• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ পূর্বাহ্ন
Headline
পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে কিশোররা আয়-ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে টিআইবির গবেষণা: দলগুলোর এত টাকা আসে কোথা থেকে রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেলের চাপে সরকারের ব্যাংক ঋণ: চার মাসেই ৪৮ হাজার কোটি টাকার নিট ঋণ বেসরকারি খাতের বড় সংকট: অবসরের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা নেই দেশের ৮১ শতাংশ কর্মীর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযানের ইঙ্গিত, যা বললো রাশিয়া জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মজুরির ব্যবধান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্তরায় শীতে ঘাড় ব্যথার কারণ ও প্রতিকার বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৭ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অগ্নিপরীক্ষা এলজিইডিতে ১৮১ সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ, যোগদান ১০ নভেম্বর

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অগ্নিপরীক্ষা

Reporter Name / ৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনিক সাফল্য ও নীতি বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও নির্ণায়ক এক মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোট দিতে যাচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। মার্কিন কংগ্রেসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস এবং উচ্চকক্ষ সিনেটের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর। বর্তমানে কংগ্রেসের উভয় কক্ষেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অতি সূক্ষ্ম ও ঝুলন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে ট্রাম্পের মেয়াদের বাকি সময়টা কীভাবে কাটবে এবং তাঁর নীতিগুলো কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, তার সম্পূর্ণ চাবিকাঠি লুকিয়ে রয়েছে মঙ্গলবারের এই ভোটের বাক্সে।

বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের এই আশা এবং আত্মবিশ্বাসের মূল ভিত্তি হলো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত নিম্নমুখী হওয়া জনপ্রিয়তার রেটিং। রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ ঐতিহ্য ও পরিসংখ্যান বলে যে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তার সূচক থেকেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায় কতটা ভালো বা খারাপ ফল করবে। বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য নির্বাচনী জরিপ ও তথ্যবিশ্লেষক সাইটগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ৫০ শতাংশের ওপরে থাকলেও অর্থনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জেরে তা দ্রুত কমে তিরিশ শতাংশের কোঠায় নেমে এসেছে। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনার জেরে ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকেই তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আরও বেশি পতন দেখেছে।

ঐতিহাসিক তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রায় এক শতাব্দী ধরে চলা মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোতে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত বড় ধরনের ধাক্কা খায় এবং প্রতিনিধি পরিষদে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আসন হারায়। গত প্রায় দুই ডজন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল আসন সংখ্যা বাড়াতে সমর্থ হয়েছে। ট্রাম্পের এই জনঅসন্তোষকে পুঁজি করে ডেমোক্র্যাট শিবির এমন সব অঙ্গরাজ্য ও আসনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে, যেগুলো এতদিন রিপাবলিকানদের দুর্ভেদ্য দুর্গ বলে বিবেচিত হতো। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির কবলে পড়া সাধারণ আমেরিকানদের ক্ষোভকে বিরোধী দল নিজেদের নির্বাচনী প্রচারের প্রধান হাতিয়ার বানিয়ে মাঠে নেমেছে।

নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের বর্তমান গাণিতিক সমীকরণ অত্যন্ত টানটান উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। সংসদের চারশ পঁয়ত্রিশটি আসনের মধ্যে বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে রয়েছে ঠিক দুইশ আঠারোটি আসন, যা ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য জাদুকরি ন্যূনতম সংখ্যা। এই পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হওয়ায় এবার সবকটি আসনেই নতুন করে লড়াই হচ্ছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে মাত্র আঠারোটি আসনে তীব্র ও সমমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে চোদ্দটি বর্তমানে রিপাবলিকান এবং চারটি ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তবে ডেমোক্র্যাটরা যদি এই সমমুখী আসনগুলোর একটিতেও জয়লাভ করতে না পারে, তবুও কেবল নিজেদের অনুকূলে থাকা নিরাপদ আসনগুলো ধরে রাখতে পারলেই তারা প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কব্জায় নিয়ে নিতে পারবে।

