• শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬, ০৪:৫৫ অপরাহ্ন

ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিষ্ঠান দখল: বিএনপি জামায়াতের গোপন লড়াই

Reporter Name / ১ Time View
Update : শনিবার, ২৭ জুন, ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যকার দীর্ঘদিনের সখ্যতা এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। সরকার গঠনের পর যে সমন্বিত রাজনৈতিক পরিবেশের আশা করা হয়েছিল, তা সময়ের ব্যবধানে তিক্ততায় রূপ নিয়েছে। প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান, উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্য এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দুই দলের মধ্যে যে দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছে, তা দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতার বলয় ও আদর্শিক অবস্থানের পার্থক্য এখন এতটাই প্রকট যে, তাদের সম্পর্কটি যেকোনো সময় আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।

এই টানাপোড়েনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘জুলাই সনদ’ বা জুলাই চার্টার বাস্তবায়ন। জামায়াতের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনা ও জুলাই সনদের অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নে সরকার গড়িমসি করছে। রাজনৈতিক সংস্কার, বিচার বিভাগীয় পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরকারের ধীরগতি জামায়াতকে হতাশ করেছে। অন্যদিকে, সরকারের দাবি, তারা ধাপে ধাপে প্রতিটি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে জামায়াতের তরফ থেকে আসা অতিরিক্ত চাপ ও দ্রুত সংস্কারের দাবিকে সরকার খুব একটা ইতিবাচকভাবে দেখছে না। বিএনপি নেতাদের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে জটিল করে তোলা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে জামায়াতকে কোণঠাসা করার অভিযোগ এই বিরোধের আরেকটি বড় কারণ। জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, সরকার পরিকল্পিতভাবে প্রশাসন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তাদের অনুসারীদের সরিয়ে দিচ্ছে। ইসলামি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে জামায়াতপন্থী ব্যক্তিদের অপসারণ এবং অন্যান্য আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগও উঠে এসেছে। বিশেষ করে, সম্প্রতি ছয় নবজাতকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের মতো সিদ্ধান্তকে জামায়াত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছে। তাদের মতে, এটি তাদের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ধ্বংস করার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ মাত্র।

উন্নয়ন বরাদ্দের ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ এই দূরত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। জামায়াতপন্থী সংসদ সদস্যদের দাবি, তাদের নির্বাচনী এলাকায় স্থানীয় উন্নয়ন কাজ তদারকির নামে ক্ষমতাসীন দলের নারী সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা জনপ্রতিনিধিদের কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করছে। বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সরকারি দলের সদস্যরা বিশেষ সুবিধা পাচ্ছেন, যেখানে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিতরা বঞ্চিত হচ্ছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদগুলোতেও ক্ষমতাসীন দলের একক আধিপত্য বজায় রাখা হচ্ছে, ফলে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে দায়িত্ব দিতে পারছেন না। এই পরিস্থিতিকে জামায়াত তাদের রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল করার একটি কৌশল হিসেবে দেখছে।

বিএনপির অবস্থান অবশ্য ভিন্ন। ক্ষমতাসীন দলটির নেতারা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কোনো রাজনৈতিক দলের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে রাষ্ট্র পরিচালনা করা সম্ভব নয়। রাষ্ট্র পরিচালনার নিজস্ব পরিকল্পনা ও জাতীয় নীতি রয়েছে, যা কোনো নির্দিষ্ট দলের এজেন্ডা দ্বারা প্রভাবিত হবে না। বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরিফুল আলম স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, রাজপথের লড়াইয়ের ইতিহাস রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আলাদা। রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব গতিপথেই চলতে হবে এবং বিরোধী দলের প্রতিটি আবদার বা প্রত্যাশা পূরণ করা কোনো সরকারের পক্ষেই সম্ভব নয়। এই অনমনীয় অবস্থান থেকে বোঝা যায়, বিএনপি কোনো ধরনের রাজনৈতিক জিম্মিদশা মেনে নিতে নারাজ।

জামায়াতের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার একটি বড় প্রমাণ পাওয়া গেছে সরকারি আইন কর্মকর্তাদের গণপদত্যাগের ঘটনায়। সম্প্রতি জামায়াতপন্থী ৭ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করেছেন। তাদের পদত্যাগপত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতি না থাকা, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বাতিল এবং বিচারক নিয়োগের অধ্যাদেশ বাতিলের মতো বিষয়গুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের স্মৃতিচারণ ও সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। বাজেটোত্তর সময়ে এই কর্মসূচি সরকারবিরোধী চাপের নতুন বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আব্দুল লতিফ মাসুমের মতে, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি চাইছে সবকিছু নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে, আর জামায়াত চাইছে চাপের মাধ্যমে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করতে। এই রাজনৈতিক রেষারেষি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক অস্থির পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তবে সব পক্ষই বুঝতে পারছে যে, এই দড়ি টানাটানির খেলায় রাজনৈতিক মাঠের সমীকরণ যেদিকেই যাক, শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর।

জামায়াতের শীর্ষ নেতারা মনে করেন, ক্ষমতার অংশীদারিত্ব বা সহযোগিতার প্রত্যাশা থাকলেও সরকার তাদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। বিভিন্ন স্তরের নেতারা অভিযোগ করেছেন যে, প্রশাসনে তাদের কোনো কথাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। ঢাকা-১২ আসনের এমপি সাইফুল আলম খান মিলনসহ অনেকেই এই বৈষম্যকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অংশ বলে অভিহিত করেছেন। তাদের মতে, জামায়াতকে রাজনৈতিকভাবে অকার্যকর করার যে নীল-নকশা করা হয়েছে, তা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য মোটেও সহায়ক নয়।

অন্যদিকে, বিএনপি সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য হলো, তারা সব পক্ষের মতামতকে সম্মান জানায়, কিন্তু অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে না। কোনো একটি বিশেষ গোষ্ঠী বা দলের স্বার্থে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তারা মনে করেন, জামায়াত অযথা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে বা পরিস্থিতির অতিরঞ্জিত চিত্র তুলে ধরছে, যা বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য দায়ী। এই মতপার্থক্য মূলত দুই দলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিন্নতার প্রতিফলন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে, জামায়াতের ৩৬ দিনের কর্মসূচি এবং বিএনপির শক্ত অবস্থানের কারণে রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে সংস্কারের দাবি, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার কর্তৃত্ব—এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি এখন বড় ধরনের পরীক্ষার মুখে। তবে ইতিহাস সাক্ষী, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে। বিএনপি ও জামায়াত যদি আলোচনার মাধ্যমে এই দূরত্ব ঘোচাতে ব্যর্থ হয়, তবে নতুন কোনো মেরুকরণ দেশীয় রাজনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে কোনো মধ্যপন্থা বের হয়, নাকি তাদের সম্পর্ক আরও সংকটের গভীরে তলিয়ে যায়। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আলোচনার টেবিলে ফিরে আসাই এই মুহূর্তের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোর এই পারস্পরিক রেষারেষি যদি সংঘাতের পথে না গিয়ে আলোচনার টেবিলে সমাধান করা যেত, তবেই সাধারণ মানুষের আশা ও আকাঙ্ক্ষা পূরণ সম্ভব হতো।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category