• মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:১১ অপরাহ্ন
Headline
সিংগাইরে সেনাবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন প্রশিক্ষণ ক্যাম্প পরিদর্শন করলেন প্রধানমন্ত্রী সন্তানের বয়স ১৮ থেকে ২৪: বাবা-মায়ের জন্য ১০টি পরামর্শ শিশু ইরা মনি হত্যা মামলার রায় পেছাল সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সংকেত বহাল সারাদেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা অর্থমন্ত্রীর অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন: তথ্য উপদেষ্টা জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে কোমে খামেনির জানাজা সম্পন্ন স্পেনের কাছে হারের পর পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্তিনেজের পদত্যাগ চিকিৎসাকে বিশেষ সুবিধা নয় অধিকার ভাবার আহ্বান জুবাইদা রহমানের

ভুল জ্বালানি নীতিতে আড়াই লাখ কোটি টাকার ক্ষতি

Reporter Name / ৩ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬

দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে দীর্ঘমেয়াদি অবহেলা এবং ভুল নীতিমালার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সাধারণ জনগণকে এক বিশাল অর্থনৈতিক খেসারত দিতে হচ্ছে। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ উত্তোলনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না করে, বছরের পর বছর ধরে বিদেশ থেকে চড়া মূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ত্রুটিপূর্ণ চুক্তির ফাঁদে পড়ে অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ বা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে, যা বিশেষজ্ঞদের মতে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক অপরাধ। যদি এই অপচয়কৃত বিপুল অর্থের মাত্র ২০ শতাংশ তথা ৫০ হাজার কোটি টাকা সঠিক সময়ে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ফ্রন্ট-লাইন ফান্ড হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তবে বাংলাদেশ আজ প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকার নিজস্ব গ্যাসের মালিক হতে পারত। অর্থনীতিবিদদের স্পষ্ট অভিমত হলো, আমদানির এই আত্মঘাতী ও পরনির্ভরশীল পথ সম্পূর্ণ পরিহার করে সমুদ্রের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদ উন্মোচন করার মধ্যেই দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক মুক্তি ও জ্বালানি সার্বভৌমত্ব লুকিয়ে রয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে ২০১২ এবং ২০১৪ সালে যথাক্রমে মিয়ানমার ও ভারতের সাথে দীর্ঘদিনের সমুদ্রসীমা বিরোধের অবসান ঘটেছিল। এর ফলে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে ১ লাখ ১৮ hide হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের এক বিশাল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইজেড) লাভ করে। বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ঠিক চারপাশেই যখন প্রতিবেশী দুই দেশ দেদারসে গ্যাস উত্তোলন করে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, তখন আমাদের অর্জিত এই বিশাল জলরাশিকে কেবল খাতার কলমে আগামী শতাব্দীর ‘জ্বালানি নিরাপত্তার চাবিকাঠি’ হিসেবে ধরে রাখা হয়েছিল। সমুদ্র বিজয়ের এক দশকেরও বেশি সময় পার হয়ে ২০২৬ সালে এসেও গভীর সমুদ্রের সেই গ্যাস ব্লকে একটিও গ্যাস কূপের শিখা জ্বলতে দেখা যায়নি। বর্তমানে দেশের বড় বড় শিল্পকারখানাগুলো তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে এবং সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণায় জর্জরিত। অথচ এই সংকটের মাঝেই মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্ষয়ে যাচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানিকৃত চড়া মূল্যের এলএনজির পেছনে। এই চরম অব্যবস্থাপনার কারণে এখন প্রশ্ন উঠেছে, কেন এক দশকেও বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান প্রক্রিয়া থমকে রইল এবং এর পেছনে নীতিগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা সুদূরপ্রসারী।

সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশ পুরো সমুদ্রবক্ষকে অগভীর সমুদ্রে ১১টি এবং গভীর সমুদ্রে ১৫টিসহ সর্বমোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করেছিল। তবে আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোকে (আইওসি) ডাকার জন্য দরপত্র আহ্বান করতেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পার করে দেওয়া হয় এক দশকেরও বেশি সময়। ভূরাজনৈতিক পরাশক্তিগুলোর ভারসাম্য রক্ষা এবং নানামুখী কূটনৈতিক টানাপড়েনের অজুহাতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় বছরের পর বছর মূল্যবান সময় নষ্ট করেছে। এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছিল বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সাথে করা ‘উৎপাদন বণ্টন চুক্তি’ বা মডেল পিএসসির ত্রুটিপূর্ণ শর্তাবলী। ২০০৮, ২০১২ এবং ২০১৯ সালের পিএসসি নীতিমালায় গভীর সমুদ্রের গ্যাসের দাম প্রতি হাজার ঘনফুটে সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ২৫ ডলার বেঁধে দেওয়া হয়েছিল। অথচ একই সময়ে প্রতিবেশী মিয়ানমার বা ভারত আন্তর্জাতিক বাজারদরের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ১০ থেকে ১৪ ডলার পর্যন্ত দামের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিয়ে বড় বড় কোম্পানিগুলোকে নিজেদের সমুদ্রসীমায় টেনে নিয়েছিল। দরদামের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে টোটাল এনার্জি বা কনোকোফিলিপসের মতো বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ শুরু করেও মাঝপথে কাজ ফেলে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এছাড়া পুরো সমুদ্রসীমার ভূতাত্ত্বিক তথ্য সংবলিত কোনো ‘ডেটা ব্যাংক’ বা ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ (থ্রি-ডি সিসমিক সার্ভে) না থাকায় বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছে বাংলাদেশের ব্লকে বিনিয়োগ করাকে অন্ধকারে কোটি ডলারের জুয়া খেলার মতো মনে হয়েছে।

