বিশ্ব রাজনীতি যখন নতুন এক বহুমাত্রিক মেরুকরণের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে, তখন ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থরক্ষায় বিভিন্ন পরাশক্তি ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো নতুন নতুন নিরাপত্তা জোট গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতার ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’। গত ৭ আগস্ট পবিত্র নগরী মক্কায় এক শীর্ষ সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরোধ সক্ষমতা জোরদার এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষার অঙ্গীকার সম্বলিত এই চুক্তিতে অন্যতম প্রধান ধারা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে যে—যেকোনো একটি সদস্য দেশের ওপর বহিরাগত সশস্ত্র হামলা হলে তা বাকি দুই দেশের ওপরও হামলা হিসেবে গণ্য হবে।
সৌদি আরবের বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রভাব, তুরস্কের আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ও ন্যাটোভুক্ত প্রতিরক্ষা অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানের পারমাণবিক ও বৃহৎ সামরিক শক্তির সমন্বয়ে গঠিত এই ত্রিদেশীয় বলয়কে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ‘ইসলামিক ন্যাটো’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। যদিও রিয়াদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে এটি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে কিংবা ধর্মীয় অক্ষ গঠনের উদ্দেশ্যে নয়, তবুও কাঠামোটিতে নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির তৎপরতা শুরু হতেই এতে বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার বিষয়ে প্রবল কূটনৈতিক শোরগোল শুরু হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ইতোমধ্যেই এই নতুন নিরাপত্তা বলয়ে যুক্ত হতে ঢাকার আগ্রহের কথা প্রকাশ করেছেন। তবে সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ত্রিপক্ষীয় বলয় বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন সামরিক আধুনিকায়ন ও অর্থনৈতিক লাভের নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে, অন্যদিকে তেমনি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টির মতো বহুমুখী ভূ-কৌশলগত ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য সুবিধাজনক দিকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর প্রযুক্তিগত ও সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। তুরস্কের ড্রোন ও আধুনিক অস্ত্রপ্রযুক্তি, পাকিস্তানের রণকৌশলগত সামরিক অভিজ্ঞতা এবং সৌদি আরবের আর্থিক সহায়তার সমন্বিত সুবিধা থেকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী উন্নত প্রশিক্ষণ ও আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এছাড়া জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দীর্ঘদিন ধরে সফলতার সঙ্গে কাজ করা বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের পেশাদার অভিজ্ঞতাও এই নতুন কাঠামোতে বাড়তি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সামরিক প্রসারের বাইরেও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত। বর্তমানে প্রায় ৩০ লাখ বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরবে কর্মরত আছেন এবং সেখান থেকে প্রতি বছর ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স দেশে আসে। এছাড়া জ্বালানি তেল আমদানি, অবকাঠামোগত অর্থায়ন এবং ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে আরও সুদৃঢ় করতে এই নিরাপত্তা অক্ষের সাথে সম্পৃক্ততা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সুবিধার পাশাপাশি ঝুঁকির পাল্লাও কোনো অংশে হালকা নয়। চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল শর্তটি হলো ‘সম্মিলিত প্রতিরোধ’ বা একজনের ওপর হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে দেখা। মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি অত্যন্ত অস্থিতিশীল হওয়ায় সদস্য কোনো দেশ কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে লিপ্ত হলে বাংলাদেশকেও তার সামরিক দায় বহন করতে হবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এছাড়া সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, ইউএই-ইসরায়েল ঘনিষ্ঠতা এবং প্রস্তাবিত ‘আইএমইসি’ করিডোরকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা চলছে, তার প্রভাবও এই চুক্তির ওপর পড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা তৈরি হতে পারে প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্কে। পাকিস্তান অন্তর্ভুক্ত থাকায় এবং ভারত-ইসরায়েল কৌশলগত অংশীদারিত্বের প্রেক্ষাপটে এই জোটে বাংলাদেশের সরাসরি সম্পৃক্ততাকে দিল্লি কোন দৃষ্টিতে দেখবে, তা ঢাকার জন্য এক বড় ধরনের কূটনৈতিক পরীক্ষা। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমেদ এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের মতো বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হওয়া উচিত ‘সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’। ভারতকে পাশ কাটিয়ে বা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ফাটল ধরিয়ে কোনো দূরবর্তী জোটে অন্ধভাবে যুক্ত হওয়া বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হবে না।
অতএব, বিশ্লেষকদের স্পষ্ট অভিমত হলো—মক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ রূপরেখা, প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা এবং পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতির আইনি বাধ্যবাধকতাগুলো পুরোপুরি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের উচিত হবে কোনো তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত না নেওয়া। সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক সদস্যপদ গ্রহণ না করে বরং পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে যুক্ত থাকা, প্রতিরক্ষা সংলাপ অব্যাহত রাখা এবং কেবল প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের মতো নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতা সীমিত রাখাই হতে পারে সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও নিরাপদ কৌশল। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ তার নিজস্ব কৌশলগত স্বকীয়তা ও সার্বভৌম ভারসাম্য বজায় রেখেই অর্থনৈতিক ও সামরিক সুযোগগুলো কাজে লাগাতে সক্ষম হবে।