বাঙালির চিরায়ত আত্মপরিচয়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ প্রবাদটি আজ কেবল সাহিত্যের পাতায় বন্দি এক করুণ রূপকথায় রূপ নিয়েছে। দেশের অধিকাংশ খেটে খাওয়া ও সীমিত আয়ের মানুষের বাস্তব জীবনে মাছ এখন দৈনন্দিন পুষ্টির উপাদান নয়, বরং হিসাব কষে কেনা এক মহার্ঘ পণ্যের নাম। নদী বা সাগরের প্রাকৃতিক মাছ বহু আগেই সাধারণের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গিয়েছিল। রুই, কাতলা, বোয়াল কিংবা শিং মাছের মতো ঐতিহ্যবাহী দেশীয় মাছের স্বাদ ভুলতে বসা কোটি কোটি শ্রমজীবী মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল ছিল কৃত্রিমভাবে চাষ করা কমদামি পাঙাশ ও তেলাপিয়া। কিন্তু বাজারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণহীন ঊর্ধ্বগতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের তীব্র চাপে আমিষের সেই অন্তিম দুর্গটিও এখন ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। রাজধানীর পাইকারি আড়ত থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার খুচরা বাজার, এমনকি দেশের প্রত্যন্ত জেলা পর্যায়ের হাটগুলোতেও এখন পাঙাশ আর তেলাপিয়ার দাম এমন এক সীমায় গিয়ে ঠেকেছে, যা সাধারণ ক্রেতার দীর্ঘশ্বাসকে আরও ভারী করে তুলছে।
বাজারের বর্তমান চিত্র বিশ্লেষণ করলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের টিকে থাকার লড়াইয়ের ভয়াবহ রূপটি উন্মোচিত হয়। রাজধানীর প্রধান কাঁচাবাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মাঝারি আকারের পাঙাশের কেজি এখন বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২২০ টাকায়। আর দুই থেকে তিন কেজি ওজনের পাঙাশের দাম পৌঁছে গেছে কেজিপ্রতি ২২০ থেকে ২৫০ টাকায়। এর চেয়ে বড় আকারের মাছের দর আরও চড়া। অথচ মাত্র কয়েক বছর আগেও এই পাঙাশ অনায়াসেই ১২০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে কিনতে পারতেন নিম্ন আয়ের ক্রেতারা। অন্যদিকে তেলাপিয়ার বাজার আরও বেশি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। এক কেজির কিছু কম ওজনের মাঝারি তেলাপিয়া এখন কিনতে হচ্ছে ২২০ টাকা কেজিতে, আর এক কেজির বেশি ওজনের বড় তেলাপিয়া বিক্রি হচ্ছে ২৪০ থেকে ২৫০ টাকায়। অর্থাৎ এক কেজি তেলাপিয়া কিনতে এখন যে টাকা গুনতে হচ্ছে, তা বড় আকারের পাঙাশের দামের সমান। ২০২২ সালেও যে তেলাপিয়া ১৪০ টাকায় পাওয়া যেত, মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তার দাম বেড়েছে প্রায় ২৫ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত। সস্তা মাছের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি কার্যত খেটে খাওয়া শ্রমজীবীদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
দ্রব্যমূল্যের এই লাগামহীন দৌড়ের মুখে পড়ে সাধারণ ক্রেতারা তাদের কেনাকাটার ধরনে আমূল কাটছাঁট করতে বাধ্য হচ্ছেন। একসময় বাজারে গিয়ে এক বা দুই কেজি মাছ একবারে কিনে বাড়ি ফেরার যে পারিবারিক স্বাচ্ছন্দ্য ছিল, তা এখন উবে গেছে। পোশাক কারখানার কর্মী, দিনমজুর, রিকশাচালক কিংবা ক্ষুদ্র দোকানদারদের মতো নির্দিষ্ট আয়ের মানুষরা এখন আস্ত মাছ কেনার সাহস পাচ্ছেন না। তাদের ভরসা করতে হচ্ছে খুচরা বাজারে কেটে রাখা মাছের অংশের ওপর। অনেকেই এখন আধা কেজি বা মাত্র কয়েক টুকরো মাছ মেপে নিয়ে বাড়ি ফিরছেন, যাতে কোনোমতে পরিবারের সন্তানদের পাতে এক টুকরো আমিষ তুলে দেওয়া যায়। তেলাপিয়ার ক্ষেত্রেও অনেকে সারা বাজার ঘুরে ছোট আকারের কোনো সস্তা লট পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। যখন সেটির দাম কিছুটা কম থাকে, কেবল তখনই তারা কেনার সাহস দেখান। পরিবারের বয়োবৃদ্ধ সদস্য কিংবা বাড়ন্ত শিশুদের পুষ্টির কথা ভেবে সম্পূর্ণভাবে মাছ কেনা বন্ধ করতে না পারলেও আগের চেয়ে কেনাকাটার পরিমাণ এক-তৃতীয়াংশে নামিয়ে এনেছেন অধিকাংশ ভোক্তা।
এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে দেশের মৎস্য চাষের জটিল সরবরাহ শৃঙ্খলের সংকট। চাষির পুকুর থেকে শুরু করে ভোক্তার রান্নাঘর পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খরচ বেড়েছে জ্যামিতিক হারে। মৎস্য খামারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মাছের উৎপাদন ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশটি যায় ফিড বা প্যাকেটজাত খাবারের পেছনে। বৈশ্বিক বাজারে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের মূল্যের ওঠানামার অজুহাতে পোলট্রি ও ফিশ ফিড প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো দফায় দফায় খাবারের দাম বাড়িয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ বিলের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, যা সেচ ও পুকুরের পানি ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত মোটরগুলো চালাতে গিয়ে খামারিদের বড় অঙ্কের খরচ বাড়াচ্ছে। ফলে উৎপাদন পর্যায়েই মাছের একক প্রতি খরচ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে চাষিরা বাধ্য হয়ে পাইকারি বাজারে আগের চেয়ে অনেক বেশি দামে মাছ বিক্রি করছেন।
উৎপাদন স্থলের এই বাড়তি খরচের ওপর নতুন করে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিবহন খাতের চরম নৈরাজ্য। দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য আড়ত কারওয়ান বাজারের অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মাছ ঢাকায় নিয়ে আসার ট্রাকভাড়া একলাফে বেড়ে গেছে। অতীতে ময়মনসিংহ বা বৃহত্তর উত্তরাঞ্চল থেকে মাছের একটি পিকআপ বা ছোট ট্রাক ঢাকায় আনতে যেখানে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা খরচ হতো, এখন সেই একই দূরত্বের জন্য পরিবহন ব্যয় গুণতে হচ্ছে ২০ হাজার টাকা কিংবা তারও বেশি। এর পাশাপাশি মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে চাঁদাবাজি, টোল প্লাজার বাড়তি খরচ এবং আড়তে মাছ নামানোর সময় লাইনম্যান ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের নির্ধারিত অপ্রাতিষ্ঠানিক বখশিশের মতো বহুবিধ অদৃশ্য খরচ যুক্ত হচ্ছে। এই সমস্ত অতিরিক্ত ব্যয়ভার শেষ পর্যন্ত গিয়ে চাপছে খুচরা ক্রেতার ঘাড়ে, যার ফলে প্রান্তিক খামারি থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে পৌঁছাতে মাছের দাম দ্বিগুণের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে।
অথচ মৎস্য অধিদপ্তরের নথিপত্র ও পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেশের মিঠাপানির মাছের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন নিয়ে এক অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও স্ফীত চিত্র চোখে পড়ে। দেশের মোট আমিষের চাহিদার একটি বড় অংশ মেটাতে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে কৃত্রিম জলাশয়ের মাছ চাষ। বিশেষ করে ময়মনসিংহ, যশোর, বগুড়া, রাজশাহী এবং কুমিল্লার মতো জেলাগুলো আধুনিক খামার গড়ে তুলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রেখেছে। সরকারি তথ্যমতে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে পুকুরে চাষ হওয়া শীর্ষ আটটি প্রজাতি হলো পাঙাশ, তেলাপিয়া, রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প, কমন কার্প এবং কই। তবে মোট আহরণের সিংহভাগই দখল করে আছে পাঙাশ ও তেলাপিয়া। বিগত ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে পাঙাশ উৎপাদন হয়েছে ৪ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এবং তেলাপিয়া উৎপাদিত হয়েছে ৩ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ কেবল এই দুটি প্রজাতি মিলিয়েই দেশে বার্ষিক উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৫৯ হাজার টনে। কিন্তু এই বিপুল পরিমাণ রেকর্ড উৎপাদনের পরও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা থেকে পণ্য দুটি ছিটকে পড়ার বিষয়টি আমাদের সামগ্রিক বাজার তদারকি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে।
