দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই আসে বোরো মৌসুম থেকে। এই ধান কাটার মৌসুম মানেই গ্রামবাংলায় একসময় উৎসবের আমেজ বিরাজ করত। তবে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। উৎসবের বদলে কৃষকের চোখেমুখে এখন চরম উৎকণ্ঠা। সেচ মৌসুমে জ্বালানিসংকট কোনোমতে সামাল দিলেও, এখন ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহনের মূল সময়ে এসে জ্বালানি ও কৃষியন্ত্রের অভাবে চতুর্মুখী সংকটে পড়েছেন প্রান্তিক কৃষকরা।
মাঠপর্যায়ের কৃষক, যন্ত্রমালিক ও কৃষি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ধান উৎপাদনের ৫টি ধাপেই (কাটা, মাড়াই, সংগ্রহ, পরিবহন ও বাজারজাত) ডিজেল অপরিহার্য। ফলে জ্বালানি সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন ঘটলেই সরাসরি তার প্রভাব পড়ছে ফসল ঘরে তোলার ওপর।
পাম্পে ঘুরেও মিলছে না তেল, বাড়ছে উৎপাদন খরচ
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি ডিজেলচালিত কৃষியন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে সেচযন্ত্র, কম্বাইন হারভেস্টর ও মাড়াই যন্ত্র অন্যতম। বোরো মৌসুমে শুধু কৃষিতেই ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন।
কিন্তু বাস্তব চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। কৃষকদের জন্য জ্বালানি বরাদ্দের সরকারি স্লিপ হাতে নিয়েও পাম্প থেকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। কুষ্টিয়ার কৃষক আনছার উদ্দিন জানান, কৃষি অফিস থেকে স্লিপ নিয়ে সকাল ৯টায় ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দুপুর ১টা পর্যন্ত অপেক্ষায় থেকেও তিনি এক ফোঁটা ডিজেল পাননি।
সরবরাহ ঘাটতির এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অসাধু চক্র। কিশোরগঞ্জের ইটনার কৃষক আব্দুল ওয়াদুদ জানান, সরকারি নির্ধারিত ১০৩ টাকা লিটারের ডিজেল তাঁকে কিনতে হচ্ছে ১৩০ টাকায়। এতে ফসল উৎপাদনের খরচ অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে।
হাওরে সময়ের সঙ্গে দৌড় এবং যন্ত্রের আকাল
দেশের মোট বোরো ধানের ২০ শতাংশ উৎপাদিত হয় হাওরাঞ্চলে (সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ)। এই অঞ্চলে ধান কাটার সময় খুবই সীমিত। আগাম পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে এরই মধ্যে প্রায় সাড়ে ৯ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হাওরে দ্রুত ধান কাটতে অন্তত সাড়ে ৭ হাজার কম্বাইন হারভেস্টারের প্রয়োজন। অথচ সেখানে সচল রয়েছে মাত্র ২ হাজার ৯৩০টি। বাকি যন্ত্রগুলো মেরামতের অভাবে অচল পড়ে আছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত দুই বছর ধরে নতুন হারভেস্টার কেনার ওপর কোনো ভর্তুকি দেওয়া হয়নি। ফলে বাজারে নতুন যন্ত্র আসেনি এবং পুরনো যন্ত্রগুলোর যন্ত্রাংশের দাম বেড়ে যাওয়ায় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন।
হুমকিতে খাদ্য নিরাপত্তা: কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা?
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, “বোরো ধান উৎপাদন ও ঠিকমতো কৃষকের গোলায় ওঠার সঙ্গে দেশের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তার প্রশ্নটি সরাসরি যুক্ত। জ্বালানিসংকটের কারণে কৃষকের ক্ষতি হলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়বে। যেকোনো মূল্যে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।”
সরকারের আশ্বাস ও পদক্ষেপ
সংকটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কৃষিমন্ত্রী আমিন উর রশিদ বলেন, “ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় কম্বাইন হারভেস্টার যাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রস্তুত থাকে, সেদিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। অচল যন্ত্রগুলো দ্রুত সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে যন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির যাতে কোনো সংকট না হয়, সে বিষয়ে সমন্বয় করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।”
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহাম্মদ জানান, ধান পরিপূর্ণ হওয়ার আগে না কাটার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎপাদনে ক্ষতি না হয়। পাশাপাশি অচল হারভেস্টারগুলো মেরামতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
হাওরের আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর পাম্পে তেলের হাহাকার—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পড়ে বোরো চাষিরা এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। দ্রুত জ্বালানি সরবরাহ ও যন্ত্রাংশ মেরামতের উদ্যোগ না নিলে এবারের বোরো ফসল মাঠেই নষ্ট হওয়ার চরম আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলবে।