• মঙ্গলবার, ০৯ জুন ২০২৬, ১১:২১ পূর্বাহ্ন

দীর্ঘমেয়াদি কর রোডম্যাপ: ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ে ৩৫% ট্যাক্স

Reporter Name / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংস্কার এবং রাজস্বের পরিধি বাড়াতে একটি সুদূরপ্রসারী কর রোডম্যাপের ঘোষণা আসতে যাচ্ছে। আগামী বৃহস্পতিবার সম্ভাব্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এই বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত এবং বড় নীতিগত পরিবর্তন হলো উচ্চবিত্তদের ওপর করের হার বৃদ্ধি। ৫ বছরের একটি মধ্যমেয়াদি কৌশলের অংশ হিসেবে আগামী ২০২৮-২৯ অর্থবছর থেকে বার্ষিক ৩ কোটি টাকার বেশি আয়ের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে।

সরকারি কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, এই কড়া সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও চাকরিজীবী করদাতাদের ওপর কোনো প্রভাব পড়বে না; কেবল অল্প সংখ্যক অতি উচ্চ আয়ের মানুষই এই কর সীমার আওতায় আসবেন। তবে অর্থনীতিবিদ এবং কর বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিক নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তাদের মতে, ধনীদের ওপর হঠাৎ এত উচ্চ হারে কর চাপালে দেশ থেকে মেধা পাচার (Brain Drain) এবং অবৈধ উপায়ে পুঁজি পাচারের (Capital Flight) মতো ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ৩০শে জুন পর্যন্ত ব্যক্তিগত আয়করের বিদ্যমান সর্বনিম্ন শূন্য থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশের হারটি অপরিবর্তিত থাকবে। এরপরের অর্থবছর থেকে ৩ কোটির বেশি আয়ের ক্ষেত্রে ৩৫ শতাংশের নতুন স্ল্যাবটি কার্যকর হবে।

করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধি এবং করজাল বিস্তারের নতুন কৌশল

আসন্ন বাজেটে সাধারণ করদাতাদের স্বস্তি দিতে করমুক্ত আয়ের সীমা পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর একটি বড় পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বর্তমান করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকাই বহাল থাকছে। তবে পরবর্তী চার বছরে এটি ধাপে ধাপে বাড়ানো হবে:

  • ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছর: করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হবে।

  • ২০৩০-৩১ এবং ২০৩১-৩২ অর্থবছর: এই সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণির জন্য করমুক্ত আয়ের এই অতিরিক্ত ছাড়ের নীতি আগের মতোই বহাল থাকছে। নারী এবং ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী করদাতারা অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা, প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের করদাতারা ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও জুলাই বিপ্লবের যোদ্ধারা অতিরিক্ত ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সুবিধা পাবেন। এছাড়া বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানদের অভিভাবকেরা প্রতিটি নির্ভরশীল সদস্যের জন্য অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা করমুক্ত সুবিধা পাবেন।

অন্যদিকে করের জাল বিস্তৃত করতে সরকার বেশ কিছু ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করছে। ছাত্র এবং বিশেষ নো-ফ্রিল (No-Frill) অ্যাকাউন্ট ছাড়া যেকোনো সাধারণ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার ক্ষেত্রে এখন থেকে করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএন (TIN) জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হচ্ছে। পাশাপাশি ১৫০ সিসি বা তার বেশি ক্ষমতার মোটরসাইকেল নিবন্ধনের জন্যও টিআইএন লাগবে। এছাড়া কর ফাঁকি রোধে একটি বিশেষ ‘উইথহোল্ডিং আইডেন্টিফিকেশন নম্বর’ (WIN) চালু করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংকিং, ইউটিলিটি ও ভূমি নিবন্ধনের রেকর্ড সরাসরি কেন্দ্রীয় কর ডেটাবেজের সাথে যুক্ত করা হবে। তবে মোটরসাইকেল এবং ব্যাটারিচালিত রিকশামালিকদের ওপর অগ্রিম আয়কর (AIT) আরোপের আগের পরিকল্পনা থেকে সরকার জনস্বার্থে সরে এসেছে।

ব্যবসায়িকদের জন্য সুখবর: উৎসে কর ফেরতযোগ্য ও কর্পোরেট করে নিশ্চয়তা

ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের দাবি মেনে নিয়ে এবারের বাজেটে উৎসে কর (Withholding Tax) কর্তনের ক্ষেত্রে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, উৎসে কেটে নেওয়া কর আর ব্যবসার জন্য ‘ন্যূনতম বা চূড়ান্ত কর দায়’ হিসেবে বিবেচিত হবে না। এটিকে স্রেফ অগ্রিম কর পরিশোধ হিসেবে গণ্য করা হবে, যা বছর শেষে কোম্পানির চূড়ান্ত কর দায়ের সাথে সমন্বয় করা যাবে। যদি কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভুলবশত বা বেশি কর অগ্রিম দিয়ে থাকে, তবে সেই বাড়তি পরিশোধিত টাকা তিন বছর পর সরাসরি ফেরত (Refundable) পাওয়ার আইনি অধিকার পাবে।

কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থার কারণে কম মুনাফা করা কোম্পানিরও কার্যকরী মূলধন (Working Capital) আটকে থাকত, যা বাজারে কৃত্রিম তারল্য সংকট তৈরি করত। নতুন এই আন্তর্জাতিক মানের সংস্কারের ফলে ব্যবসার নগদ টাকার প্রবাহ বাড়বে এবং সামগ্রিক বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী হবে। এছাড়া বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কর্পোরেট করের হার সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। তবে যেসব টেলিকম কোম্পানির ন্যূনতম ২০ শতাংশ শেয়ার পুঁজিবাজারে সাধারণ জনগণের কাছে রয়েছে, তারা ৫ শতাংশ কর্পোরেট কর ছাড় পাবে; ফলে তাদের কর ৪৫ শতাংশ থেকে কমে ৪০ শতাংশে নেমে আসবে।

বাজার নিয়ন্ত্রণে মেগা শুল্কছাড়: দাম কমবে যেসব পণ্যের

মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে এবং দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করতে আসন্ন বাজেটে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও সেবার ওপর কর ও শুল্ক কমানোর ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে:

  • নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য: চাল, গম, আলু, গবাদি পশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেল এবং বীজসহ প্রায় ৬০টি নিত্যপণ্যের অগ্রিম কর বিদ্যমান ৫, ২ ও ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে একবারে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ (০.৫%) শতাংশ করা হচ্ছে।

  • স্বাস্থ্যসেবা ও ডায়ালাইসিস: কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর থাকা আমদানি অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফ করা হচ্ছে, যার ফলে প্রতিবার ডায়ালাইসিস খরচ প্রায় ৬০০ টাকা পর্যন্ত কমে আসবে। এছাড়া প্রতিবন্ধীদের ব্যবহৃত ১৫টি সহায়ক পণ্যের অগ্রিম কর ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হচ্ছে।

  • দেশীয় ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প: দেশে তৈরি মোবাইল ফোন, রেফ্রিজারেটর, এয়ার কন্ডিশনার, ওয়াশিং মেশিন, এটিএম এবং সিসিটিভি যন্ত্রপাতির স্থানীয় উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর চলমান কর অব্যাহতি সুবিধা ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে।

  • ডিজিটাল ও স্টার্টআপ খাত: স্টার্টআপ, ফ্রিল্যান্সার এবং অনলাইন কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বাড়ানো হচ্ছে। ডিজিটাল পেমেন্ট বাড়াতে পিওএস (POS) মেশিনের আমদানি শুল্ক ১০% থেকে কমিয়ে ৫% করা হচ্ছে এবং এর অগ্রিম কর প্রত্যাহার হচ্ছে।

  • স্বর্ণ ও জুয়েলারি: সোনা ও গহনা সরবরাহের ওপর অগ্রিম কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ০.৫ শতাংশ করা হচ্ছে। এছাড়া রিসাইক্লিং কাঁচামালের কর ৩% থেকে কমিয়ে ১% এবং প্যাকেজিং উপকরণের কর ৫% থেকে কমিয়ে ৩% করা হচ্ছে।

  • নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সৌর বিদ্যুৎ: ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখা হবে এবং সৌর বিদ্যুতের বিল পরিশোধের ওপর গ্রাহকদের ৫ শতাংশ কর রেয়াতের সুবিধা দেওয়া হবে।

  • বৈদ্যুতিক যানবাহন (EV): ইভি চার্জিং স্টেশন, বৈদ্যুতিক বাস এবং বৈদ্যুতিক ট্রাক আমদানির ওপর শূন্য শুল্ক নির্ধারণ করা হচ্ছে। ২৫ হাজার ডলার মূল্যের বৈদ্যুতিক গাড়ির আমদানি শুল্ক কমিয়ে ৬৪ শতাংশ এবং ৫০ হাজার ডলার মূল্যের গাড়ির জন্য ৮০ শতাংশ শুল্ক ধার্য হচ্ছে। এছাড়া ইভি গাড়ির নিবন্ধন কর ফ্ল্যাট ২ লাখ টাকার পরিবর্তে ইঞ্জিনের ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।

  • অন্যান্য আমদানিপণ্য: ১ হাজার ৮০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড গাড়ির নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পুরোপুরি প্রত্যাহার হচ্ছে। এছাড়া লিপস্টিকের প্রতি কেজির কাস্টমস মূল্যায়ন মূল্য ৪০ ডলার থেকে কমিয়ে ৩০ ডলার এবং লোশন, ফেস ক্রিমের মূল্য ১০ ডলার থেকে কমিয়ে ৭ ডলার করা হচ্ছে। ১১৩টি আমদানিকৃত পণ্যের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

তবে এই বিশাল করছাড়ের বিপরীতে রাজস্বের ভারসাম্য ঠিক রাখতে আগে ভ্যাট অব্যাহতি পাওয়া ২০টি সাধারণ পণ্যের ওপর নতুন করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সাথে করের পরিধি বাড়াতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে ম্যানুফ্যাকচারিং, পর্যটন এবং ক্রীড়া অবকাঠামোতে নতুন বিনিয়োগের জন্য প্রথম দুই বছরে বিশেষ ‘ত্বরান্বিত অবচয়’ (Accelerated Depreciation) সুবিধা চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

তথ্যসূত্র: টাইমস অব বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category