• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:১৯ অপরাহ্ন
Headline
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান মুখোমুখি: হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনায় সমঝোতা অনিশ্চিত প্রশাসকের চেয়ার থেকেই মেয়র প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে বিএনপি নেতারা বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্বিগুণ, দেশে বাড়ানো হয়েছে ‘সামান্য’: জ্বালানিমন্ত্রী নথিতে ‘রেকর্ড মজুত’, বাস্তবে হাহাকার ওসমান হাদি হত্যা: আদালতে দায় স্বীকার করলেন অস্ত্র সরবরাহকারী হেলাল হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ: দায় কার? বোরো ধান ঘরে তোলা নিয়ে চরম শঙ্কা: জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির অভাবে চতুর্মুখী সংকটে কৃষক সংসদের নিয়মে এখনো অভ্যস্ত নন নতুন এমপিরা, ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক ছন্দ অফিসে আপনার কাজ সামলাবে আপনারই ‘ডিজিটাল যমজ’ দেশের কোটি কোটি ডলার পাচার! : কারা খেলল এই ভয়ংকর খেলা — আর কীভাবে ফিরবে সেই সম্পদ?

হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকাবঞ্চিত শিশুর ভবিষ্যৎ: দায় কার?

Reporter Name / ১ Time View
Update : রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬

একটি শিশুর জন্ম যেকোনো পরিবারের জন্যই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আনন্দের বিষয়। কিন্তু সেই নবজাতক যখন রাষ্ট্রের নীতিগত ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনার শিকার হয়ে মায়ের কোলেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে, তখন সেই শোক কেবল একটি পরিবারের থাকে না, তা হয়ে ওঠে গোটা রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল কলঙ্ক। বর্তমানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য খাতে ঠিক এমনই এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অতি সংক্রামক হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে দেশে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমশ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যাকে চিকিৎসকরা ‘জরুরি জনস্বাস্থ্য পরিস্থিতি’ বা মহামারি হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।

গত আড়াই-তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে নতুন নতুন মৃত্যুর খবর আসছে। শুধু হাম নয়, জন্মের পর থেকে ছয় ধরনের নিয়মিত টিকা না পেয়ে দেশের অন্তত ৩০ লাখ শিশু আজ এক ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। এই অরাজকতার পেছনে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং টিকা অব্যবস্থাপনাকেই প্রধানত দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু এতগুলো শিশুর প্রাণহানির পরও এর দায়ভার নেওয়ার বা আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি।

হাসপাতালগুলোর করুণ চিত্র ও পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা

হামের বর্তমান পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ, তা বিভিন্ন হাসপাতাল ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া তথ্যে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। চিকিৎসকদের সংগঠন ‘ডক্টরস প্ল্যাটফর্ম ফর পিপলস হেলথ’ (ডিপিপিএইচ) গত শনিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিস্থিতিকে ‘জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করার জোর দাবি জানিয়েছে।

সংগঠনটির তথ্যমতে, চলতি বছর এখন পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ২৫ হাজার ৬৮৭ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে ১১৩ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং একই সময়ে নতুন করে ৮৬ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত—এই এক মাসেই দেশে মোট ৩ হাজার ২৭৮ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক চিত্র দেখা গেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখানে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় ৭৫ শতাংশেরই বয়স ১০ মাসের কম। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, ১০ মাসের কম বয়সী শিশুদের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা স্বাভাবিকভাবেই খুব কম থাকে। এর ওপর এসব শিশুর একটি বড় অংশ হামের টিকা পায়নি। চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০টির মতো শিশু ভর্তি হচ্ছে। অনেক শিশুর শারীরিক অবস্থার এতটাই অবনতি হচ্ছে যে, তাদের জরুরি ভিত্তিতে এনআইসিইউতে (নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) স্থানান্তর করতে হচ্ছে।

