রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দেখতে না পারার চরম ব্যর্থতাই বিগত স্বৈরতন্ত্রের পাটাতন বা ভিত্তি নির্মাণ করেছিল বলে মন্তব্য করেছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (পীর চরমোনাই)। তিনি ২০১৩ সালের ৫ মে’র ওই ঘটনাকে আধুনিক জাতিরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক ‘বর্বরোচিত ও কলঙ্কময় অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সোমবার (৪ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এসব কথা বলেন।
নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর নজিরবিহীন হামলা
চরমোনাই পীর বলেন, নিজ দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের ওপর সশস্ত্র অভিযান চালানোর নজির বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। সেদিন যারা শাপলা চত্বরে রাত্রিযাপন করছিলেন, তাদের অধিকাংশই ছিলেন অল্প বয়সী সাধারণ ছাত্র। তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না এবং অপরাধের কোনো পূর্ব নজিরও ছিল না। এমন একদল শিক্ষার্থীর ওপর রাষ্ট্রের পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী যেভাবে সামরিক অভিযানের মতো হামলে পড়েছিল, তার দৃষ্টান্ত কেবল অভিশপ্ত ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর অভিযানের সঙ্গেই তুলনীয়।
তিনি অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার ইসলাম, মাদরাসা ও ইসলামপন্থীদের ওপর চরম বিদ্বেষ ও জিঘাংসা থেকেই ওই ভয়াবহ অভিযান পরিচালনা করেছিল। এই বীভৎস হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের স্বৈরতন্ত্রের শেকড় আরও গভীরে প্রোথিত হয়, যার চরম মূল্য জাতিকে পরবর্তী ১১ বছর ধরে বহন করতে হয়েছে।
বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের নীরবতার কড়া সমালোচনা
বিবৃতিতে চরমোনাই পীর ২০১৩ সালের ৫ মে-পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক সংগঠন, বুদ্ধিজীবী ও সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করে তা পুনরায় বিচার-বিশ্লেষণ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, কেবল আদর্শিক মতভিন্নতার কারণে সেদিনের সেই রাষ্ট্রীয় বর্বরতা একধরনের নীরব বৈধতা পেয়েছিল। সরকারকে বুদ্ধিজীবী শ্রেণি এবং রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে কোনো কঠিন প্রশ্নের বা জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হয়নি; উল্টো ওই হত্যাযজ্ঞের পক্ষে বৈধতা উৎপাদন করা হয়েছে। এই ঘটনাকে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে দেখতে না পারার ব্যর্থতাই স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘায়িত করেছে।
ইসলামী আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট দাবি
সাম্প্রতিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট টেনে মুফতি রেজাউল করীম শাপলা চত্বরের ঘটনার ন্যায়বিচারের স্বার্থে সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি তুলে ধরেন:
নির্মোহ তদন্ত ও শাস্তি: শাপলা চত্বরের হত্যাযজ্ঞের একটি নির্মোহ ও সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো স্বৈরাচার নিজ দেশের নাগরিকদের ওপর এমন নৃশংসতা চালানোর সাহস না পায়।
জাতীয় বীরের স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ: শাপলা চত্বরে যারা শাহাদাতবরণ করেছেন এবং আহত হয়েছেন, তাদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যথাযথ ক্ষতিপূরণ প্রদান করতে হবে।
মামলা প্রত্যাহার: শাপলা চত্বরকেন্দ্রিক দায়ের করা সব হয়রানিমূলক মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং এসব মামলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ: শাপলা হত্যাকাণ্ডের প্রতি ঘৃণা এবং প্রতিবাদী চেতনা জাগ্রত রাখতে দিনটিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করার উদ্যোগ নিতে হবে।