চড়া মূল্যের এই বাজারে কেবল সাধারণ ভোক্তাই দিশেহারা নন, তীব্র ব্যবসায়িক মন্দার মুখে পড়েছেন খুচরা ও প্রান্তিক মাছ বিক্রেতারাও। রাজধানীর বাড্ডা, রামপুরা কিংবা মালিবাগের মতো শ্রমঘন এলাকার মাছের বাজারগুলোতে বিক্রেতাদের অলস সময় পার করতে দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যত বাজারে মানুষের পদচারণা থাকলেও প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ নেমে এসেছে অর্ধেকে। খুচরা বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগে যেসব নিয়মিত ক্রেতা সপ্তাহে তিন থেকে চার দিন এসে অনায়াসে এক বা দেড় কেজি মাছ কিনে নিয়ে যেতেন, তারা এখন সপ্তাহে মাত্র এক বা দুই দিন আসছেন এবং নিচ্ছেন আগের তুলনায় অনেক কম। ফলে বিক্রেতাদের মূলধন আটকে যাচ্ছে এবং সারাদিন বরফ দিয়ে মাছ তাজা রাখার বাড়তি খরচ জোগাতে হচ্ছে। বিক্রি কম হওয়ায় পচনশীল এই পণ্যের অনেক অংশ দিনশেষে অবিক্রীত থেকে নষ্ট হচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ লোকসান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার ঝুঁকিতে ফেলছে।
অর্থনৈতিক এই টানাপড়েনের চেয়েও ভয়ংকর সংকটটি তৈরি হচ্ছে জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুষ্টি সুরক্ষার ক্ষেত্রে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট এবং পুষ্টিবিজ্ঞানীদের অভিমত অনুযায়ী, দেশের সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির আমিষের চাহিদার প্রায় সিংহভাগ পূরণ হতো পাঙাশ ও তেলাপিয়ার মাধ্যমে। ডিমের দামের সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর এই দুটি মাছই ছিল পরিবারের শিশুদের শরীরে প্রয়োজনীয় প্রোটিনের প্রধান জোগানদাতা। এই মাছগুলোর দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার অর্থ হলো কোটি কোটি নিম্নবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকা থেকে আমিষের উপস্থিতি সম্পূর্ণ মুছে যাওয়া। এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে পুষ্টিবিজ্ঞানের ভাষায় ‘লুকায়িত ক্ষুধা’ বা হিডেন হাঙ্গার। পেট হয়তো ভাত আর সস্তা শর্করা দিয়ে ভরে উঠছে, কিন্তু শরীরে দীর্ঘমেয়াদে দেখা দিচ্ছে প্রাণিজ আমিষ, আয়রন ও প্রয়োজনীয় খনিজের মারাত্মক ঘাটতি। বিশেষ করে গর্ভবতী নারী, স্তন্যদানকারী মা এবং বেড়ে ওঠা শিশুদের ক্ষেত্রে এই প্রোটিনহীনতার মারাত্মক পরিণতি হবে সুদূরপ্রসারী, যা তাদের মেধার বিকাশ ও শারীরিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে চিরতরে পঙ্গু করে দিতে পারে।
এই গভীর খাদ্য সংকট থেকে সাধারণ মানুষকে মুক্তি দিতে হলে কেবল পুলিশি অভিযান কিংবা বাজারে লোকদেখানো জরিমানা করে কোনো টেকসই সমাধান আসবে না। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সুস্পষ্ট সুপারিশ হলো, সমস্যার গোড়ায় হাত দিতে হবে। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে বিকল্প ও স্থানীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে কম খরচে মানসম্মত মাছের খাবার তৈরির প্রযুক্তি দ্রুত উদ্ভাবন ও খামারিদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে হবে। পোলট্রি ও ফিশ ফিড প্রস্তুতকারক সিন্ডিকেটগুলোর কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি কঠোর নজরদারির আওতায় আনতে হবে এবং খামারিদের জন্য কৃষি খাতের মতো বিশেষ বিদ্যুৎ ভর্তুকির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মহাসড়কে মাছ পরিবহনের সময় চাঁদাবাজি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। দেশের সবচেয়ে সস্তা মাছ দুটিও যদি সাধারণ মানুষের থালা থেকে হারিয়ে যায়, তবে তা কেবল একটি বাজারের সংকট হিসেবে থাকবে না, বরং তা রূপ নেবে এক দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় মানবিক ও পুষ্টি বিপর্যয়ে।
তথ্যসূত্র: ঢাকা পোস্ট