মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের ধোঁয়া আর বিশ্বজুড়ে এক চরম উৎকণ্ঠার মধ্যেই চলছে স্নায়ুক্ষয়ী এক কূটনৈতিক লড়াই। একদিকে যখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র পরস্পরকে সর্বাত্মক ধ্বংসের হুমকি দিচ্ছে, ঠিক তখনই পর্দার আড়ালে চলছে যুদ্ধবিরতির এক জটিল ও মরীচিকা সমতুল্য দরকষাকষি। চলমান এই বৈশ্বিক সংকটে আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে ইসলামাবাদ। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের এই অবিস্মরণীয় উত্থান দেশটির ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পারমাণবিক শক্তিধর একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান এমন এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করছে, যা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের নিরলস প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতা এরই মধ্যে পূর্ব থেকে পশ্চিম, এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকারও প্রশংসা কুড়িয়েছে। কিন্তু এত কিছুর পরও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির কোনো স্পষ্ট রূপরেখা এখনো দৃশ্যমান নয়। দুই চিরশত্রু দেশের অনড় অবস্থান ও শর্তের বেড়াজালে আটকে আছে বৈশ্বিক শান্তির ভবিষ্যৎ।
যুদ্ধবিরতির এই আলোচনা যেন এক লুকোচুরি খেলায় পরিণত হয়েছে। শান্তি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া এবং বর্জন করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতায় মেতেছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। সম্প্রতি পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এক আকস্মিক ও নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদে পৌঁছে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে গভীর আলোচনায় বসে। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা পাকিস্তানে পৌঁছানোর আগেই ইরানি প্রতিনিধিরা ইসলামাবাদ ত্যাগ করেন। এর আগে অবশ্য তারা তেহরানে ফিরে গিয়ে নিজেদের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও একটি কৌশলগত বৈঠক সম্পন্ন করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি এক টেবিলে না বসার যে পূর্বঘোষণা ইরানের ছিল, তারা সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। ফলশ্রুতিতে, একপ্রকার মুখ রক্ষার্থেই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন তাদের প্রতিনিধিদের পাকিস্তান সফর বাতিলের ঘোষণা দেয়। তবে এই কূটনৈতিক অচলাবস্থার জন্য এককভাবে কাউকেই দায়ী করা যাচ্ছে না, বরং এটি দুই দেশের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়েরই একটি অংশ মাত্র।
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে মূলত পাঁচটি মৌলিক শর্তকে কেন্দ্র করে, যেখানে কোনো পক্ষই বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। প্রথমত, ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পূর্ণ ও চিরস্থায়ী অবসান। কিন্তু তেহরান এই প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়ে জানিয়েছে, তারা বড়জোর কয়েক বছরের জন্য এই কর্মসূচিতে কিছু বিধিনিষেধ মানতে পারে, তবে স্থায়ীভাবে তা কখনোই বন্ধ করা হবে না। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মহলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরানের কাছে মজুত থাকা প্রায় ৪০০ কেজি বা ৮৮০ পাউন্ড উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম। মার্কিন প্রেসিডেন্ট চান এই বিপুল পরিমাণ ইউরেনিয়াম সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে হস্তান্তর করা হোক। বলা বাহুল্য, ইরান চরম অবজ্ঞার সঙ্গে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। পারমাণবিক সক্ষমতার এই চূড়ান্ত পর্যায় থেকে পিছু হঠতে নারাজ তেহরান।
শর্তের লড়াইয়ের তৃতীয় এবং সবচেয়ে সংকটময় দিকটি হলো সামুদ্রিক অবরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ। ইরান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বিভিন্ন বন্দর ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের ওপর যুক্তরাষ্ট্র যে অবৈধ অবরোধ আরোপ করে রেখেছে, তা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিতে কোনো মার্কিন বা মিত্র দেশের জাহাজ চলতে দেওয়া হবে না। বিশ্ববাণিজ্যের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ওপর ইরানের এই নিয়ন্ত্রণ গোটা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে খাদের কিনারে ঠেলে দিয়েছে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান হলো, চূড়ান্ত এবং স্থায়ী কোনো চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে ইরানের ওপর থেকে কোনো ধরনের সামরিক বা অর্থনৈতিক অবরোধ তোলা হবে না। এই অনড় অবস্থানের কারণে সমুদ্রপথে অচলাবস্থা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
চতুর্থ এবং পঞ্চম শর্ত দুটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক। একটি দীর্ঘস্থায়ী শান্তি চুক্তির অংশ হিসেবে ইরান তাদের ওপর আরোপিত সমস্ত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পাশাপাশি বিদেশে আটকে থাকা নিজেদের প্রায় ২ হাজার কোটি বা ২০ বিলিয়ন ডলার ফেরত চেয়েছে। এর চেয়েও বড় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে ইরানের ক্ষতিপূরণ দাবি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর ভয়াবহ বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের সামরিক, বেসামরিক এবং অবকাঠামোগত যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে তেহরান প্রায় ২৭ হাজার কোটি বা ২৭০ বিলিয়ন ডলার দাবি করে বসেছে। স্বাভাবিকভাবেই ওয়াশিংটন এই বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণের দাবিকে কোনো পাত্তাই দিচ্ছে না। অর্থনীতি ও মর্যাদার এই লড়াইয়ে দুই দেশই তাদের শেষ তাসটি সযত্নে লুকিয়ে রেখেছে।
