দেশের ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ গ্রহণের প্রবণতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি এখন আন্তর্জাতিক বা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্পষ্ট অনীহা দেখাচ্ছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। সাধারণত দেশীয় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর তুলনায় বিদেশি ঋণের সুদের হার অনেকটাই কম হয়ে থাকে। তবুও ডলারের বিনিময় হার নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক বাজারে সুদ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ের ঝুঁকি, নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ধীরগতি এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতার কারণে বিদেশি ঋণের বাজারেও এক ধরনের পঙ্গুত্ব নেমে এসেছে। ফলে অপেক্ষাকৃত কম সুদের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যবসায়ীরা নতুন করে কোনো বৈদেশিক আর্থিক দায় ঘাড়ে নিতে চাইছেন না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বিদেশি ঋণের এই ধারাবাহিক নিম্নমুখী প্রবণতা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬ সালের মে মাস শেষে দেশের বেসরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪ কোটি মার্কিন ডলারে (২০.০৪ বিলিয়ন ডলার)। অথচ এক বছর আগে ২০২৫ সালের একই সময়ে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৬ কোটি ডলার এবং ২০২৪ সালে তা ছিল ১ হাজার ৯৪২ কোটি ডলার। এরও আগে ২০২৩ সালে বেসরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৯৪ কোটি ডলার বা প্রায় ২১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বিগত তিন বছরের ব্যবধানে বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ কমেছে প্রায় ৯০ কোটি ডলার।
ব্যাংকার ও নীতিনির্ধারকদের মতে, বিদেশি ঋণের মূল সুবিধা হলো আপাতদৃষ্টিতে এর কম সুদের হার। তবে এর পেছনে লুকিয়ে থাকা বড় ঝুঁকিটি হলো মুদ্রার বিনিময় হার। যেসব প্রতিষ্ঠান স্থানীয় মুদ্রায় অর্থাৎ টাকায় পণ্য বা সেবা বিক্রি করে আয় করে, টাকার ধারাবাহিক দরপতনের কারণে তাদের জন্য ডলারের ঋণ পরিশোধের খরচ বহুগুণ বেড়ে যায়। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে রেফারেন্স রেট বা ‘সোফর’ (SOFR)-এর ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত থাকে এই ঋণের সুদ। বাংলাদেশ ব্যাংক গত মে মাসে স্বল্পমেয়াদি ঋণের সর্বোচ্চ সীমা কমিয়ে সোফর-এর সাথে সর্বোচ্চ ৩ শতাংশ যোগ করার নির্দেশনা দিয়েছে। বর্তমানে সোফরের গড় হার প্রায় ৩.৬২ থেকে ৩.৬৬ শতাংশ হওয়ায় মোট সুদহার দাঁড়ায় সাড়ে ৬ শতাংশের বেশি। এর সাথে ব্যাংকিং কমিশন, ট্যাক্স এবং বিনিময় হারের ঝুঁকি এড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় হেজিং খরচ যুক্ত হলে বিদেশি ঋণের কার্যকর ব্যয় দেশীয় ঋণের প্রায় কাছাকাছি চলে যায়, যা উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে।
ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার আরেকটি প্রধানতম কারণ হলো দেশে নতুন শিল্প স্থাপন, কারখানা সম্প্রসারণ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির গতি থমকে যাওয়া। সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের শ্লথগতির কারণে বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমে গত জুনে মাত্র ৪.৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাব এবং সামগ্রিক উৎপাদন খাতের চ্যালেঞ্জের কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন করে বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি নিচ্ছেন না। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থনীতিতে গতি ফেরাতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও ডলারের বিনিময় হার পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়া এবং সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত না হলে কেবল সুদের হার নিয়ন্ত্রণ করে বিদেশি অর্থায়নের স্থবিরতা কাটানো সম্ভব হবে না বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।