‘লাফিং গ্যাস’ বা নাইট্রাস অক্সাইড সাধারণত দাঁতের চিকিৎসায় ব্যথানাশক অথবা ‘ক্যানড হুইপড ক্রিম’ (কেক বা খাবারে ব্যবহৃত ক্যানবন্দি ফেটানো ক্রিম) তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই গ্যাস নাকে গেলে একধরনের সাময়িক উচ্ছ্বাস বা ‘হাই’ (High) অনুভূতি হয়, যা অনেকেই জানেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই গ্যাসের বিনোদনমূলক ব্যবহার, বিশেষ করে ছোট ইলেকট্রনিক ‘ভেপ’ (Vape) বা বড় ক্যানিস্টারের মাধ্যমে, যুক্তরাষ্ট্রে এক মারাত্মক আসক্তি ও জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্ম দিয়েছে।
মেগ ক্যাল্ডওয়েলের মর্মান্তিক পরিণতি

মাঝখান থেকে বাঁদিকে দাঁড়ানো মেগ ক্যাল্ডওয়েল যিনি মাত্র ২৯ বছরে মারা গেছেন
ফ্লোরিডার এক তরুণী মেগ ক্যাল্ডওয়েল আট বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিছক বিনোদনের জন্য এই গ্যাস ব্যবহার শুরু করেছিলেন। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির সময় অন্য অনেকের মতোই তার এই আসক্তি চরম আকার ধারণ করে।
তার বোন ক্যাথলিন ডায়ালের মতে, মেগের এই আসক্তি এক পর্যায়ে তার “জীবন নষ্ট করতে শুরু করে”। অতিরিক্ত ব্যবহারের (ওভারডোজ) কারণে মেগ সাময়িকভাবে চলৎশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। তারপরও তিনি এই আসক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।
তিনি স্থানীয় ‘ভেপ শপ’ (যেখানে ধূমপানের সামগ্রী বিক্রি হয়) থেকে বৈধভাবে এই গ্যাস কিনতেন এবং গাড়ির পার্কিং লটে বসেই তা সেবন করতেন। কোনো কোনো দিন তিনি এর পেছনে শত শত ডলার খরচ করতেন। গত বছর নভেম্বর মাসে এমনই একটি ভেপ শপের বাইরের পার্কিং লটে মেগের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ক্যাথলিন বলেন, “ও ভেবেছিল এটা বৈধ জিনিস, তাই এটা ওর ক্ষতি করবে না।”
পরিসংখ্যান কী বলছে?
মেগের এই মর্মান্তিক পরিণতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়:
রিপোর্ট বৃদ্ধি: যুক্তরাষ্ট্রের পয়জন সেন্টারের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২০২৪ সালে স্বেচ্ছায় নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহারের রিপোর্ট ৫৮% বেড়েছে।
মৃত্যুর হার: রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC)-এর তথ্যমতে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে নাইট্রাস অক্সাইডের ‘বিষক্রিয়ায়’ মৃত্যুর সংখ্যা ১১০% এরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
শারীরিক ক্ষতি: মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে ‘হাইপোক্সিয়া’ (মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাব) হয়ে মৃত্যু হতে পারে। নিয়মিত সেবনে ভিটামিন বি-১২ এর চরম অভাব দেখা দেয়, যা স্নায়ু ও মেরুদণ্ডের ক্ষতি করে এবং পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস ডেকে আনতে পারে।
বিপণন কৌশল ও সহজলভ্যতা
কোভিড মহামারির সময় থেকে এর ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়তে থাকে। যুক্তরাজ্য ২০২৩ সালে এর বিনোদনমূলক ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও, যুক্তরাষ্ট্রে এটি এখনো বৈধ (শুধুমাত্র লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্য ছাড়া)। রান্নার কাজে ব্যবহারের নাম করে এটি অবাধে বিক্রি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্যাকেজিং ও বিপণন কৌশলের পরিবর্তনই এর অপব্যবহার বাড়ার মূল কারণ:
আগে এটি ছোট ৮ গ্রামের ক্যানে বিক্রি হতো। এখন অনলাইনে ও ভেপ শপে ২ কেজি পর্যন্ত বড় ক্যানিস্টার বিক্রি হচ্ছে।
‘গ্যালাক্সি গ্যাস’ বা ‘মায়ামি ম্যাজিক’-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো এই ক্যানগুলোতে নজরকাড়া রং এবং ভিডিও গেম বা কার্টুন চরিত্রের ছবি ব্যবহার করছে, যা তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, বড় ক্যানিস্টার থাকায় তরুণদের মধ্যে ‘পিয়ার প্রেশার’ (বন্ধুদের প্ররোচনা বা চাপ) কাজ করছে, ফলে অনেকেই এটি ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন।
সামাজিক মাধ্যমের বিরূপ প্রভাব
গত বছর অনলাইনে এই গ্যাস ব্যবহারের ভিডিওগুলো মারাত্মকভাবে ভাইরাল হয়ে যায়। বিশেষ করে ‘হাই’ হওয়ার ভিডিওগুলো একটি ট্রেন্ডে পরিণত হয়। আটলান্টার এক তরুণের ‘স্ট্রবেরি ও ক্রিম’ ফ্লেভারের নাইট্রাস অক্সাইড টানার একটি ভিডিও প্রায় ৪ কোটি বার দেখা হয়েছে। র্যাপ মিউজিক ভিডিও এবং লাইভ স্ট্রিমিংয়েও এর অবাধ ব্যবহার দেখা যায়।
অবস্থা বেগতিক দেখে টিকটক ‘গ্যালাক্সি গ্যাস’ লিখে সার্চ করার অপশন ব্লক করে দিয়েছে এবং সতর্কবার্তা যুক্ত করেছে। এফডিএ (FDA)-ও মার্চ মাসে এই গ্যাসের বিরূপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে একটি সরকারি সতর্কতা জারি করেছে।
আইনি লড়াই ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
এই গ্যাসের অপব্যবহারের কারণে সড়কে মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটছে। রেডিওলজি টেকনিশিয়ান মারিসা পলিট (২৫) এমন এক গাড়িচালকের ধাক্কায় নিহত হন, যিনি নাইট্রাস অক্সাইড ব্যবহার করে নেশাগ্রস্ত ছিলেন। পরে পলিটের পরিবার ডিস্ট্রিবিউটর ‘ইউনাইটেড ব্র্যান্ডস’-এর বিরুদ্ধে মামলা করে ৭৪.৫ কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ জেতে। আদালত মনে করে, কোম্পানিটি এর অপব্যবহার সম্পর্কে জানত।
মেগ ক্যাল্ডওয়েলের পরিবারও এখন এই গ্যাসের খুচরো বিক্রি চিরতরে বন্ধ করার লক্ষ্যে প্রস্তুতকারক ও ডিস্ট্রিবিউটরদের বিরুদ্ধে ‘ক্লাস অ্যাকশন’ মামলা দায়ের করেছে। মেগের বোন ক্যাথলিনের ভাষায়, “দাঁতের চিকিৎসকদের এই গ্যাস ব্যবহারের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা প্রশিক্ষণ নিতে হয়, আর যে কেউ দোকান থেকে এটি কিনে ব্যবহার করতে পারছে—এই ভাবনাটাই উন্মাদের মতো মনে হয়।”