বিগত এক দশক ধরে বাংলাদেশের প্রশাসনের শীর্ষ কর্তারা সরকারি ব্যবস্থা এবং নীতি নির্ধারণের পাঠ নিতে নিয়মিত উড়াল দিতেন ভারতে। উত্তরাখণ্ডের মুসৌরির মনোরম পাহাড়ি বাতাসে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী জাতীয় প্রশাসন একাডেমির (LBSNAA) বারান্দায় বসে তাঁরা রপ্ত করতেন আধুনিক প্রশাসনিক কলাকৌশল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির মোড় বদলে যেন রাতারাতি পাল্টে গেছে এক দশকের চেনা সেই দৃশ্যপট। ভারতের দরজা আংশিক বন্ধ হতেই বাংলাদেশ এবার দৃষ্টি ফিরিয়েছে ওপার দিগন্তে। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের একদল উচ্চপদস্থ আমলা এখন প্রশিক্ষণের জন্য অবস্থান করছেন পাকিস্তানের লাহোরে।
ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে স্রেফ প্রশিক্ষণের ভেন্যু বদল মনে হলেও, দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর অন্তর্নিহিত কূটনৈতিক বার্তাটি অত্যন্ত গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ।
২০১৯ সালে দ্বিতীয় দফা এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ভারতের সাথে বাংলাদেশের আমলাদের প্রশিক্ষণের জন্য তৃতীয় মেয়াদে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তির আওতায় গত ১০ বছরে বাংলাদেশের প্রায় ৩ হাজার মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা (অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) মুসৌরিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কথা ছিল এই চুক্তির মেয়াদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হবে।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা ও দিল্লির মধ্যকার সুউচ্চ কূটনৈতিক সম্পর্কে আকস্মিক শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়। অন অ্যারাইভাল বা নিয়মিত ভিসা বন্ধের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্কে এক ধরনের অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি হয়। এর মধ্যে গত এপ্রিলে ভারতের সাথে স্বাক্ষরিত এক বছর মেয়াদী চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। উদ্ভূত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এই চুক্তি নবায়নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে, এক দশকের পুরনো সেই নিয়মিত পথটি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বন্ধ হয়ে যায়।
ভারতের পথ বন্ধ হওয়ার এই শূন্যতার মাঝেই গত ৪ মে থেকে পাকিস্তানের লাহোরের সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে শুরু হয়েছে বাংলাদেশের ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার এক বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রতিনিধি দলে আছেন সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব এবং ১১ জন যুগ্ম সচিব। তাঁরা স্বাস্থ্য সেবা, বাণিজ্য, জনপ্রশাসন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, স্বরাষ্ট্র, স্থানীয় সরকার এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, এই কর্মকর্তাদের যাতায়াত, আবাসন ও প্রশিক্ষণসহ যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করছে পাকিস্তান সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ক্যারিয়ার প্ল্যানিং ও প্রশিক্ষণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মন্ডের ইসলাম জানান, পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে। তবে এটি এখনো দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ‘পরীক্ষামূলক পর্যায়’ বা প্রিলিমিনারি স্টেজে রয়েছে। পথ উন্মোচিত হলেও প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি এখনো হয়নি।
পাকিস্তান সরকার বিগত দিনেও একাধিকবার বাংলাদেশি আমলাদের লাহোরে প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছিল। তবে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনীহার কারণে সেই প্রস্তাবগুলো ফাইলবন্দিই থেকে যায়। ৫ আগস্টের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র সচিব (যিনি পরবর্তীতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব হন) ড. মো. নাসিমুল গনি পাকিস্তান সফরে গেলে এই প্রশিক্ষণ প্রস্তাবটি নতুন গতি পায়। পরবর্তীতে চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিএনপি সরকার গঠন করার পর, পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণপত্র পাঠায় এবং তারই ফলশ্রুতিতে এই ঐতিহাসিক প্রশিক্ষণ শুরু হয়।
লাহোরে বাংলাদেশি আমলাদের এই অবস্থান দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কপালে যে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে, তা স্পষ্ট হয় মে মাসের শুরুতে নেওয়া ভারতের একটি নতুন পদক্ষেপে। ঢাকায় নতুন সরকারের সাথে সম্পর্ক জোড়া লাগানোর অংশ হিসেবে ভারত সরকার ‘ইন্ডিয়ান টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কোপারেশন’ (ITEC) এর আওতায় বিভিন্ন কোর্সে অংশ নিতে বাংলাদেশের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নতুন করে আবেদন আহ্বান করেছে।
গত ৩ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এই বৃত্তির ভিত্তিতে কর্মকর্তাদের আবেদনের অনুরোধ জানিয়েছে। তবে এবারের ধরনটি আগের মতো নয়। আগে মুসৌরির কোর্সগুলো ডিজাইন করা হতো একচ্ছত্রভাবে শুধু বাংলাদেশি আমলাদের জন্য। কিন্তু নতুন আইটেক (ITEC) প্রস্তাবে বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের কর্মকর্তাদের সাথে যৌথভাবে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। ফলে সুযোগ পাবেন সীমিত সংখ্যক কর্মকর্তা। শর্ত কিছুটা জটিল হলেও ভারতের এই নতুন আমন্ত্রণকে ইতিবাচক এবং সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের চেষ্টা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের আমলারা এখন আর কেবল একমুখী বা পূর্বমুখী (ভারত-কেন্দ্রিক) নীতিতে আটকে থাকতে রাজি নন। দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত বাস্তবতায় ঢাকা এখন ভারত ও পাকিস্তান—উভয় দেশের সাথেই সম্পর্কের একটি যৌক্তিক ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ লোক প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (BPATC) সাবেক রেক্টর ও প্রাক্তন সচিব এ কে এম আব্দুল আউয়াল মজুমদার এই বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বাস্তবসম্মত অভিমত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “ভারতেও যাওয়া উচিত, পাকিস্তানেও যাওয়া উচিত। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা এবং শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময় করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো একপাক্ষিক প্রশিক্ষণ নীতি কখনোই দীর্ঘমেয়াদে সঠিক ছিল না।” তিনি আরও যোগ করেন, ভারতের সঙ্গে আগের চুক্তিটি যদি নবায়ন না হয়ে থাকে, তবে তা দ্রুত নবায়ন করা দরকার। একই সাথে বিদেশের মাটিতে এই কোটি কোটি টাকা ব্যয়ের প্রশিক্ষণ শেষ করে আমলারা দেশে ফিরে তা বাস্তবে কতটা কাজে লাগাতে পারছেন, সেই কার্যকারিতা মূল্যায়ন করাও জরুরি।
ইতিহাস সবসময় সরলরেখায় চলে না, মাঝেমধ্যে মোড় নেয়। বাংলাদেশের প্রশাসনিক প্রশিক্ষণের গন্তব্য বদলকে একটি ছোট ঘটনা মনে হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার এক বিশাল ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। বিগত দশকে যে মুসৌরির পথ ছিল আমলাদের প্রধান তীর্থস্থান, ২০২৬ সালে এসে সেখানে লাহোরের দরজা খুলে যাওয়া কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ এখন তার কূটনৈতিক ভারসাম্য নতুন করে সাজাতে চাইছে—যেখানে কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর অন্ধ নির্ভরতা নয়, বরং জাতীয় স্বার্থই শেষ কথা।
সূত্র: দ্যা প্রেস২৪