দেশের রেলপথে লেভেল ক্রসিংগুলো এখন সাধারণ মানুষের জন্য রীতিমতো মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে তিনজনের প্রাণহানি ঘটা সত্ত্বেও থামছে না এই দুর্ঘটনার মিছিল। খোদ রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। রেল দুর্ঘটনার প্রায় ৮৯ শতাংশই ঘটছে লেভেল ক্রসিংয়ে, যার প্রধান কারণ হিসেবে অবৈধ ক্রসিং ও জনবলের অভাবকে দায়ী করা হচ্ছে। এই সংকট কাটাতে এবার লেভেল ক্রসিং ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজড করার পরিকল্পনা করছে সরকার।
সারাদেশে বর্তমানে ২ হাজার ৮৫৬টি রেল ক্রসিং রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় অর্ধেকেরও বেশি (১,৩৬১টি) সম্পূর্ণ অবৈধ বা অনুমোদনহীন। এমনকি বৈধ ১,৪৯৫টি ক্রসিংয়ের মধ্যেও ৬৩২টিতে কোনো স্থায়ী গেটম্যান নেই। রাজধানীর খিলক্ষেত বা মগবাজারের মতো জনবহুল এলাকায় দেখা গেছে করুণ দৃশ্য—কোথাও ভিক্ষুকরা বাঁশ হাতে স্বেচ্ছায় গেটম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন, আবার কোথাও সিগন্যাল অমান্য করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছেন পথচারীরা। গেটম্যানদের অভিযোগ, অনেক সময় বাধা দিলেও চালক ও পথচারীরা গায়ের জোরে পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন।
রেলওয়ে পুলিশের তথ্যমতে, গত ১০ বছরে রেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ২৩৭ জন। অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন বলছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যেই মারা গেছেন ১ হাজার ২৬৯ জন। সাম্প্রতিক সময়ে কুমিল্লায় লেভেল ক্রসিংয়ে বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১২ জনের মৃত্যু দেশজুড়ে ব্যাপক উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনো মান্ধাতা আমলের ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ক্রসিং নিয়ন্ত্রণ করার কারণেই দুর্ঘটনার হার কমছে না।
দুর্ঘটনা বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের শিক্ষক সাইফুন নেওয়াজ মনে করেন, স্থায়ী সমাধানের জন্য অবশ্যই প্রযুক্তির সহায়তা নিতে হবে। এই প্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ইতিমধ্যে অটোমেটিক সিস্টেম চালুর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। নতুন এই পদ্ধতিতে ট্রেন ক্রসিংয়ের কাছাকাছি আসার সাথে সাথেই গেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। পাশাপাশি অবৈধ ক্রসিংগুলো বন্ধ করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেন জানিয়েছেন, অনুমতি ছাড়া ক্রসিং নির্মাণ করা সংস্থাগুলোকে সতর্ক করা হয়েছে। আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা এবং স্বয়ংক্রিয় গেট পদ্ধতি কার্যকর হলে লেভেল ক্রসিংয়ে এই অকাল মৃত্যু রোধ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।