• সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৪০ অপরাহ্ন

ক্রেতাশূন্যতায় জৌলুস হারাচ্ছে রাজধানীর পুরনো শপিং মল, বন্ধের পথে ব্যবসা

Reporter Name / ৭ Time View
Update : রবিবার, ১ নভেম্বর, ২০২৬

রাজধানীর বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে একসময় প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শপিং মল ও বিপণিবিতানগুলো আজ গভীর মন্দা ও ক্রেতা সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। একসময়ের জমজমাট ইস্টার্ন প্লাজা, ইস্টার্ন মল্লিকা, মৌচাক মার্কেট, কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি কিংবা পুলিশ প্লাজার মতো অভিজাত বিপণিবিতানগুলোর অলিগলি আজ প্রায় ক্রেতাশূন্য। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন নতুন শপিং মলের সংখ্যা বৃদ্ধি, অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটার ব্যাপক প্রসার, দোকান খোলা রাখার সময়সীমা সংকুচিত হওয়া এবং সার্বিক মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষ এখন নিয়মিত কেনাকাটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। যার ফলস্বরূপ ঢাকার পুরনো ও মাঝারি এই শপিং মলগুলোর ব্যবসায়ীরা চরম আর্থিক লোকসানের মুখে পড়ে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

হাতিরপুলের একসময়ের অভিজাত বিপণিবিতান ইস্টার্ন প্লাজায় গেলেই বর্তমান দুর্বিষহ চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। চলন্ত সিঁড়ি, আধুনিক লিফট এবং সব ধরনের ব্র্যান্ডের পণ্যের সমাহার থাকার কারণে দেশজুড়ে খ্যাতি অর্জন করা এই শপিং মলটিতে এখন আর আগের মতো ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায় না। নিচতলার প্রসাধনী বা পোশাকের দোকানগুলোতে গুটিকয়েক ক্রেতা ছাড়া বেশিরভাগ সময় বিক্রেতারা মোবাইল বা নিজেদের মধ্যে গল্প করে সময় পার করেন। ওপরের ফ্লোরগুলোতে অনেক দোকানের শাটার চিরতরে নামানো রয়েছে কিংবা খালি অবস্থায় পড়ে আছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, অনলাইন শপিংয়ের দিকে ক্রেতাদের তীব্র ঝোঁক এবং পর্যাপ্ত ক্রেতা না থাকার কারণে অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করছেন কিংবা দোকান ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

এই মন্দার করুণ শিকার হয়ে সম্প্রতি রাজধানীর শান্তিনগর এলাকার বিখ্যাত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্সটি সম্পূর্ণ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। গত শতাব্দীর শেষ দশকে নির্মিত বিশ তলা এই অভিজাত ভবনের বিভিন্ন তলায় জামা, জুতা, প্রসাধনী ও জুয়েলারি কিনতে মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে উচ্চবিত্ত ক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় থাকত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে বেচাকেনা এতটাই তলানিতে গিয়ে ঠেকে যে দোকান মালিকরা এই বিপণিবিতানটি টিকিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন। শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এখানকার অনেক দোকান মালিক বাধ্য হয়ে দোকান বিক্রি করে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা রাজধানীর খুচরা ব্যবসা খাতের ইতিহাসে এক বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয়।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে যে ইস্টার্ন প্লাজা বা কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি একা নয়, বরং এলিফ্যান্ট রোডের ইস্টার্ন মল্লিকা, হাতিরঝিলের পুলিশ প্লাজা কনকর্ড, সীমান্ত স্কয়ার, রাপা প্লাজা, হোসাফ টাওয়ার, মৌচাক মার্কেট এবং মিরপুরের শাহ আলী প্লাজার অবস্থাও হুবহু একই রকম। এসব শপিং মলে আসা ব্যবসায়ীরা জানান যে তাঁদের প্রতিদিনের বিক্রি গত কয়েক বছরের তুলনায় অর্ধেকের নিচে নেমে গেছে। অনেক দিন এমন যায় যে সারাদিন দোকানে বসে থেকে একটি পণ্যেরও খাতা খোলা সম্ভব হয় না। অথচ প্রতি মাসে নিয়মিত দোকান ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, কর্মচারীদের বেতন এবং সার্ভিস চার্জ মেটাতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে পড়েছেন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন এই শোচনীয় অবস্থার পেছনে মূল কারণ হিসেবে শপিং মলগুলো খোলা রাখার সময়সীমা কমানোকে দায়ী করেছেন। বর্তমানে রাত আটটার মধ্যে শপিং মল বন্ধ করে দেওয়ার যে নিয়ম চালু রয়েছে, তাতে চাকরিজীবী বা কর্মব্যস্ত মানুষ অফিস শেষ করে কেনাকাটার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর যখন কেনাকাটার মূল বা পিক টাইম শুরু হয়, ঠিক তখনই মার্কেট বন্ধের ঘণ্টা বেজে ওঠায় ক্রেতা সমাগমে ধস নেমেছে। সমিতি থেকে দোকান খোলা রাখার সময়সীমা আরও অন্তত এক ঘণ্টা বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে, যাতে ব্যবসায়ীরা কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পান।

