• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন
Headline
পায়ের নিচে পৃথিবী বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: ক্লাস চলাকালে বহু শিক্ষার্থী অপহরণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইরানের তীব্র ক্ষোভ, বিশ্ববাসীকে ‘কঠোর বার্তা’ তেহরানের ট্রাম্প ফিরতেই বেইজিং যাচ্ছেন পুতিন: দুই পরাশক্তির বৈঠকে নজর বিশ্ব মহলের নগরের দায়িত্ব পেলে নাগরিক সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবো: সাদিক কায়েম আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা পাকিস্তানের, পাঁচ নতুনের অভিষেক বিসিবির অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবিতে এবার বুলবুল-ফারুকদের রিট

বড় লোকসানে ইসলামী ব্যাংক, সর্বোচ্চ মুনাফা ব্র্যাক ব্যাংকের

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে সুশাসন ও নিয়ম মেনে চলার প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) আর্থিক প্রতিবেদনে। দেশের অন্যতম প্রধান বেসরকারি ব্যাংক ব্র্যাক ব্যাংক সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়সহ (সমন্বিত হিসাবে) এই তিন মাসে রেকর্ড ৫৭৭ কোটি টাকা নিট মুনাফা অর্জন করেছে। এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা গেছে দেশের সবচেয়ে বড় বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে। একই সময়ে ব্যাংকটি বড় ধরনের সংকটে পড়ে ২৮৮ কোটি টাকা লোকসান গুনাল।

সম্প্রতি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক দুটির প্রকাশিত শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) এবং তাদের মোট শেয়ার সংখ্যা বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংকসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, দেশের শীর্ষ দুই ব্যাংকের এই বিপরীতমুখী পারফরম্যান্স আসলে পুরো ব্যাংকিং খাতেরই বর্তমান বাস্তবচিত্র। যেসব ব্যাংক আইন ও সুশাসন বজায় রেখে সঠিক পদ্ধতিতে ব্যবসা পরিচালনা করেছে, তাদের মুনাফায় চমত্কার প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, যেসব ব্যাংকে নিয়ম-নীতির ব্যত্যয় ঘটেছে বা সুশাসনের অভাব ছিল, সেগুলো এখন চরম লোকসান ও তারল্য সংকটে ধুঁকছে।


ব্যাংক খাতের সামগ্রিক চিত্র: মুনাফা বনাম লোকসান

গত বুধবার পর্যন্ত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত ৩১টি ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংক তাদের প্রথম প্রান্তিকের অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বা ইপিএসের তথ্য প্রকাশ করেছে। সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ২৪টি ব্যাংকের মধ্যে ২০টি ব্যাংক কম-বেশি মুনাফা করতে সক্ষম হয়েছে। তবে বাকি ৪টি ব্যাংক বড় অঙ্কের লোকসানের তথ্য দিয়েছে।

মুনাফায় থাকা ২০টি ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিকের মোট নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা (সমন্বিত হিসাবে)। গত বছরের একই সময়ে এই ব্যাংকগুলোর মোট মুনাফা ছিল ১ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এই ২০টি ব্যাংকের মুনাফায় সামগ্রিকভাবে ২৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে মুনাফায় থাকলেও এর মধ্যে ৬টি ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় কমে গেছে।

অন্যদিকে, লোকসান করা ৪টি ব্যাংকের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। গত বছরের প্রথম প্রান্তিকে এই ব্যাংকগুলোর মোট লোকসানের পরিমাণ ছিল মাত্র ৯৭৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে লোকসানি ব্যাংকগুলোর লোকসানের পাল্লা আশঙ্কাজনকভাবে ভারী হয়েছে। লোকসানের শীর্ষে থাকা ন্যাশনাল ব্যাংক এককভাবে সর্বাধিক ১,১৩৩ কোটি টাকা লোকসান করেছে। এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংক ৮৬১ কোটি টাকা এবং এবি ব্যাংক ৮২৬ কোটি টাকা লোকসান রেকর্ড করেছে।


ব্র্যাক ব্যাংকের শীর্ষস্থান ও ইসলামী ব্যাংকের লোকসানের কারণ

চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ব্র্যাক ব্যাংক ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতি শেয়ারের বিপরীতে ২ টাকা ৯০ পয়সা মুনাফা (ইপিএস) অর্জন করেছে। গত বছরের একই সময়ে ব্যাংকটির ইপিএস ছিল ২ টাকা শূন্য ২ পয়সা। ব্র্যাক ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তাদের এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ মূলত দুটি—ঋণের বিপরীতে সুদ আয় বৃদ্ধি এবং বুদ্ধিমত্তার সাথে নিরাপদ খাতে বিনিয়োগ। প্রথম প্রান্তিকে বাজারে ঋণের চাহিদা কিছুটা কম থাকায় ব্যাংকটি তাদের অতিরিক্ত তারল্য অলস বসিয়ে না রেখে সরকারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে, যা থেকে বড় অঙ্কের নিশ্চিত মুনাফা আসে। পাশাপাশি ব্যাংকের কমিশন, এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারেজসহ অন্যান্য সেবামূলক খাত থেকেও আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