অনুসন্ধানের এই দীর্ঘসূত্রতার পেছনে দেশের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ‘আমদানি লবি’ বা স্বার্থান্বেষী সিন্ডিকেটের হাত ছিল বলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। এই চক্রটি দেশের অভ্যন্তরে বা সমুদ্রে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানের চেয়ে বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির কমিশন ও বাণিজ্যের দিকেই নীতিনির্ধারকদের মনোযোগ ঘুরিয়ে রাখতে বেশি আগ্রহী ছিল। ফলে দেশীয় একমাত্র গ্যাস অনুসন্ধানকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা ‘বাপেক্স’ কিংবা পেট্রোবাংলাকে সমুদ্রে নামানোর জন্য অর্থ বরাদ্দ বা কোনো কার্যকর রাজনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বিগত ২০১৬ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক দশকের সরকারি ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে বসিয়ে রেখে গত ১০ বছরে কেবল ক্যাপাসিটি চার্জ বা কেন্দ্রভাড়া বাবদই দিতে হয়েছে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে, ২০১৮ সাল থেকে শুরু করে গত ৮ বছরে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানিতে সরকারের ব্যয় হয়েছে প্রায় এক লাখ ১০ হাজার কোটি থেকে এক লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর চূড়ান্ত ফলাফল হলো, এই দুটি আত্মঘাতী খাতে গত এক দশকে বাংলাদেশের প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা অর্থাৎ ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ সম্পূর্ণ অপচয় হয়ে গেছে, যার সিংহভাগই দেশের মূল্যবান ডলারে পরিশোধ করতে হয়েছে।

অথচ এই অপচয় করা অর্থের সামান্য অংশ সঠিক খাতে ব্যবহার করলে দেশের পুরো জ্বালানি মানচিত্র বদলে যেতে পারত। গভীর ও অগভীর সমুদ্রে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি নতুন গ্যাস অনুসন্ধান কূপ খনন করতে গড়ে ১ হাজার কোটি টাকা বা ১০০ মিলিয়ন ডলারের মতো খরচ হয়। যদি গত ১০ বছরের মোট অপচয়ের মাত্র ২০ শতাংশ অর্থাৎ ৫০ হাজার কোটি টাকা নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে বরাদ্দ করা হতো, তবে সমুদ্র ও স্থলভাগে প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি উচ্চপ্রযুক্তির অনুসন্ধান কূপ খনন করা সম্ভব ছিল। আন্তর্জাতিক ভূতাত্ত্বিক নিয়ম ও সাফল্যের হার অনুযায়ী, প্রতি ৩ থেকে ৪টি অনুসন্ধান কূপে একটি সফল গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। সেই হিসাবে মাঝারি ও বড় মেয়াদের অন্তত ৫টি নতুন সমৃদ্ধ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হতে পারত। এই পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্র থেকে যদি ন্যূনতম পাঁচ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট) গ্যাস পাওয়া যেত, যা দেশের বর্তমান মোট মজুদের প্রায় সমান, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি এমসিএফ ১০ ডলার হিসাবে সেই গ্যাসের বর্তমান বাজার মূল্য দাঁড়াত প্রায় ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ছয় লাখ কোটি টাকা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকটের পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যখন আকাশচুম্বী হয় এবং তীব্র ডলার সংকটে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি কোণঠাসা হয়ে পড়ে, তখন দেরিতে হলেও সরকারের নীতিতে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের শেষের দিকে পিএসসি সংশোধন করে গ্যাসের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সাথে যুক্ত করার পর মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট এক্সনমোবিল এবং শেভরন বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে কাজ করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে পেট্রোবাংলার বর্তমান ধীরগতির পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ সালে শুরু হওয়া দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে, চুক্তি সই এবং প্রাথমিক জরিপ শেষ করে গভীর সমুদ্রে প্রথম পরীক্ষামূলক কূপ খনন করতেই ২০২৬-২৭ সাল পার হয়ে যাবে। আর যদি সেখানে সৌভাগ্যবশত বিপুল গ্যাসের সন্ধান মেলেও, তবে সমুদ্রের তলদেশ থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে এনে দেশের শিল্পকারখানায় পৌঁছাতে ২০৩০ থেকে ২০৩২ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এই হিসাব ও দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে সময়মতো বিনিয়োগ না করে বিদেশ থেকে তৈরি গ্যাস আমদানি করা দেশের অর্থনীতির জন্য কতটা বিপর্যয় ডেকে এনেছে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category