ক্যারিবীয় সাগরের শান্ত জলরাশিতে আবারও বাজতে শুরু করেছে যুদ্ধের দামামা। স্নায়ুযুদ্ধের সেই পুরোনো উত্তাপ যেন নতুন করে ফিরে এসেছে আমেরিকা ও কিউবার মধ্যকার চরম বৈরী সম্পর্কের মধ্য দিয়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেকোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলে রীতিমতো ‘রক্তস্নান’ বয়ে যাবে বলে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল। সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একের পর এক কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি অবরোধ এবং কিউবার শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর নতুন করে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের নিষেধাজ্ঞার পর দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা এখন চরমে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র এবং কমিউনিস্ট শাসিত কিউবার এই প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব এই অঞ্চলকে একটি নতুন সামরিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে জড়িয়ে পড়তে পারে রাশিয়া ও ইরানের মতো যুক্তরাষ্ট্রের অন্য চরম বৈরী রাষ্ট্রগুলোও।
গতকাল সোমবার জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক দীর্ঘ ও কঠোর বার্তায় কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেল সরাসরি ওয়াশিংটনকে এই চরম বার্তা দেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “কিউবা ঐতিহাসিকভাবে কখনোই যুক্তরাষ্ট্র বা বিশ্বের অন্য কোনো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জন্য হুমকি হয়ে দেখা দেয়নি এবং ভবিষ্যতেও আমাদের দিক থেকে এমন কোনো আশঙ্কা নেই। আমরা সব সময় শান্তি ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধে বিশ্বাসী। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি তার সাম্রাজ্যবাদী নীতি থেকে সরে না এসে কিউবায় কোনো ধরনের সামরিক বা আগ্রাসী হামলা চালায়— তাহলে তার পরিণতি হবে সম্পূর্ণ অকল্পনীয়। কিউবার আপামর জনতা সেই আগ্রাসনের এমন জবাব দেবে যা রীতিমতো রক্তস্নানে পরিণত হবে।” প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল তার এই বার্তার মধ্য দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, মার্কিন চাপের কাছে মাথানত করার কোনো পরিকল্পনা হাভানার নেই, বরং নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তারা যেকোনো চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
এই সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত মূলত একটি বিস্ফোরক গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘অ্যাক্সিওস’ তাদের এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে, কিউবা তাদের সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বাড়াতে রাশিয়া এবং ইরানের কাছ থেকে অন্তত ৩০০টি অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন বা চালকবিহীন আকাশযান (ইউএভি) ক্রয় করার চুক্তি করেছে। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এবং পেন্টাগনের শীর্ষ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, এই ড্রোনগুলো কেবল আত্মরক্ষার জন্য নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে। সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, কিউবার ভূখণ্ডে অবস্থিত বিতর্কিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ‘গুয়ান্তানামো বে’ এবং কিউবার সীমান্তবর্তী ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের উপকূলে টহলরত মার্কিন নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর জন্যই এই প্রাণঘাতী ড্রোনগুলো কেনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নাকের ডগায়, সীমান্ত থেকে মাত্র ৯০ মাইল দূরে রাশিয়া এবং ইরানের মতো কট্টর মার্কিন বিরোধীদের অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জামের এই উপস্থিতি ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে চরম আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে।
অ্যাক্সিওসে এই চাঞ্চল্যকর খবর প্রকাশের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র কালক্ষেপণ না করে কিউবার ওপর খড়্গহস্ত হয়। গত রোববার মার্কিন ট্রেজারি মন্ত্রণালয় বা অর্থদপ্তর কিউবার সামরিক এবং বেসামরিক প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের ওপর একযোগে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন কিউবার প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা জি২-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা। এছাড়া কিউবার যোগাযোগমন্ত্রী, জ্বালানিমন্ত্রী, বিচার বিষয়ক মন্ত্রী, সামরিক বাহিনীর অন্তত ৩ জন গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল এবং কিউবার ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাকে এই কালো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে থাকা তাদের যেকোনো সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে এবং কোনো মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান তাদের সাথে কোনো ধরনের ব্যবসায়িক বা আর্থিক লেনদেন করতে পারবে না। আন্তর্জাতিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও তারা চরম বাধার সম্মুখীন হবেন। প্রেসিডেন্ট মিগুয়েল দিয়াজ-কানেলের হুঁশিয়ারি বার্তাটি মূলত এই আকস্মিক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার ঠিক পরের দিনই এসেছে, যা প্রমাণ করে যে কিউবা এই পদক্ষেপকে সরাসরি তাদের রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ হিসেবেই দেখছে।
