• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৩:৩১ অপরাহ্ন
Headline
‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা জ্বালানি মজুতে স্বস্তি, ডিসেম্বরেই খুলছে তৃতীয় টার্মিনাল: তথ্যমন্ত্রীর অভয়বাণী জিলহজের পুণ্যময় দিনগুলো: অফুরন্ত রহমত ও আত্মশুদ্ধির সুযোগ ২৬ হাজার কারখানায় এপ্রিলের বেতন বকেয়া: ঈদের আগে উৎকণ্ঠায় শ্রমিকরা পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ও পুরোহিতদের সরকারি ভাতা বাতিল নতুন পে স্কেলে কার কত লাভ? একনজরে দেখে নিন গ্রেড ও ভাতার চমক কোরবানির আগে পশ্চিমবঙ্গে গরুর হাটে হাহাকার, বিপাকে হিন্দু খামারিরা মিত্রদের চাপে ইরানে হামলা স্থগিত ট্রাম্পের মার্কিন মুলুকে ‘রক্তস্নানের’ হুঁশিয়ারি কিউবার

মিত্রদের চাপে ইরানে হামলা স্থগিত ট্রাম্পের

Reporter Name / ২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত বালুকাবেলায় আবারও বাজতে শুরু করেছিল যুদ্ধের দামামা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্দেশেই হয়তো শুরু হয়ে যেত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ এক সামরিক সংঘাত। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে সেই মহাবিপর্যয়ের পথে আপাতত ‘ব্রেক’ কষেছে বিশ্ব কূটনীতি। মঙ্গলবার (১৯ মে) ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত একটি বড় আকারের সামরিক হামলা চালানোর কথা থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের বিশেষ অনুরোধ এবং পর্দার আড়ালে চলা ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার’ কারণে সেই হামলা সাময়িকভাবে স্থগিত করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে হামলা স্থগিত হলেও মার্কিন সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। হোয়াইট হাউসের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন বিশ্ব রাজনীতিতে যেমন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে থাকা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণগুলো নিয়ে শুরু হয়েছে বিস্তর বিশ্লেষণ।

গত সোমবার জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বার্তায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই এই হামলা স্থগিতের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকজন বিশ্বস্ত মিত্র নেতার সরাসরি অনুরোধের প্রেক্ষিতে তিনি আপাতত সামরিক পদক্ষেপ থেকে পিছিয়ে এসেছেন। তবে এই পিছিয়ে আসাকে কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। ট্রাম্প তার বার্তায় অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, বর্তমানে চলমান এই কূটনৈতিক আলোচনায় যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গ্রহণযোগ্য কোনো চুক্তি বা সমঝোতা অর্জিত না হয়, তবে যেকোনো মুহূর্তে ইরানের বিরুদ্ধে একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান চালাতে মার্কিন সেনাবাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। ট্রাম্প তার পোস্টে পরিকল্পিত এই হামলা সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো সামরিক তথ্য প্রকাশ করেননি। তবে পেন্টাগন এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডকে (সেন্টকম) তিনি নির্দেশ দিয়েছেন, আলোচনা ব্যর্থ হওয়ামাত্রই যেন ইরানের নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিরতিহীন হামলা শুরু করা যায়, তার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখতে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক এবং পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওয়াশিংটন এবং তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করেছিল। প্রকাশ্যে ১৯ মে এমন কোনো সুনির্দিষ্ট হামলার পরিকল্পনার কথা এর আগে ট্রাম্প প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেনি ঠিকই, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার ইরানকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্ক করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক একটি জনসভায় তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘ইরানের জন্য সময় খুব দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। তারা যদি দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে তাদের জন্য আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।’ এই ধরনের আগ্রাসী বক্তব্য থেকে স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছিল যে, সামরিক অভিযানের একটি নীলকশা হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে আগেই চূড়ান্ত হয়ে ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে কূটনীতির জয় হয়েছে, যার মূল কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের।

মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা কেন এই হামলা ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠলেন, তার পেছনে রয়েছে গভীর ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ। ট্রাম্প তার পোস্টে সরাসরি কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতাদের কথা উল্লেখ করেছেন। এই দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও, তারা খুব ভালো করেই জানে যে ইরানের ওপর মার্কিন হামলা হলে তার প্রথম এবং সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগবে তাদের নিজেদের মাটিতেই। প্রথমত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত বর্তমানে তাদের অর্থনীতিকে তেলনির্ভরতা থেকে বের করে আনার জন্য ‘ভিশন ২০৩০’-এর মতো বিশাল সব অর্থনৈতিক প্রকল্পের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এই মুহূর্তে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হলে তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। দ্বিতীয়ত, ইরান এর আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে যে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা চুপ করে বসে থাকবে না। তাদের অত্যাধুনিক ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং হুথি বা হিজবুল্লাহর মতো প্রক্সি বাহিনীগুলো খুব সহজেই সৌদি আরবের তেলক্ষেত্র বা আমিরাতের অত্যাধুনিক শহরগুলোতে পাল্টা আঘাত হানতে পারে। তৃতীয়ত, কাতার সব সময়ই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে আসছে। কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল সামরিক ঘাঁটি আল-উদিদ যেমন রয়েছে, তেমনি পারস্য উপসাগরের বিশাল গ্যাসক্ষেত্রটি তারা ইরানের সাথে ভাগাভাগি করে। তাই নিজেদের অস্তিত্ব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার স্বার্থেই এই আরব মিত্ররা ট্রাম্পকে সামরিক পথ থেকে সরে এসে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য জোরালো চাপ প্রয়োগ করেছে।

ইরান ইস্যুটি যে এখন আর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে নেই, বরং এটি বৈশ্বিক কূটনীতির অন্যতম প্রধান একটি স্নায়ুকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তা ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ফোনালাপগুলো থেকেই স্পষ্ট। হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরান পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গেও দীর্ঘ ফোনালাপ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইসরায়েলের সাথে আলোচনাটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে সরাসরি সামরিক হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে। নেতানিয়াহুর সরকার মনে করে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এবং সামরিক হামলা ছাড়া তাদের থামানোর আর কোনো উপায় নেই। ট্রাম্প হয়তো নেতানিয়াহুকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সামরিক বিকল্পটি এখনও টেবিলের ওপরই রয়েছে।

অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে ট্রাম্পের আলোচনার বিষয়টি বিশ্ব অর্থনীতি এবং তেলের বাজারের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চীন হলো ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বেইজিংয়ের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে। পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। যদি যুদ্ধ বেধে যায় এবং ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে, বিশেষ করে চীনের অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ ধস নামাবে। এছাড়া গত বছরগুলোতে চীন মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনৈতিক প্রভাব অনেক বাড়িয়েছে, এমনকি সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রেও তারা মধ্যস্থতা করেছিল। তাই বিশ্ব অর্থনীতিকে মন্দার হাত থেকে বাঁচাতে এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে শি জিনপিংও হয়তো ট্রাম্পকে সামরিক পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, ট্রাম্প প্রশাসন মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল প্রকল্প এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা চিরতরে বন্ধ করার জন্য একটি সর্বাত্মক চুক্তির জন্য চাপ দিচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগের মেয়াদে ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক ইরান পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে এককভাবে বেরিয়ে গিয়ে ইরানের ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। এর ফলে ইরানের অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়লেও তারা তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি থেকে পিছিয়ে আসেনি। বরং বর্তমানে তারা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ক্ষেত্রে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে খুব সহজেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব। মার্কিন সামরিক বাহিনী এই পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার ছক কষলেও, সেগুলো মাটির অনেক গভীরে এবং পাহাড়ের নিচে সুরক্ষিত থাকায় হামলাটি কতটা সফল হবে, তা নিয়ে পেন্টাগনের শীর্ষ কর্তাদের মধ্যেও সংশয় রয়েছে।

সব মিলিয়ে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান আবারও চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও কূটনৈতিক সমাধানের পথ এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। এই মুহূর্তে বল এখন ইরানের কোর্টে। তারা যদি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরব মিত্রদের শর্তগুলো মেনে নিয়ে একটি নতুন ও দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতায় আসতে রাজি হয়, তবে হয়তো এই যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব। কিন্তু ইরান যদি তাদের আগের অনড় অবস্থানেই স্থির থাকে এবং পশ্চিমা চাপে মাথানত করতে অস্বীকৃতি জানায়, তবে এই ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা’ খুব শিগগিরই মুখ থুবড়ে পড়বে। আর সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়া শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। আপাতত কূটনৈতিক আলোচনা চলমান থাকায় সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানোর একটি ক্ষীণ সুযোগ এখনও অবশিষ্ট রয়েছে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো একজন অনিশ্চিত এবং আগ্রাসী রাষ্ট্রপ্রধানের আঙুল যখন সামরিক হামলার ট্রিগারে ছোঁয়া অবস্থায় রয়েছে, তখন পুরো বিশ্বকে আতঙ্কের প্রহর গুনতেই হচ্ছে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category