রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, ব্যবসায়ী হারিয়েছেন জাহাজ, আর কৃষক হারিয়েছেন ফসল—এমন নজির বাংলার ইতিহাসে অনেক আছে। কিন্তু এমন সময় খুব কমই এসেছে, যখন একটি রাষ্ট্র নিজেই বুঝতে পারে তার ভেতরে বছরের পর বছর ধরে এক ভয়ংকর ‘রক্তক্ষরণ’ হয়েছে, অথচ সেই ক্ষতটি দীর্ঘদিন কারও চোখেই পড়েনি। বাংলাদেশের অর্থপাচারের গল্পটি ঠিক তেমনি—এক নিস্তব্ধে ঘটে যাওয়া অর্থনৈতিক মহাপ্লাবন, যার পানি আজ এসে আছড়ে পড়ছে রাষ্ট্রের দরজায়।
একবার টাকা যদি দেশের সীমানা পেরিয়ে যায়, সেটি আর কেবল ‘টাকা’ থাকে না। সেটি হয়ে যায় আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, অফশোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং ভূ-রাজনৈতিক শক্তির এক জটিল গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া অদৃশ্য সম্পদ। এই বিপুল সম্পদ ফেরানোর চ্যালেঞ্জ এখন এসে পড়েছে বর্তমান সরকারের কাঁধে। কারণ বিষয়টি আর কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়, এটি এখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।
পাচারের ভয়াবহ চিত্র ও হারানো সম্ভাবনা
গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (GFI) এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে গঠিত ‘শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটি’র সাম্প্রতিক তথ্য যখন সামনে আসে, তখন সাধারণ মানুষের চোখ কপালে ওঠে। বোঝা যায়, বিষয়টি কেবল সাধারণ কোনো দুর্নীতি নয়, এটি এক কাঠামোগত মেগা-লুটপাট। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংস্থার হিসাবে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ আনুমানিক সাড়ে ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি (প্রায় ৭০ থেকে ৮০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ)।
হিসাবটি যদি সাধারণ মানুষের ভাষায় বোঝানো হয়—এই অর্থ দিয়ে দেশের অন্তত ২৫টি ‘পদ্মা সেতু’ তৈরি করা যেত! অর্থাৎ, আমরা শুধু টাকাই হারাইনি; আমরা হারিয়েছি আমাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। এই টাকায় তৈরি হতে পারত শত শত আধুনিক হাসপাতাল, বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, আর সৃষ্টি হতে পারত লাখ লাখ বেকারের কর্মসংস্থান। এই অর্থ কোথা থেকে এল? উত্তরটা খুব সহজ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক। এটি আমাদেরই টাকা—আমাদের করের টাকা, সাধারণ শ্রমিকের ঘামের টাকা এবং প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের টাকা। কিন্তু সেই টাকা দেশের ভেতরে বিনিয়োগ না হয়ে চলে গেছে বিদেশের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, ‘সেকেন্ড হোম’ কিংবা ট্যাক্স হ্যাভেনের গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে।
অর্থপাচারের গোলকধাঁধা: কীভাবে ঘটল এই লুটপাট?
এই বিপুল পরিমাণ অর্থ স্যুটকেসে ভরে বিদেশে নেওয়া হয়নি। পাচারের প্রধান হাতিয়ার ছিল আমদানি-রপ্তানির হিসাব জালিয়াতি, যাকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ‘ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং’ (Trade Misinvoicing)। কাগজে-কলমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে (ওভার-ইনভয়েসিং) বা কমিয়ে (আন্ডার-ইনভয়েসিং) দেখানো হয়েছে, আর সেই ফাঁক দিয়েই ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা সরে গেছে বিদেশে। এর পাশাপাশি হুন্ডি এবং ওভারড্রাফট সুবিধার ব্যাপক অপব্যবহার করা হয়েছে।
অর্থনীতির ভাষায় এটি হয়তো প্রযুক্তিগত অপরাধ, কিন্তু সমস্যা হলো—বাংলাদেশের টাকা বিদেশে গেছে কোনো ‘ভিসা’ ছাড়াই! কিন্তু সেই টাকাকে দেশে ফেরানোর সময় তাকে পাসপোর্ট, ভিসা, সাক্ষী, আইনজীবী, আদালত—সবকিছুর পরীক্ষায় বসতে হবে। সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অতীতে দক্ষ লোক দিয়েই টাকা পাচার করা হয়েছে। অর্থাৎ, যারা টাকা সরিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন, শেল কোম্পানি (Shell Company) এবং ব্যাংকিং গোপনীয়তার প্রতিটি ফাঁকফোকর বুঝেই কাজ করেছে।
কোথায় লুকানো আছে এই সম্পদ?