উচ্চকক্ষ সিনেটের ক্ষেত্রে অবশ্য রিপাবলিকানদের অবস্থান কিছুটা তুলনামূলকভাবে শক্ত ও সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। একশ সদস্যবিশিষ্ট সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের হাতে রয়েছে তিপ্পান্নটি আসন, যেখানে ডেমোক্র্যাটদের আসন সংখ্যা পঁয়তাল্লিশ। সিনেটররা ছয় বছরের দীর্ঘ মেয়াদে নির্বাচিত হওয়ায় প্রতি দুই year পর পর এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট গ্রহণ করা হয়, যার অংশ হিসেবে এবার পঁয়ত্রিশটি সিনেট আসনে লড়াই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পঁয়ত্রিশটির মধ্যে মাত্র সাতটি আসনে মূল দ্বিমুখী ও তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে, যার ছয়টিই বর্তমানে রিপাবলিকানদের দখলে। ডেমোক্র্যাটদের যদি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে হয়, তবে এই সমমুখী আসনগুলোর অন্তত চারটিতে জয়ের পাশাপাশি নিজেদের অন্য আসনগুলোও যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে।

ভোটারদের দৈনন্দিন মনস্তত্ত্বে প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান ইস্যুগুলোর মধ্যে অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার সংকট সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চড়া দাম ও মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের যাতায়াত খরচ বহুলাংশে বেড়ে গেছে। তেলের দাম বৃদ্ধির এই তীব্র নেতিবাচক প্রভাব সাধারণ ভোটারের মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে, যা ট্রাম্প প্রশাসনের জনসমর্থনকে মারাত্মকভাবে নাড়া দিয়েছে।

তবে কেবল বিরোধীদের জনপ্রিয়তার পতনই যে রিপাবলিকানদের একমাত্র ভরসা, বিষয়টি এমন নয়; বরং তাদের হাতে রয়েছে অত্যন্ত শক্তিশালী নির্বাচনী তহবিল বা ফাইন্যান্সিয়াল পাওয়ার। নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে এসে রিপাবলিকান পার্টি ও তাদের সহযোগী রাজনৈতিক শাখাগুলোর কাছে শত শত কোটি টাকার নগদ তহবিল জমা রয়েছে, যা তারা বিজ্ঞাপনে মুন্সীয়ানার সঙ্গে ব্যবহার করছে। গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, কেবল সেপ্টেম্বর মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে শত কোটি ডলারের বেশি রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন ও প্রচারণা সম্প্রচার করা হয়েছে, যেখানে রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করেছে। এই বিপুল পরিমাণ বিজ্ঞাপনের জোয়ার শেষ মুহূর্তে দোদুল্যমান ভোটারদের মন জয় করতে এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের সম্ভাব্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা করতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংকটের পাশাপাশি ভোটারদের কাছে স্বাস্থ্যসেবা এবং সীমান্ত নিরাপত্তা বা অভিবাসন নীতিও অত্যন্ত গুরুত্ব পাচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশ কঠোরহস্তে দমন করার পরিসংখ্যান সামনে এনে তাদের অভিবাসন নীতিকে বড় সাফল্য হিসেবে প্রচার করছে। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা আকাশচুম্বী স্বাস্থ্যবিমা এবং চিকিৎসাসেবার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরে বর্তমান প্রশাসনের নীতিগত দুর্বলতাগুলোকে তীব্রভাবে সমালোচনা করছেন। দুই দলের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে আমেরিকার সাধারণ ভোটাররা চরম দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চলেছেন।

সব মিলিয়ে মঙ্গলবারের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন কেবল ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির বাকি সময়কার ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, বরং এটি আমেরিকার আগামী দিনের রাজনৈতিক অভিমুখও পুরোপুরি বদলে দিতে পারে। সাংবিধানিক নিয়মানুযায়ী ট্রাম্পের পক্ষে তৃতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কোনো সুযোগ না থাকায় এই নির্বাচনের পরই রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি দ্রুত সরে যাবে সামনের বছরের বা ২০২৮ সালের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিকে। ডেমোক্র্যাটদের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো কেবল ট্রাম্পের অন্ধ বিরোধিতা না করে নিজেদের সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভিশন জনগণের সামনে সফলভাবে তুলে ধরা।

নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পর মার্কিন কংগ্রেসে ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে মোড় নেবে এবং ওয়াশিংটনের নীতিমালায় কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা দেখার জন্য পুরো বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং আমেরিকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার মাপকাঠি হিসেবে এই মধ্যবর্তী ভোট একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে।

ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন মার্কিন গণতন্ত্রের এক বড় অগ্নিপরীক্ষা।

তথ্যসূত্র: বিবিসি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category