২০২৪ সাল।
চট্টগ্রামের ভাড়া বাসা ছেড়ে ঢাকা চলে আসব।
গত শতকের চল্লিশের দশকে তৈরি অতি পুরোনো বাড়ি। দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়ত। নিয়মিত খেয়াল না করলে সেখানে শ্যাওলা জন্মাত। বৃষ্টি হলে ছাদ চুঁইয়ে পানি পড়ত।
তারপরও বাড়িটির ছিল অদ্ভুত মায়া!
পাহাড়ের উপরে। অরণ্যের নির্জনতায়। গাছে গাছে ছিল পাখি। তাদের কিচিরমিচির শব্দে ঘুম ভাঙত। কাঠবিড়ালির ঝাঁক মানুষের উপস্থিতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে গাছ থেকে গাছে লাফ দিয়ে বেড়াত।
কিছু গাছ ছিল শতাব্দীপ্রাচীন। সেগুলো যেন ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে কথা বলত।
একটি বিশাল বুড়ো সাপ রাস্তা আটকে শুয়ে থাকত। কাউকে কামড়াত না। আমরাও তাকে বিরক্ত করতাম না। বয়স্করা বলতেন, ‘ওটা সাপ নয়, জিন।’
একদিন দেখা গেল সাপটিকে বেজি কামড়ে মেরে ফেলেছে।
আমাদের সেটার জন্য খুব মন খারাপ হলো। সাপের জন্য এর আগে কেউ এত বিষণ্ন হয়েছে কি না জানি না।
এক ঝাঁক বুনো কুকুর জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসত। প্রথম প্রথম ওদের ভয় পেলেও পরে পেতাম না, বরং নিচতলার খালাম্মা তাদের জন্য বাটিতে ভাত-তরকারি সাজিয়ে রাখতেন।
খালাম্মার ছিল দুটো ময়না পাখি। কাছে গিয়ে ডাক দিলেই বলে উঠত, ‘ময়না, এই ময়না।’ অবিকল কিশোরীকণ্ঠ!
রাত নামলে অরণ্য আলাদা ভাষায় কথা বলত। শোনা যেত শেয়ালের ডাক, ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ। মাঝে মাঝে থোকায় থোকায় জোনাকি জ্বলত। অন্ধকারে সোনালি ফুলকি ফুটিয়ে ছুটে যেত বাঘডাঁস।
আর কারও কারও মতে ছিল ভূতের উপদ্রব।
প্রতিবেশী তারেক জুয়েলের গৃহকর্মী মাঝে মাঝে দাঁতকপাটি লেগে অজ্ঞান হয়ে যেত। সে নাকি বিশাল শ্যাওড়া গাছের নিচে শাড়ি পরা একটি মেয়েকে বসে থাকতে দেখেছে। মেয়েটির চোখ নেই, কান নেই, নাক নেই!
আমি চোখ-নাকহীন অপার্থিব মেয়েটিকে দেখার জন্য কত অমাবস্যার রাতে গাছটির নিচে গিয়ে বসে থেকেছি, কিন্তু দেখিনি।
কী আশ্চর্য! মেয়েকে আমি যুক্তি দিয়ে ভূতের অসারতা বুঝিয়েছিলাম, কিন্তু এ বাড়িতে বসেই লিখেছিলাম অনেকগুলো ভৌতিক গল্প!
একদিন মাঝরাতে দেখেছিলাম, দারোয়ান একটি মা শেয়াল ও তার তুলতুলে বাচ্চাদের নিয়ে শীতের রাতে আগুন জ্বেলে উষ্ণতা ভাগ করে নিচ্ছেন। কী আশ্চর্য মমতাময় ছিলেন মানুষটি!
সেখানে বৃষ্টি পড়ত না। গান গাইত। বৃক্ষডালে ধাক্কা খেয়ে তৈরি করত অপূর্ব সুর! সে সুর শুনতে শুনতে কতবার যে চোখের পাতায় ঘুম নেমে এসেছে!
যখন ভোর হতো, সোনালি রোদ গাছের সবুজ পাতায় পিছলা খেয়ে সবুজাভ হয়ে যেত। সে রোদ মাঝে মাঝে গাছের শরীরে আয়নার মতো প্রতিফলিত হতো। সে আয়নার সামনে আঙুল নাচালে মনে হতো হরিণ নাচছে।
আর ছিল অপূর্ব নির্জনতা। এত নির্জন সৌন্দর্য এর আগে আমি দেখিনি।
বাড়িটির সামনে ছিল একটি অপূর্ব ভাস্কর্য। বিশাল দুটো হাতের মুঠো, তার মধ্যে বেড়ে উঠছে সবুজ আর লালচে পাতার একটি গাছ। যেন ধরিত্রী দুহাত দিয়ে আগলে তার বৃক্ষসন্তানকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
কত বন্ধু যে এ বাড়িতে এসেছে! দেশ-বিদেশের কত বিখ্যাত মানুষের সাথে আড্ডা হয়েছে! লেখক, সংগীতশিল্পী, অভিনয়শিল্পী, এভারেস্টজয়ী। কত্তজন!
প্রতি শুক্রবার বর্ধিত পরিবারের সবাই চলে আসত। দিন ছাড়িয়ে রাত পর্যন্ত চলত আড্ডা। মাঝে মাঝে ওরা থেকে যেত। সেদিন মেঝেতে বিছানা পাতা হতো। বাচ্চাদের খিলখিল হাসি ভেসে আসত মাঝরাত পর্যন্ত।
এই অদ্ভুত বাসা ছেড়ে চলে যাচ্ছি।
চোখের সামনে ভেসে উঠছে কত স্মৃতি!
মেয়েটি এ বাড়িতে এসেছিল দশ বছর বয়সে। এখন বিশ। প্রতিদিন তাকে এখানেই একটু একটু করে বড় হতে দেখেছি। কী আনন্দের! আবার এ বাড়িতেই আম্মাকে বুড়ো হতে দেখেছি। কী বেদনার!
বাড়িটিতে কত মান-অভিমান, ভালোবাসার স্মৃতি আমাদের দুজনের!
শেষের দিকে এটা মেইনটেইন করতে করতে আমার স্ত্রী খুব বিরক্ত হয়ে উঠেছিল। বারবার বলত ফ্ল্যাটবাড়িতে উঠে যেতে। আজ দেখি, সে খুব গম্ভীর, কিছু বলছে না। উদাস চোখে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখের তারায় তীব্র বিষাদ।
আম্মাও খুব বিরক্ত ছিলেন। কিন্তু দেখি, তিনি দেয়াল ধরে বাড়িটিকে শেষবারের মতো আদর করে দিচ্ছেন!
মেয়ের চোখ পায়ের পাতার দিকে।
আমি বৃক্ষকে বললাম, বিদায়। কাঠবিড়ালি আর পাখিদের বললাম, বিদায়। বুনো কুকুরগুলোকে বললাম, বিদায়। শেয়ালের দলকে বললাম, বিদায়। জোনাকির আলোকে বললাম, বিদায়। বাঘডাঁসকে বললাম, বিদায়। এমনকি না দেখা অশরীরী আত্মাদের বললাম, বিদায়।
কোনো উত্তর এলো না।
কখনো কখনো উত্তর আসে না—তা অনুভব করতে হয়।
নিচে নামার পর মনে হলো, ভাস্কর্যটি দুহাত বাড়িয়ে আমাদের আগলে ধরে রাখতে চাইছে। যেতে দেবে না। তার মুঠোয় বেড়ে ওঠা গাছটির পাশে আমাদেরও ঠাঁই দেবে।
আমার মনে হলো, ভাড়াটেদের ভাড়া বাড়ির জন্য মন খারাপ করতে নেই। কিন্তু তাতে বুকের ভেতর বাজতে থাকা বেদনার ঘণ্টা থামছে না।
যাত্রা শুরু করেছি।
বাড়িটি কেমন যেন নুয়ে পড়েছে।
বাড়িদের কি মন খারাপ হয়?
সেগুলোও কি বিদায়বেলায় বেদনা লুকাতে মাথা নিচু করে থাকে?
# আসুন মায়া ছড়াই