বাংলাদেশ সরকার এবং ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) ইতিমধ্যে পাচারের প্রধান গন্তব্যগুলো চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডার ‘বেগম পাড়া’, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার ‘সেকেন্ড হোম’, সংযুক্ত আরব আমিরাতের (দুবাই) বিলাসবহুল রিয়েল এস্টেট খাত এবং হংকং।
এই দেশগুলোর ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আইনি কাঠামো ভীষণ কড়া। এখন বাংলাদেশকে প্রতিটি দেশের আদালতে গিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে, এই টাকা আমাদের নাগরিকদের কাছ থেকে অবৈধভাবে নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পাচারকারীদের প্রভাবশালী আইনজীবীরা চেষ্টা করবেন সেই প্রমাণগুলোকে দুর্বল করতে।
পাচারকারীদের আরেকটি বড় আশ্রয়স্থল হলো ‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ (Tax Haven) বা করস্বর্গ হিসেবে পরিচিত কিছু দ্বীপরাষ্ট্র (যেমন—ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডস, পানামা ইত্যাদি)। এসব অঞ্চলে কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম গোপন রাখা হয়। পাচারকারীরা সেখানে শেল বা ভুয়া কোম্পানির আড়ালে সম্পদ লুকিয়ে রাখে। ফলে টাকা এক দেশ থেকে আরেক দেশে ঘুরতে থাকে, যেন তার কোনো নাগরিকত্বই নেই।
বিশ্ব ইতিহাসের নজির: ফিলিপাইন ও নাইজেরিয়া থেকে শিক্ষা
সাধারণ মানুষ ভাবছে, টাকা চিহ্নিত হলেই বুঝি ফেরত আসবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে কোনো দেশ কেবল ‘সন্দেহের’ ভিত্তিতে এক ডলারও ফেরত দেয় না। প্রথমে প্রমাণ করতে হয় টাকা অবৈধভাবে অর্জিত, তারপর প্রমাণ করতে হয় সেটি পাচার হয়েছে এবং সবশেষে দেশের আদালতের নির্দেশ লাগে সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার জন্য।
ইতিহাস বলছে, এই যুদ্ধ অসম্ভব নয়। ফিলিপাইন তাদের সাবেক স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পাচার করা সম্পদের একটি বড় অংশ ফেরত এনেছে। নাইজেরিয়াও বহু বছর পর সানি আবাচা পরিবারের লুকানো বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করেছে। কিন্তু এই দুই দেশই একটি জিনিস বিশ্বকে শিখিয়েছে—আর তা হলো ‘ধৈর্য’। ধৈর্য ছাড়া এই আইনি ও কূটনৈতিক যুদ্ধে জেতা অসম্ভব।
বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি ও আইনি পদক্ষেপ
বর্তমান সরকার অর্থপাচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে। এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংকেত। কারণ, পাচারের ছিদ্র বন্ধ না করে উদ্ধার অভিযান চালানো অর্থহীন। সরকার ইতিমধ্যে অর্থ উদ্ধারে ১১টি যৌথ অনুসন্ধান দল গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময় এবং মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি (MLAT)-এর আওতায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হচ্ছে।
অতীতের সরকারগুলোর আমলে প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের চাপে তদন্ত মাঝপথেই থেমে যেত। এই নির্মম বাস্তবতা স্বীকার না করলে সামনে এগোনো সম্ভব নয়। কারণ, আন্তর্জাতিক আদালত বা বিশ্বব্যাংকের ‘স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি’ (StAR) ইনিশিয়েটিভ প্রথমেই দেখে—নিজ দেশে পাচারকারীদের সুষ্ঠু ও স্বাধীন বিচার হচ্ছে কি না। যদি নিজ দেশে বিচারব্যবস্থা স্বচ্ছ না হয়, তবে কোনো বিদেশি রাষ্ট্র সম্পদ ফেরত দিতে আগ্রহী হয় না।
ধৈর্যের পরীক্ষা ও নৈতিকতার লড়াই
যারা প্রশ্ন করছেন, “কেন এখনো টাকা ফেরত আসছে না?”—তাদের বুঝতে হবে কাজটি মানসিকভাবে কঠিন এবং প্রযুক্তিগতভাবে সময়সাপেক্ষ। জনগণ দ্রুত ফল চায়, কিন্তু আইন প্রমাণ ও সময় চায়।
পাচার করা টাকা আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখন যেন একটি পরীক্ষার হলে বসে আছে। প্রশ্নপত্র খুব কঠিন নয়, কিন্তু সময় দীর্ঘ। এখানে তাড়াহুড়ো করে ভুল করলে নম্বর কাটা যাবে, আর আইনকানুন না মেনে জোরাজুরি করলে পুরো উত্তরপত্রই বাতিল হয়ে যাবে। তাই এখানে ধৈর্য রাখতে হবে, দক্ষ আইনজীবীদের নিয়োগ করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতিকে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে ব্যবহার করতে হবে। টাকা তখনই ফেরত আসবে, যখন আইন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একই পথে হাঁটবে।
সবশেষে বলা যায়, এই লড়াইটি কেবল অর্থনীতির নয়, এটি নৈতিকতার লড়াই। এই টাকা সরকার বা কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, এটি খেটে খাওয়া মানুষের। একজন জেলের ঘাম, একজন পোশাকশ্রমিকের চোখের জল আর একজন করদাতার কষ্টার্জিত আয় মিলেই তৈরি হয়েছিল এই সম্পদ। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশ পারে। টাকা চুরি হতে হয়তো এক মুহূর্ত সময় লাগে, কিন্তু ন্যায়বিচার ফিরে আসতে এক যুগ লেগে যায়। আর সেই যুগ পার করার অসীম ধৈর্যই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।