সামরিক ময়দানেও বাগ্যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী অত্যন্ত কড়া ভাষায় হুঁশিয়ার করে দিয়েছে যে, তাদের এই সাময়িক যুদ্ধবিরতি বা নীরবতাকে যেন কোনোভাবেই দুর্বলতা হিসেবে না দেখা হয়। শত্রুপক্ষ যদি ভুল হিসাব-নিকাশ করে বা নতুন করে কোনো আগ্রাসনের দুঃসাহস দেখায়, তবে তাদের ধারণার চেয়েও ভয়ংকর এবং নারকীয় এক ঝড়ের মুখোমুখি হতে হবে। ইরানের সামরিক বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত এবং শক্তিশালী। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের কথা তারা বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টও আন্তর্জাতিক চাপ ও অবরোধের কাছে মাথা নত না করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
হামলার আশঙ্কায় প্রহর গুনছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। কারণ, ইসরায়েল হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারা ইরানে একটি চূড়ান্ত ও সর্বাত্মক আঘাত হানার জন্য কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ভাষায়, তারা খামেনি যুগের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে বদ্ধপরিকর। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী তাদের সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং প্রতিরক্ষামূলক ও আক্রমণাত্মক—উভয় ধরনের পরিস্থিতির জন্যই তারা প্রস্তুত। ওয়াশিংটনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ইসরায়েল তাদের সামরিক বিকল্পগুলো উন্মুক্ত রেখেছে, যা যেকোনো মুহূর্তে পুরো অঞ্চলকে আবারও এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এই চরম উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নেতৃত্বে চলছে এক অভূতপূর্ব গোপনীয়তা। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের এক যৌথ ও প্রাণঘাতী হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়তুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর, ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন তাঁর পুত্র আয়তুল্লাহ মোজতবা খামেনি। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তাঁকে একবারের জন্যও জনসমক্ষে দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের গভীর অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই ভয়াবহ হামলায় মোজতবা খামেনি নিজেও মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। তাঁর মুখমণ্ডল এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, একাধিক প্লাস্টিক সার্জারির প্রয়োজন পড়েছে। তবে শারীরিকভাবে আহত হলেও মানসিকভাবে তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ ও দেশ পরিচালনায় সক্রিয় রয়েছেন। বিশ্ববাসীর কাছে নতুন সর্বোচ্চ নেতাকে দুর্বল বা ভঙ্গুর হিসেবে উপস্থাপন না করার জন্যই এই দীর্ঘ অন্তর্ধানে রয়েছেন তিনি। তাঁর যাবতীয় নির্দেশাবলি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সংবাদ পাঠকদের মাধ্যমে জনগণের কাছে পৌঁছানো হচ্ছে।
নেতৃত্বের এই পালাবদলের সাথে সাথে ইরানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এসেছে নজিরবিহীন পরিবর্তন। ইসরায়েলি গোয়েন্দারা যেন কোনোভাবেই মোজতবা খামেনির বর্তমান অবস্থান শনাক্ত করতে না পারে, সেজন্য আধুনিক সব প্রযুক্তি বর্জন করা হয়েছে। এমনকি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডাররাও তাঁর সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করা থেকে বিরত থাকছেন। অবস্থান গোপন রাখতে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও ইরান এক মান্ধাতা আমলের যোগাযোগ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সর্বোচ্চ নেতার কাছে বার্তা পৌঁছানো এবং তাঁর নির্দেশাবলি বাইরে আনার জন্য হাতে লেখা চিঠি, সিলগালা করা খাম এবং বিশ্বস্ত বার্তাবাহকদের একটি জটিল চেইন ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বার্তাবাহকেরা আধুনিক প্রযুক্তিহীন যানবাহন ব্যবহার করে গোপন ও দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে নেতার নির্দেশ আদান-প্রদান করছেন।
যুদ্ধ কেবল মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এর আঁচ সরাসরি পৌঁছে গেছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অন্দরমহলেও। ইরানে নির্বিচার হামলার প্রতিশোধ হিসেবে ইরানও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সামরিক ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে এবং ইসরায়েলের গভীরে আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালিতে আধিপত্য বিস্তার করে তারা পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজারে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে খোদ পশ্চিমা দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তায়। খোদ ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে এক নৈশভোজে গোলাগুলির ঘটনা মার্কিন নীতিনির্ধারকদের চরম নিরাপত্তাহীনতায় ফেলে দিয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের গ্লুস্টারশায়ারে অবস্থিত যে সামরিক বিমানঘাঁটি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নজরদারি ও সামরিক তৎপরতা চালাতো, সেখানে এক রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও এতে কোনো হতাহত বা উড়োজাহাজের ক্ষতি হয়নি, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এখন নিজেদের ঘরেও সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়।
সব মিলিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সংঘাত এখন আর কেবল দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং বিশ্বব্যবস্থার জন্য এক চরম হুমকিতে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় চলমান এই শান্তি আলোচনা যদি ব্যর্থ হয়, তবে সামনে যে ধ্বংসযজ্ঞ অপেক্ষা করছে, তা হয়তো মানব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এক অধ্যায় হিসেবেই লিপিবদ্ধ হবে। দরকষাকষির এই ফাঁদ থেকে বিশ্ব কবে মুক্তি পাবে, নাকি এই সাময়িক নীরবতা কেবলই আসন্ন কোনো প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, তা সময়ই বলে দেবে।