প্রত্যেকটা মানুষের ছোটোবেলায় একজন ‘আইডল’ থাকে, যাকে দেখে সে বড়ো হয়। তার মতো হতে চায়।
আমার ছিলেন আইডল ছিলেন সৌমিত্র কুমার মুৎসুদ্দি।
আমরা একই দালানে থাকতাম। সৌমিত্র দাদা দোতলায়, আমরা তিনতলায়। তাঁকে ডাকতাম শংকু দা। শুধু আমার না, তিনি আমার সমবয়সীদের অনেকের আইডল ছিলেন।
তিনি ছিলেন পাড়ার রূপকথার নায়ক। আমাদের চাইতে কয়েক বছরের বড়ো। অসম্ভব ভালো ছাত্র। খুব ভালো বিতার্কিক। কথা বললে মনে হয় আবৃতি করছেন। কবিতা লেখেন। খুব পরিপাটি। সবচে লোভনীয় ছিল তাঁর ছোট্ট লাইব্রেরি। তাতে অনেক বই সাজানো। তবে দাদা কিন্তু বইয়ের ব্যাপারে ছিলেন অতি কঠিন। কাউকে পড়তে দিতেন না। আমি প্রায়ই তাঁদের বাসায় যেতাম, কারণ তাঁর ছোটো দুভাই বাবলা আর পাম্পু আমার জানের বন্ধু, কিন্তু বইয়ের কাছে যাওয়ার অনুমতি পেতাম না।
একদিন তাঁদের বাসায় গেছি। তিনি টেবিলে বসে পড়ছেন। আমি লোভ নিয়ে চকচকে বইগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি, তিনি হঠাৎ একটি বই নিয়ে বললেন, ‘বাদল, এই বইটি নিয়ে যাও, পড়ে ফেরত দিও, তবে দেখো, যাতে ছিঁড়ে না যায়।’
আমি তো হতভম্ব। দাদা দিচ্ছেন বই! হাত বাড়িয়ে দেখি বইটির নাম ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’।
তারপর থেকে তাঁর বইতে ভাগ বসাতে আমার আর সমস্যা হয়নি।
নিজের অজান্তেই এ মানুষটি আমাকে পড়ুয়া বানিয়েছেন, প্রগতিশীল চিন্তা করতে শিখিয়েছেন, রেজাল্ট ভালো করার প্রেরণা দিয়েছেন, বিতার্কিক বানিয়েছেন, পরিপাটি হতে শিখিয়েছেন, এমনকি লেখালেখির ভাবনাও হয়তো তাঁকে দেখে প্রথম জন্ম নিয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্য কথা হলো, এ বয়সে এসেও তাঁর জ্ঞানক্ষুধা মিটেনি। একটার পর একটা ডিগ্রি নিচ্ছেন! নতুন ভাষা শিখছেন!
ছোটোবেলায় দাদাকে দেখে পালটে গিয়েছিলাম। তাঁকে দেখে পালটে যাওয়ার লোভ আমার আজও গেলো না!
আমার দাদা নিজেও জানেন না তাঁর আলোয় আমি কতটা আলোকিত!
আজ দাদার জন্মদিন
শতায়ু হোন, দাদা।
শুভ জন্মদিন।
#আসুন মায়া ছড়াই