কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের স্থাপিত সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট, যেখানে গ্রীষ্মের চরম মৌসুমেও সর্বোচ্চ চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি নয়। গাণিতিক হিসাবে উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটেই আটকে আছে, যার ফলে দৈনিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ থেকে ৬ হাজার মেগাওয়াটে। দেশের ১৪৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের অর্ধেকেরও বেশি হয় পুরোপুরি বন্ধ, নয়তো সক্ষমতার নিচে চলছে। এই সংকটের পেছনে সাম্প্রতিক ব্যবস্থাপনার চেয়েও বিগত দেড় দশকে গড়ে ওঠা নীতিগত বিপর্যয়, ক্যাপাসিটি চার্জের অসম চুক্তি, ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি আইনের অপব্যবহার এবং পারিবারিক সিন্ডিকেটের অর্থপাচারই প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
উৎপাদন স্থবিরতার অন্যতম প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালাতে দৈনিক অন্তত ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা সরবরাহ করতে পারছে মাত্র ৮৫০ থেকে ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশীয় গ্যাসকূপ খননে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ না করে আমদানি করা চড়া মূল্যের এলএনজি-নির্ভরতার কারণেই আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা তৈরি হলেই উৎপাদন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কয়লাভিত্তিক পায়রা ও রামপাল কেন্দ্রগুলো বিপুল বকেয়া জমে থাকায় সরবরাহকারীদের কয়লা ঘাটতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে বেসরকারি তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা ৫ হাজার মেগাওয়াট হলেও সরকারের কাছে সাড়ে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি বকেয়া পাওনা আটকে থাকায় উদ্যোক্তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল কিনতে পারছেন না।
এই সংকটের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছিল ২০১০ সালের বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন বা ইনডেমনিটি অ্যাক্টের মাধ্যমে। দরপত্র ছাড়া কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমোদন এবং বিদ্যুৎ না কিনেও ডলারে ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা চাপানো হয়েছিল, তা বিদ্যুৎ খাতকে নিশ্চিত মুনাফার একটি অস্বচ্ছ প্ল্যাটফর্মে পরিণত করে। নীতি নির্ধারণী স্তরে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-এলাহী এবং সাবেক সচিব আবুল কালাম আজাদের ভূমিকা এই কাঠামোর সূচনা করে। পরবর্তীতে টানা এক দশক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর বিরুদ্ধে পারিবারিক ব্যবসায়ী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হাজার কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
মাতারবাড়ীতে ৩০৫ মিলিয়ন ডলারের এলপিজি টার্মিনাল নির্মাণে মাত্র ১০০ ডলার মূলধনের সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত কোম্পানি পাওয়ারকো ইন্টারন্যাশনালকে যুক্ত করা এই সিন্ডিকেটের একটি বড় উদাহরণ। তদন্ত ও নথিপত্র অনুযায়ী, পাওয়ারকোর নিয়ন্ত্রণ ছিল নসরুল হামিদের পারিবারিক হামিদ গ্রুপের নির্বাহী ও আত্মীয়দের হাতে। বিপুর মন্ত্রণালয়ের অধীনে ভিটল ও মারুবেনির মতো আন্তর্জাতিক বিতর্কিত সংস্থাকে দরপত্র ছাড়াই এলএনজি সরবরাহ ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিপুর পরিবার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো প্রিপেইড মিটার, স্মার্ট গ্রিড ও সোলার প্রকল্পসহ বিভিন্ন মেগাপ্রকল্প থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।
নীতিগত লুণ্ঠনের এই অর্থ দেশে ধরে রাখা হয়নি; বরং পাচার হয়েছে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও মাল্টাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিপুল স্থাবর সম্পদ, ক্যাসিনো, রবার ফ্যাক্টরি ও বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে এই অর্থ রূপান্তর করা হয়েছে। সাবেক বিদ্যুৎসচিব ড. আহমেদ কায়কাউসের আমলেও এই লুটপাটের ধারাবাহিকতা বজায় ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। বিগত সরকারের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক অব্যবস্থাপনা, দায়মুক্তিভিত্তিক চুক্তি এবং গ্যাস অনুসন্ধানে অনীহার যে দেনা বিদ্যুৎ খাতে রেখে যাওয়া হয়েছে, সেই অপরিকল্পিত বোঝার খেসারতই আজ সাধারণ মানুষকে অসহনীয় লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে দিতে হচ্ছে।