ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে চলমান সংঘাতের মাঝেই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহের জন্য বাড়ানো হয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি স্বাগত জানানোর মতো পদক্ষেপ হলেও, লেবানন ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তেল আবিবের প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে আন্তর্জাতিক মহলে চরম সংশয় রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইল প্রকৃতপক্ষে কোনো শান্তি চায় না; বরং তাদের মূল লক্ষ্য হলো সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ানো শক্তিগুলোকে সমূলে ধ্বংস করা।
যুদ্ধবিরতির আড়ালে ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন
যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার পর যুদ্ধবিরতির এই মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।
এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, তাঁর দেশ লেবাননকে ‘হিজবুল্লাহ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে’ সহায়তা করবে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, লেবাননের প্রকৃত প্রয়োজন হিজবুল্লাহর হাত থেকে নয়, বরং ইসরাইলের নির্মম আগ্রাসন থেকে সুরক্ষা। কারণ, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির ঘোষণা সত্ত্বেও শুক্রবার লেবাননের মাটিতে ইসরাইলের শত্রুতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকতে দেখা গেছে। জায়নবাদী রাষ্ট্রের ‘বৃহত্তর ইসরাইল’ প্রতিষ্ঠার এই স্বপ্ন এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোর জন্য একটি বড় দুঃস্বপ্ন।
ব্যাপক প্রাণহানি ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ
মার্চের শুরুতে সংঘাত শুরুর পর থেকে ইসরাইল লেবাননে নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।
প্রাণহানি: ইসরাইলি হামলায় লেবাননে এখন পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা ২,২০০ ছাড়িয়েছে।
সাংবাদিক হত্যা: গত বুধবার ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন লেবাননের প্রখ্যাত সাংবাদিক আমাল খলিল। লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাওয়াফ সালাম এই হত্যাকাণ্ডকে সুস্পষ্ট ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানজুড়ে ইসরাইলের এই ধারাবাহিক আগ্রাসন আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধেরই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দখলদারিত্ব ও হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার রাজনীতি
ইসরাইল-লেবানন আলোচনার মূল লক্ষ্য হিসেবে বারবার হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার বিষয়টি সামনে আনা হচ্ছে। তবে এই দাবিকে অনেকেই অযৌক্তিক বলে মনে করছেন।
প্রকৃত দাবি কী হওয়া উচিত? আলোচনার মূল ভিত্তি হওয়া উচিত লেবাননের ভূখণ্ড থেকে ইসরাইলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে আর কখনো এই আরব রাষ্ট্রে হামলা না করার অঙ্গীকার।
অব্যাহত দখলদারিত্ব: ১৯৪৮ সাল থেকেই ইসরাইল নিয়মিতভাবে লেবাননের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে আসছে। বর্তমানে তারা লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে একটি তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চল’ দখল করে রেখেছে এবং সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস করছে।
ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী এই অবৈধ দখলদারিত্ব সম্পর্কে দম্ভভরে বলেছেন, ‘আমরা যাচ্ছি না।’ এমনকি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে চরমপন্থী ইসরাইলি বসতিস্থাপনকারীরাও সিরিয়া ও লেবাননে ঢুকে পড়ার দুঃসাহস দেখিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান
লেবানন দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি আগ্রাসন ও অভ্যন্তরীণ সংঘাতের শিকার। হিজবুল্লাহর অস্ত্রের বিষয়টি সম্পূর্ণ লেবাননের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের শর্ত চাপিয়ে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে লেবাননের সব রাজনৈতিক শক্তিকে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসানে একযোগে কাজ করতে হবে। তাদের খেয়াল রাখতে হবে, কোনো তথাকথিত ‘শান্তি চুক্তি’ যেন পরোক্ষভাবে আত্মসমর্পণের হাতিয়ারে পরিণত না হয়। পাশাপাশি, ওআইসি (OIC) এবং আরব লীগের মতো আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে এই অঞ্চলে অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করতে হবে, যাতে ইসরাইল স্থায়ীভাবে এই আগ্রাসন বন্ধ করে এবং ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের জন্য জবাবদিহির মুখোমুখি হয়।