পাশাপাশি সাধারণ ক্রেতাদের জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি এই মন্দাকে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে যে মৌচাক এলাকার ফরচুন শপিং মল কিংবা হোসাফ টাওয়ারের সুপরিসর করিডরগুলো এখন দিনের বেশিরভাগ সময়ই খাঁ খাঁ করে। চাল, ডাল, তেল ও বাড়িভাড়ার মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে মানুষের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয়ে যাওয়ায় জামাকাপড়, প্রসাধনী বা শৌখিন সামগ্রী কেনার বাজেট সাধারণ মানুষ ছেঁটে ফেলতে বাধ্য হয়েছে। আমদানিকৃত প্রসাধনী ও পোশাকের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণে সাধারণ ক্রেতারা দাম শুনেই কেনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

মিরপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী বেনারশী পল্লী এবং শাহ আলী প্লাজার দোকানগুলোতেও একই চিত্র বিরাজ করছে। ফুটপাতের হকার উচ্ছেদ হওয়ার পর ক্রেতারা মার্কেটমুখী হবেন বলে আশা করা হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। শাহ আলী প্লাজার দীর্ঘদিনের একজন ব্যবসায়ী জানান যে বর্তমানের এই ভয়াবহ মন্দা তিনি তাঁর পুরো ব্যবসায়িক জীবনে দেখেননি। দোকানে দীর্ঘ সময় বসে থেকেও ক্রেতার দেখা মিলছে না, অথচ বিদ্যুৎ ও অন্যান্য পরিচালন খরচ ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে।

সব মিলিয়ে রাজধানীর পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী শপিং মলগুলোর এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতি দেশের অভ্যন্তরীণ খুচরা ব্যবসার ভঙ্গুর দশা এবং পরিবর্তিত ভোক্তা আচরণের এক বাস্তব দলিল। ডিজিটাল বা অনলাইন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের জনপ্রিয়তা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের দ্বিমুখী চাপে পড়ে ঐতিহ্যবাহী বিপণিবিতানগুলো আজ ধ্বংসের মুখে। এই সংকট নিরসনে সরকারি নীতি সহায়তা, সময়সীমা শিথিলকরণ এবং ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ঘোষণা করা না হলে রাজধানীজুড়ে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী এই বাণিজ্য খাতটি পুরোপুরি ধসে পড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে কেবল সময়সীমা বৃদ্ধি করলেই এই বহুমুখী সংকটের স্থায়ী সমাধান মিলবে না। অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা বা ই-কমার্সের অগ্রযাত্রার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে ঐতিহ্যবাহী শপিং মলগুলোর উদ্যোক্তাদেরও ডিজিটাল রূপান্তরের পথে হাঁটতে হবে। বিপণিবিতানগুলোতে আধুনিক বিপণন কৌশল, ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং গ্রাহক আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কর ছাড়, সহজ শর্তে ঋণ এবং বিদ্যুৎ বিলে বিশেষ ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি। খুচরা ব্যবসার এই মেরুদণ্ড ভেঙে পড়লে দেশের সামগ্রিক সেবা খাত ও কর্মসংস্থানে ব্যাপক ধস নামবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

শপিং মলগুলোর মালিক সমিতি ও বণিক সমিতির পক্ষ থেকে যৌথভাবে সরকারের কাছে বিভিন্ন দাবিদাওয়া পেশ করা হয়েছে। তারা আশা করছেন যে নীতিনির্ধারকেরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন, যাতে ঐতিহ্যবাহী এই বিপণিবিতানগুলো তাদের হারানো জৌলুস ফিরে পেতে পারে।

আগামী দিনগুলোতে খুচরা বাজারের এই স্থবিরতা কাটবে কি না, তা মূলত নির্ভর করছে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার নতুন কৌশলের ওপর।

তীব্র প্রতিযোগিতার এই বাজারে টিকে থাকতে হলে শপিং মলগুলোকে ক্রেতাবান্ধব ও সাশ্রয়ী করতে হবে।

রাজধানীর অর্থনীতিতে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে তাই এই খাতের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category