানি সরাসরি তার অভিভাবক সংস্থাকে পাশ কাটিয়ে মন্ত্রণালয়ের কাছে আইন পরিবর্তনের খসড়া উপস্থাপন করতে পারে না| প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী, আইন সংশোধন সংক্রান্ত যেকোনো প্রস্তাব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই মন্ত্রণালয়ে যাওয়া সমীচীন| ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক বিষয়টি পরিষ্কার করে দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন যে, রাষ্ট্রীয় জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার অধীন কোনো কোম্পানি যেভাবে সরাসরি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রস্তাব পেশ করে না, ডিএমটিসিএলের ক্ষেত্রেও একই সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বাধ্যবাধকতা প্রযোজ্য|
আইনি ভিত্তির দিক থেকে ডিটিসিএর যুক্তি বেশ জোরালো ও সুনির্দিষ্ট| ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ আইন, ২০১২-এর ১৯ ধারা অনুযায়ী ডিএমটিসিএল মূলত ডিটিসিএর তত্ত্বাবধানে গঠিত একটি অপারেটিং কোম্পানি| একইভাবে মেট্রোরেল আইন, ২০১৫-এর ধারা ২(৩)-তে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, মেট্রোরেল সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রমের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হলো ডিটিসিএ| ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি মন্ত্রিসভার নীতিগত বৈঠকেও ডিটিসিএর অধীন সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট বা এমআরটি লাইন বাস্তবায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়ে ডিএমটিসিএল গঠনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল| ডিটিসিএর মূল বক্তব্য হলো, ভবিষ্যতে তাদের অধিক্ষেত্রে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ সাবওয়ে, সিটি করপোরেশন কিংবা সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে আরও একাধিক মেট্রোরেল অপারেটর কোম্পানি গড়ে উঠতে পারে| সেক্ষেত্রে ডিএমটিসিএল কেবল বর্তমানের একমাত্র অপারেটর হলেও আইনটি শুধুমাত্র তাদের একক সুবিধার জন্য প্রণীত হয়নি| ফলে লাইসেন্স গ্রহণকারী পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বা অপারেটর কোনো অবস্থাতেই নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিজের কাঁধে তুলে নিতে পারে না|
সবচেয়ে বড় অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে আইন সংশোধনের আসল উদ্দেশ্যকে ঘিরে| ডিএমটিসিএল যে খসড়া প্রস্তুত করেছে, তার ওপর পর্যালোচনা চালিয়ে ডিটিসিএ অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য মন্ত্রণালয়ে তুলে ধরেছে| তাদের ভাষ্যমতে, যাত্রীসেবার সুরক্ষায় মেট্রোরেলকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ হিসেবে ঘোষণার কথা বলে পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু করা হলেও, প্রস্তাবিত খসড়ার কোথাও সেটির সুনির্দিষ্ট কোনো বিধানই রাখা হয়নি| বরং জরুরি সেবার মোড়কে মূল আইনের মৌলিক কাঠামো বদলে দিয়ে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা ডিটিসিএর কর্তৃত্ব খর্ব করার গোপন অভিপ্রায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে| ডিটিসিএ জোরালোভাবে জানিয়েছে, কোনো সংস্থাকে ‘অত্যাবশ্যক পরিষেবা’ ঘোষণা করার সঙ্গে বিদ্যমান মেট্রোরেল আইনের মৌলিক ধারা সংশোধনের কোনো সরাসরি সম্পর্ক নেই| যেহেতু মেট্রোরেল আইন, ২০১৫-এর আনুষ্ঠানিক স্পনসরিং এজেন্সি বা মূল প্রস্তাবক ছিল খোদ ডিটিসিএ, তাই এই আইনের যেকোনো সংস্কার প্রস্তাব নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের টেবিল হয়ে মন্ত্রণালয়ে আসাই প্রশাসনিক সততা ও নিয়ম রক্ষার দাবি|
অন্যদিকে ডিএমটিসিএল তাদের জনসংযোগ শাখার মাধ্যমে সাফাই গেয়ে জানিয়েছে, মেট্রোরেলের প্রযুক্তিগত বিকাশ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে সময়ের সঙ্গে আধুনিক ও সুষ্ঠু করার স্বার্থেই তারা আইনটির খসড়া প্রস্তুত করে প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে| কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ডিএমটিসিএলের এই অবস্থানকে সমর্থন করে না| পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া ও ফিনল্যান্ডের মতো উন্নত ও আধুনিক মেট্রোরেল নেটওয়ার্কসমৃদ্ধ দেশগুলোতে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান (অপারেটর) এবং নীতি নির্ধারণী নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ (রেগুলেটর) সম্পূর্ণ পৃথক ও স্বাধীন| ভারতের দিল্লি, মুম্বাই কিংবা বেঙ্গালুরু মেট্রো ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও অপারেটরদের যাবতীয় কার্যক্রম স্বাধীন নগর পরিবহন কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকিতে সম্পন্ন হয়| চালক ও ট্রাফিকের দায়িত্ব যদি একই ব্যক্তির হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে কোনো নিরপেক্ষ জবাবদিহি বজায় থাকে না|
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা এই সংঘাতকে একটি নিরাপদ ও টেকসই পরিবহন কাঠামোর জন্য বড় অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন| বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক হাদিউজ্জামান অত্যন্ত যৌক্তিকভাবে উল্লেখ করেছেন যে, মেট্রোরেল যেহেতু রাজধানীর সামগ্রিক বহুমাধ্যমীয় গণপরিবহন ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ, তাই এর সমন্বয়, দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রণয়ন এবং সামগ্রিক নজরদারির এখতিয়ার কোনো একক কোম্পানির হাতে না রেখে কেন্দ্রীয় পরিবহন কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ ডিটিসিএর অধীনেই থাকা বাধ্যতামূলক| তবে একই সঙ্গে তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ভারসাম্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, মেট্রোরেলের লাইসেন্স প্রদান কিংবা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা সার্টিফিকেট দেওয়ার কাজটি ডিটিসিএকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত, সক্ষম ও স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষ বা থার্ড পার্টি এজেন্সির মাধ্যমে করাতে হবে| কারণ পরিচালনাকারী সংস্থা যদি নিজেই নিজের কাজের মান ও নিরাপত্তা প্রত্যয়ন করে, তবে সেখানে কোনো স্বচ্ছতা বা ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ অবশিষ্ট থাকে না| মন্ত্রণালয় যদিও বিষয়টিকে কোনো বিরোধ নয় বলে দাবি করছে, কিন্তু নীতিনির্ধারকদের অবিলম্বে এই আমলাতান্ত্রিক রশি-টানাটানির অবসান ঘটানো দরকার; অন্যথায় ক্ষমতার এই অলিখিত দ্বন্দ্বে শেষ পর্যন্ত সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা ও মসৃণ সেবাই চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে|