বিশ্বকাপ ফুটবলের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অনন্য ও রোমাঞ্চকর এক অধ্যায়। প্রায় ৫০০ বছর আগের তৈরি বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন বা পুরোনো ফুটবলটি এই প্রথমবারের মতো সশরীরে উপস্থিত থাকতে যাচ্ছে ফিফা বিশ্বকাপের একটি হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে।
স্কটল্যান্ডের রাজকীয় ইতিহাসের এই প্রাচীন ফুটবলটি আগামী ২৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিতব্য ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের মধ্যকার গ্রুপ পর্বের ম্যাচ উপলক্ষে ম্যাচ ভেন্যুতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রায় পাঁচ শতকের দীর্ঘ ও গৌরবময় ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বৈশ্বিক ফুটবল বিশ্বকাপের আসরের সাথে সরাসরি যুক্ত হতে যাচ্ছে শতাব্দী প্রাচীন এই বলটি।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০-এর দশকে স্কটল্যান্ডের বিখ্যাত ‘স্টার্লিং দুর্গ’ (Stirling Castle)-এর সংস্কার কাজের সময় সেখানকার কুইন্স চেম্বারের একটি প্রাচীন কাঠের প্যানেলের পেছনের অংশ থেকে ধুলোবালি মাখা এই বলটি উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আধুনিক বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও কার্বন ডেটিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত হন যে, বলটি আনুমানিক ১৫৪০ থেকে ১৫৭০ সালের মধ্যকার সময়ে তৈরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ, এটি ছিল স্কটল্যান্ডের তৎকালীন রাজা পঞ্চম জেমস এবং শিশু বয়সের মেরি কুইন অব স্কটসের শাসনকাল।
আজকের দিনের আধুনিক ফুটবলের সাথে এই প্রাচীন বলটির গঠনে রয়েছে আকাশ-পাতাল তফাত। আকারে এটি বর্তমানের বলের চেয়ে কিছুটা ছোট—ঠিক একটি ছোট তরমুজের মতো। বলটি তৈরি করা হয়েছিল মোটা পশুর চামড়ার কয়েকটি খণ্ডকে একসাথে শক্ত সুতো দিয়ে সেলাই করে। আর বলটির ভেতরের অংশে বাতাস ধরে রাখার ব্ল্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল একটি আস্ত শূকরের মূত্রথলি (Pig’s Bladder)। চামড়ার বাইরের অংশটি উল্টো করে সেলাই করা হয়েছিল, যাতে বলের উপরিভাগ বা পৃষ্ঠটি তুলনামূলকভাবে মসৃণ থাকে।
বর্তমানে এই ফুটবলটি ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’ কর্তৃক বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম ফুটবল হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতিপ্রাপ্ত। এটি স্কটল্যান্ডের ‘স্টার্লিং স্মিথ আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়াম’-এর সবচেয়ে মূল্যবান ও ঐতিহাসিক সংগ্রহগুলোর একটি, যেখানে প্রায় ৪০ হাজারের বেশি প্রাচীন শিল্পকর্ম রয়েছে।
অনন্য এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে স্টার্লিং স্মিথ আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়ামের পরিচালক ক্যারোলিন ম্যাথার্স অত্যন্ত উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “এটি আমাদের জাদুঘরের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর ও স্মরণীয় একটি মুহূর্ত। স্টার্লিংয়ের এই অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও জনপ্রিয় ফুটবল আসরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে দেখা আমাদের পুরো স্কটিশ জাতির জন্য অত্যন্ত গর্বের।”
বিশ্বকাপ ভেন্যুর উদ্দেশ্যে স্কটল্যান্ড ছাড়ার আগে স্টার্লিং স্মিথ মিউজিয়ামে বলটিকে এক নজর দেখতে একটি বিশেষ বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। প্রটোকল মেনে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর, ঐতিহাসিক এই ফুটবলটি আগামী ২০ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত মায়ামির বিখ্যাত ‘কোরাল গ্যাবলস মিউজিয়াম’-এ সাধারণ ফুটবলপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের পরিদর্শনের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে। এরপর ২৪ জুনের ম্যাচে ব্রাজিল ও স্কটল্যান্ডের খেলোয়াড়দের সাথে মাঠের মূল আকর্ষণে রূপ নেবে এই ৫০০ বছরের পুরোনো বল।