চমেক হাসপাতালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চার শতাধিক শিশুর মধ্যে ২৯২ জনের বয়স ১০ মাসের নিচে। এদের মধ্যে আবার চার থেকে ছয় মাস বয়সী শিশুর সংখ্যা ১৮৬। অথচ চিকিৎসা প্রটোকল অনুযায়ী, ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার পর শিশুদের হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার কথা। কিন্তু ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার কয়েক মাস বাকি থাকার আগেই তারা আক্রান্ত হচ্ছে। চার মাস বয়সী শিশু ফাতিহা জান্নাতের মতো অসংখ্য শিশু হাসপাতালের শয্যায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে, যাদের শরীরে জ্বর ও শ্বাসকষ্টের পাশাপাশি ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. জাহাঙ্গীর আলম জানান, হামের লক্ষণ নিয়ে প্রতিদিনই অনেক শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে এবং এদের বেশিরভাগেরই বয়স একেবারেই কম, যারা টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে যাচ্ছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন সতর্ক করে বলেছেন, হাম শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত দুর্বল করে দেয়, যার ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কের প্রদাহের মতো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।

আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও নীতিগত ব্যর্থতার খতিয়ান

প্রশ্ন হলো, যে দেশে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় সারা বিশ্বে রোল মডেল হিসেবে প্রশংসিত হয়েছিল, সেই দেশে আজ এই টিকা-অরাজকতা কেন? অনুসন্ধানে জানা যায়, এর মূল কারণ হলো বাজেট বরাদ্দ ও টিকা ক্রয় পদ্ধতিতে আনা আকস্মিক ও অপরিকল্পিত পরিবর্তন।

১৯৯৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর সহায়তায় দেশে পাঁচ বছর মেয়াদি স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর প্রোগ্রাম (এইচপিএনএসপি) চালু ছিল। অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) আওতায় পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমেই নিয়মিত টিকা কেনা ও সরবরাহ করা হতো। ২০২৪ সালের জুনে এর চতুর্থ ধাপ শেষ হওয়ার পর পঞ্চম ধাপের জন্য এক লাখ ছয় হাজার ১০০ কোটি টাকার বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর তাদের গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন এই ওপির কার্যক্রম নিয়ে আপত্তি তোলে এবং সেটি বাতিল করে দুই বছর মেয়াদের একটি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোফর্মা (ডিপিপি) কর্মসূচি হাতে নেয়।

ইপিআইয়ের পরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ এই জটিলতার ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ১৯৭৯ সাল থেকে টিকা কেনা হতো উন্নয়ন বাজেট থেকে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেটিকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রাজস্ব খাত থেকে টাকা ছাড়ের পদ্ধতি অত্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি। চলতি অর্থবছরে ইপিআইয়ের জন্য ৮৪২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও, সেই টাকা পাওয়ার জন্য পরিকল্পনা তৈরি করে মন্ত্রণালয় থেকে পাস করাতেই গত বছরের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সময় লেগে যায়।

এরপর সিদ্ধান্ত হয়, ৫০ শতাংশ টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে এবং বাকি ৫০ শতাংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে কেনা হবে। কিন্তু ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কিনতে হলে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করতে হয়। টাকা ছাড়ের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইউনিসেফকে সময়মতো অর্থ দেওয়া সম্ভব হয়নি। যদিও ইউনিসেফ তাদের প্রি-ফাইন্যান্সিং সুবিধার আওতায় ২০০ কোটি টাকার টিকা সরবরাহ করেছিল, কিন্তু তা এরই মধ্যে শেষ হয়ে গেছে। বাকি ২১৯ কোটি টাকা ছাড় হলে আগামী এক-দেড় মাসের মধ্যে হয়তো আরো টিকা পাওয়া যাবে। এই আমলাতান্ত্রিক দড়ি টানাটানির মাঝখানেই দেশের লাখ লাখ শিশু টিকাবঞ্চিত হয়ে মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছে।

দায় কার? রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ি বনাম জনস্বার্থ

এতগুলো শিশুর মৃত্যুর পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—এর দায় কার? সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায় থেকে একে অপরের দিকে আঙুল তোলার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল গত ৬ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরাসরি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং তারও আগের পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারকে এই সংকটের জন্য দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “গত সাড়ে পাঁচ বছর হাম-রুবেলা টিকার কোনো ক্যাম্পেইন হয়নি। অতীত সরকারগুলোর সম্পূর্ণ ভুল ব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থতার কারণেই আজ শিশুদের প্রাণ ঝুঁকিতে পড়েছে।”

একই সুরে কথা বলেছেন সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি সরাসরি ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীও এই প্রাদুর্ভাবের জন্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের গাফিলতিকে দায়ী করেছেন।

তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন বকুল দায় নিরূপণের চেয়ে প্রতিরোধের ওপর বেশি জোর দিয়ে বলেছেন, “সরকার যে টিকা কেনেনি, এটার দায় নিরূপণ করে কি কোনো লাভ আছে? আমাদের এখন হাম প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের কাছে এখন পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন আছে এবং আমরা এর বিরুদ্ধে লড়াই করছি।”

কিন্তু সুশীল সমাজ ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দায় নিরূপণ না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেনের মতে, সরকার চিকিৎসকদের ছুটি বাতিল ও অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগের মতো পদক্ষেপ নিলেও, এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা না করাটা একটি বড় ঘাটতি।

সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন

একটি শিশুর টিকা না পাওয়া কেবল একটি পরিবারের ক্ষতি নয়, এটি রাষ্ট্রের মানবাধিকার নিশ্চিতে ব্যর্থতার চূড়ান্ত প্রতীক। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকারের কথা বলা হয়েছে। ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন ও জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্রের অন্যতম প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ এই পরিস্থিতিকে ‘রাইট টু লাইফ’ বা বেঁচে থাকার অধিকারের ওপর সরাসরি আঘাত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “হাম প্রতিরোধে সরকারি সাহায্য লাভের অধিকার জনসাধারণের সংবিধানস্বীকৃত অধিকার। কোনো সরকার এমন কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যা এই অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ীও শিশুদের সর্বোচ্চ মানের স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত টিকা ক্রয়ব্যবস্থা বাতিল করার আগে এর সম্ভাব্য ঝুঁকি খতিয়ে দেখা অন্তর্বর্তী সরকারের অবশ্য কর্তব্য ছিল।”

তদন্ত কমিশন ও আইনি কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা

জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দায় নিরূপণের জন্য ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কমিশনস অব ইনকোয়ারি অ্যাক্ট’-এর অধীনে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা এখন সময়ের দাবি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিভূতি তরফদারের মতে, “যেহেতু অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচি হঠাৎ বদল এবং দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যুর মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাই এটি একটি জাতীয় জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।”

যদি তদন্তে প্রমাণিত হয় যে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চরম অবহেলা বা খামখেয়ালির মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাতিল করেছিলেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৪(ক) ধারায় ‘অবহেলাজনিত মৃত্যুর’ অভিযোগে ফৌজদারি মামলা করা সম্ভব। এই ধারায় অপরাধ প্রমাণিত হলে পাঁচ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এছাড়া, এই নীতিগত সিদ্ধান্তের পেছনে যদি কোনো আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ মেলে, তবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলা ও তদন্ত করতে পারে।

ইতোমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সশরীরে ক্লাস স্থগিত করে ভার্চুয়াল মাধ্যম চালুর নির্দেশনা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লুৎফে জাহান পূর্ণিমা গত ২ এপ্রিল হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছেন। অন্যদিকে, গত ৬ এপ্রিল আরেক আইনজীবী মোহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কার দায় কতটুকু তা নিরূপণে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছেন। নোটিশে তিনি ড. ইউনূসসহ সাবেক উপদেষ্টাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপের অনুরোধও করেছেন।

বিচার দূরে থাক, এতগুলো শিশুর মৃত্যুর পর আজ পর্যন্ত দায় খোঁজার কাজই আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়নি। শুধু হাম নয়, পোলিও, বিসিজি, পেন্টাভ্যালেন্টসহ আরও পাঁচটি নিয়মিত টিকার অবস্থাও আজ শোচনীয়। টিকা-অরাজকতার এই দীর্ঘ ১৬ মাসে দেশে জন্ম নেওয়া লাখ লাখ শিশু আজ যে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে পড়েছে, তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি হতে পারে পঙ্গুত্ব বা অকাল মৃত্যু।

যারা এই অদূরদর্শী ও খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তাদের বিচারের আওতায় আনা কেবল শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতে জনস্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করার জন্য অপরিহার্য। যেসব মা-বাবা তাদের চোখের সামনে সন্তানদের মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে দেখেছেন, রাষ্ট্র কোনোভাবেই তাদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে এই শূন্যতা পূরণ করতে পারবে না। তবে রাষ্ট্র অন্তত প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে শাস্তির ব্যবস্থা করার মাধ্যমে সেই অভাগা মা-বাবাদের বুকে কিছুটা হলেও সান্ত্বনার প্রলেপ দিতে পারে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category