মধ্যপ্রাচ্যের চরম অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের পাশে থাকার সুষ্পষ্ট ও অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন। রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে পুতিন জোর দিয়ে বলেছেন, মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে বিদ্যমান কৌশলগত সম্পর্ক কেবল অব্যাহত থাকবে না, বরং একে আরও গভীর ও বিকশিত করা হবে। মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ও দীর্ঘস্থায়ী শান্তি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে যা কিছু প্রয়োজন, তা করতে রাশিয়া প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুতিন সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, রাশিয়া নিজের সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে ইরান এবং পুরো অঞ্চলের মানুষের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করবে, যাতে যত দ্রুত সম্ভব এই জনপদে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনির একটি বিশেষ বার্তা পুতিনের হাতে পৌঁছানো। রুশ প্রেসিডেন্ট বৈঠকের শুরুতেই সেই বার্তা পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেন এবং আরাগচিকে অনুরোধ করেন যেন তিনি সর্বোচ্চ নেতার প্রতি তাঁর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও গভীর সম্মান পৌঁছে দেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো এই বার্তার বিষয়বস্তু সুনির্দিষ্টভাবে প্রকাশ না করলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি বর্তমান আঞ্চলিক সামরিক চাপ, বিশেষ করে মার্কিন ও ইসরায়েলি হুমকির মুখে দুই দেশের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়ে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল দিকনির্দেশনা হতে পারে।
রাশিয়ার সাবেক সাম্রাজ্যিক রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে পুতিন ইরানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষায় ইরানি জনগণের ‘সাহসিকতা ও বীরত্বের সঙ্গে লড়াই’-এর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক হামলার তীব্র নিন্দা জানান। পুতিন আশা প্রকাশ করেন যে, ইরানি জনগণ বীরত্বের সঙ্গে তাদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই চালিয়ে বর্তমান কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো দ্রুত কাটিয়ে উঠবে এবং তাদের দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
প্রেসিডেন্ট পুতিনের এই মন্তব্য কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং এটি দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের এক নতুন অধ্যায়ের প্রতিফলন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, গত বছরই রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি ২০ বছর মেয়াদী ঐতিহাসিক কৌশলগত সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে, যা তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও সংহত করবে। এই চুক্তির আওতায় বর্তমানে রাশিয়া ইরানের বুশেহরে দুটি নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎ ইউনিট নির্মাণ করছে। অন্যদিকে, ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান রাশিয়াকে অত্যাধুনিক ‘শাহেদ’ ড্রোন সরবরাহ করেছে, যার উৎপাদন এখন রাশিয়ার ভেতরেই স্থানীয়ভাবে শুরু হয়েছে। এছাড়া, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় দুই দেশ বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম গড়ে তুলেছে, যার মাধ্যমে ইরানের আটটি ব্যাংক ইতিমধ্যেই রুশ কার্ড পেমেন্ট নেটওয়ার্ক বা ‘এমআইএর’-এর সাথে যুক্ত হয়েছে। নিরাপত্তা ফাঁসের মাধ্যমে জানা গেছে যে, ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে ৪৮টি সু-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার জন্য ৬ বিলিয়ন ইউরোর একটি চুক্তি সম্পন্ন করেছে, যা ২০২৬ থেকে ২০৮ সালের মধ্যে তাদের বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী করবে।
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ এই বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, মস্কো চায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকুক। তিনি কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যেকোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ বা হামলার পুনরুক্তি কারও জন্যই কল্যাণকর হবে না এবং তা পুনরায় যুদ্ধাবস্থা ফিরিয়ে এনে পুরো অঞ্চলের স্বার্থকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলবে। এদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাশিয়ার এই অবিচল ও দৃঢ় সমর্থনের জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, রাশিয়ার মতো বন্ধুরা কঠিন সময়ে ইরানের পাশে দাঁড়িয়ে প্রমাণ করেছে যে তেহরান একা নয়। তিনি আরও বলেন, ‘এটি প্রমাণিত যে রাশিয়ার ফেডারেশনের মতো মিত্ররা ঠিক প্রয়োজনের সময়েই ইরানের পাশে থাকে।’ সোমবার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছানোর আগে আরাগচি পাকিস্তান ও ওমান সফর শেষ করেন। মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের একটি সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে, তবে তা অত্যন্ত জটিল এক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। ওমানেও আরাগচি সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও দক্ষিণ পারস্য উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে পরামর্শ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐক্যমতে পৌঁছেছেন। পুতিনের সঙ্গে আরাগচির এই বৈঠককে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তি ভারসাম্যের ক্ষেত্রে রাশিয়ার পুনঃউত্থানের এক স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।