এর বিপরীতে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি তাদের বড় অঙ্কের লোকসানের পেছনে ভিন্ন কারণ দেখিয়েছে। ব্যাংকটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে আমানতকারীদের আকৃষ্ট করতে আমানতের বিপরীতে মুনাফা বা সুদের হার বাড়াতে হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকের কস্ট অব ফান্ড (তহবিল ব্যয়) বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সাথে, ব্যাংকের খেলাপি বিনিয়োগ বা মন্দ ঋণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগ থেকে কাঙ্ক্ষিত আয় আসেনি। এই দুইয়ের প্রভাবেই ব্যাংকটি বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছে।


প্রবৃদ্ধিতে চমক ডাচ্-বাংলা ও সিটির, পিছিয়ে পড়া অন্য ব্যাংকগুলো

টাকার অঙ্কে নিট মুনাফার দিক থেকে ব্র্যাক ব্যাংক সবার চেয়ে এগিয়ে থাকলেও, শতকরা হিসেবে শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএস প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের ইপিএস দাঁড়িয়েছে ২ টাকা ৭০ পয়সায়, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ৯২ পয়সা। সেই হিসাবে ব্যাংকটির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯৩ শতাংশের বেশি।

মুনাফা প্রবৃদ্ধির দৌড়ে এর পরের অবস্থানেই রয়েছে দি সিটি ব্যাংক। ১৫৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিয়ে ব্যাংকটির প্রথম প্রান্তিকে ইপিএস অর্জিত হয়েছে ১ টাকা ৫৮ পয়সা, যা আগের বছর ছিল মাত্র ৬১ পয়সা। এছাড়া সাউথইস্ট ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয়ও গত বছরের ৪০ পয়সা থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়ে ৯৯ পয়সায় উন্নীত হয়েছে। অন্যদিকে, ভালো মুনাফা বজায় রাখলেও ইস্টার্ন ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ও উত্তরা ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রেখেছে।

বিপরীতে, মুনাফায় থাকলেও ৮টি ব্যাংকের আয় ছিল একেবারেই নামমাত্র। ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের বিপরীতে এসব ব্যাংকের সর্বোচ্চ আয় হয়েছে মাত্র ২৯ পয়সা। এই তালিকায় রয়েছে—মার্কেন্টাইল ব্যাংক (২৯ পয়সা), ট্রাস্ট ব্যাংক (২৭ পয়সা), মিডল্যান্ড ব্যাংক (১৭ পয়সা), এনআরবিসি ব্যাংক (১৩ পয়সা), এনআরবি ব্যাংক (১২ পয়সা), সাউথবাংলা এগ্রিকালচারাল ব্যাংক (১৪ পয়সা), ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (৭ পয়সা) এবং স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক (২ পয়সা)।

এছাড়াও বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের মুনাফা গত বছরের তুলনায় সংকুচিত হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক এশিয়ার ইপিএস গত বছরের ১ টাকা ২৯ পয়সা থেকে কমে ৯৮ পয়সায় নেমে এসেছে। ঢাকা ব্যাংকের ইপিএস ৮০ পয়সা থেকে কমে ৫৬ পয়সায় এবং মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ইপিএস ৮৪ পয়সা থেকে বড় পতন ঘটে ২৯ পয়সায় নেমেছে। প্রাইম ব্যাংকের ক্ষেত্রে মুনাফা প্রায় স্থিতিশীল ছিল, তাদের ইপিএস গত বছরের ১ টাকা ৮০ পয়সা থেকে মাত্র ১ পয়সা কমে ১ টাকা ৭৯ পয়সা হয়েছে।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম প্রান্তিকের এই চিত্র পরিষ্কার বার্তা দেয় যে, দেশের ব্যাংকিং খাতে কেবল আগ্রাসী ব্যাংকিং বা আকার বড় করলেই টেকসই হওয়া যায় না। দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে এবং বিনিয়োগকারীদের ভালো রিটার্ন দিতে সুশাসন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।


সূত্র: সমকাল


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category