তবে বর্তমান এই সংকটের শিকড় আরও অনেক গভীরে প্রোথিত। ২০২৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কিউবার প্রতি চরম আগ্রাসী ও বিরূপ নীতি গ্রহণ করেছেন। বারাক ওবামার আমলে কিউবার সাথে যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদেই তা বাতিল করে কিউবাকে পুনরায় ‘সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আর দ্বিতীয় মেয়াদে এসে তিনি কিউবার অর্থনীতিকে সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দেওয়ার কৌশল হাতে নিয়েছেন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো গত দুই মাস আগে কিউবার ওপর আরোপিত মার্কিন জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা। ট্রাম্প প্রশাসনের এই নিষেধাজ্ঞার শর্ত হলো— বিশ্বের যে দেশ বা প্রতিষ্ঠান কিউবাকে জ্বালানি তেল সরবরাহ করবে, তাদের ওপরও মার্কিন সেকেন্ডারি স্যাংশন বা দ্বিতীয় ধাপের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মার্কিন রোষানলে পড়ার ভয়ে কিউবায় তেল পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে কিউবার জ্বালানির প্রধান উৎস ছিল তাদের সমাজতান্ত্রিক মিত্র রাষ্ট্র ভেনেজুয়েলা। চরম অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ভেনেজুয়েলা তাদের উদ্বৃত্ত তেল হ্রাসকৃত মূল্যে বা বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে কিউবায় সরবরাহ করে আসছিল। এই সস্তায় পাওয়া তেলই ছিল কিউবার নড়বড়ে অর্থনীতির একমাত্র ‘লাইফলাইন’ বা জীবনরেখা। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন কঠোর অবরোধের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলা থেকে আসা তেলের চালানগুলো মাঝপথেই আটকে দিচ্ছে বা সরবরাহকারী জাহাজগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছে। ফলে গত দুই মাস ধরে কিউবায় জ্বালানি সংকট এক ভয়াবহ ও চরম রূপ ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, জ্বালানির অভাবে কিউবার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাজধানী হাভানাসহ পুরো দেশজুড়ে দিনের বেশিরভাগ সময় ব্ল্যাকআউট বা বিদ্যুৎহীন থাকছে। কলকারখানা, গণপরিবহন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্ট— অর্থনৈতিকভাবে শ্বাসরোধ করে কিউবার কমিউনিস্ট সরকারের পতন ঘটানো বা অন্তত দেশটিতে একটি ব্যাপক গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্র তৈরি করা।
কিন্তু কিউবার ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, তারা কখনোই বিদেশি চাপের কাছে সহজে নতি স্বীকার করেনি। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি কিউবার জাতিসংঘ দূত এরনেস্তো সোবেরন গুজমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে কিউবার অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “যদি কেউ কিউবাতে আগ্রাসন চালানোর অপচেষ্টা করে, তবে দেশের আপামর জনগণ অবশ্যই সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করবে। এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ পোষণের কোনো অবকাশ নেই।” তিনি ইতিহাসের পাতা উল্টিয়ে স্মরণ করিয়ে দেন যে, গত শতকের ষাটের দশকে (১৯৬১ সালে ‘বে অব পিগস’ বা প্লায়া গিরন হামলায়) যুক্তরাষ্ট্র সিআইএ-র মদদপুষ্ট হয়ে কিউবায় আগ্রাসন চালানোর চেষ্টা করেছিল এবং ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বাধীন কিউবার সামরিক বাহিনী ও সাধারণ মানুষের কাছে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। গুজমান আরও বলেন, “অবশ্য সবাই এখন যুক্তির খাতিরে বলতেই পারে যে সেই ষাটের দশকের দিন আর নেই। ভূ-রাজনীতি পাল্টেছে, এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। হ্যাঁ, আমরাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করি যে এখনকার বৈশ্বিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। কিন্তু পরিস্থিতি যতই ভিন্ন বা কঠিন হোক না কেন, কিউবার স্বাধীনতাকামী জনগণের মানসিকতা ও মাতৃভূমি রক্ষার মনোভাবে এক চুলও পরিবর্তন আসেনি।”
বিশ্লেষকদের মতে, কিউবাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র এবং কিউবার দ্বিপাক্ষিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা বিশ্বের চাপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্বে ইরানের ওপর মার্কিন চাপের পাল্টা জবাব হিসেবে রাশিয়া ও ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের একেবারে দোরগোড়ায় কিউবাকে ব্যবহার করতে চাইছে। কিউবায় ড্রোন সরবরাহ বা সামরিক ঘাঁটির আধুনিকায়নে মস্কো ও তেহরানের এই প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণ আসলে ওয়াশিংটনকে একটি কড়া বার্তা দেওয়া— যুক্তরাষ্ট্র যদি রাশিয়া ও ইরানের সীমানায় হস্তক্ষেপ করতে পারে, তবে তারাও আমেরিকার ‘ব্যাকইয়ার্ড’ বা বাড়ির উঠোনে ঢুকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম। সব মিলিয়ে, ক্যারিবীয় সাগরের এই দ্বীপরাষ্ট্রটি এখন বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর এক নতুন এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক দাবা খেলার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যদি এই উত্তেজনা প্রশমনে দ্রুত কোনো কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে প্রেসিডেন্ট মিগুয়েলের সতর্কবাণী অনুযায়ী একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক সংঘাত ও ‘রক্তস্নান’ হয়তো খুব বেশি দূরে নয়।