বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে স্মার্ট ওয়াচ (স্মার্ট ঘড়ি) ও স্মার্ট রিংয়ের মতো পরিধানযোগ্য প্রযুক্তি বা ‘ওয়ারেবল ডিভাইস’ আমাদের নিত্যদিনের অন্যতম প্রধান সঙ্গী হয়ে উঠেছে। বহু বিলিয়ন ডলারের এই বৈশ্বিক শিল্পের এখন অন্যতম প্রধান বিপণন লক্ষ্যই হলো মানুষের স্বাস্থ্যের খেয়াল রাখা। এসব প্রযুক্তি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি—তাদের তৈরি ডিভাইসগুলো অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মানুষের শারীরিক ব্যায়াম, শরীরের তাপমাত্রা, হৃৎস্পন্দন, মাসিক চক্র এবং ঘুমের ধরনসহ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এমনকি ইংল্যান্ডের হেলথ সেক্রেটারি ওয়েস স্ট্রিটিং ঘরে বসেই রোগীদের ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের উপসর্গ প্রাথমিক স্তরে যাচাইয়ের জন্য লাখ লাখ রোগীকে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসের (এনএইচএস) পক্ষ থেকে এই ডিভাইসগুলো দেওয়ার প্রস্তাবও করেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসক ড. জেক ডয়েচও মনে করেন, এসব ডিভাইসের ডেটা বা তথ্য রোগীদের সামগ্রিক স্বাস্থ্য আরও সুনির্দিষ্টভাবে মূল্যায়ন করতে চিকিৎসকদের সহায়তা করে।
তবে এই বিপুল সুবিধার পাশাপাশি অনেক অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা স্বাস্থ্যগত তথ্যের জন্য এই ওয়ারেবল ডিভাইসগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করছেন। তাদের মতে, এই প্রযুক্তিগুলোর ব্যবহারের পেছনে বেশ কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতা ও মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকি লুকিয়ে রয়েছে, যা হিতে বিপরীত হতে পারে।
চিকিৎসকেরা রোগীদের সরবরাহ করা পরিধানযোগ্য ডিভাইসের তথ্যের ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেন না, কারণ ক্লিনিক্যাল যন্ত্রপাতির তুলনায় এগুলোর নির্ভুলতার হার অনেক কম। নটিংহাম ট্রেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. ইয়াং ওয়েই এর পেছনে প্রধান কিছু কারিগরি কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। প্রথমত, হাসপাতালে যখন কোনো রোগীর ইসিজি (ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম) পরীক্ষা করা হয়, তখন বিদ্যুৎ খরচ নিয়ে ভাবতে হয় না কারণ মেশিনটি সরাসরি বৈদ্যুতিক লাইনে সংযুক্ত থাকে। কিন্তু একটি ছোট স্মার্ট ঘড়িতে যদি নিয়মিতভাবে নিখুঁত ইসিজি পরীক্ষা করা হয়, তবে তার ব্যাটারি নিমেষেই শেষ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যবহারকারীর স্বাভাবিক নড়াচড়া, হাঁটাচলা কিংবা হাতের ওপর ঘড়ি বা রিংয়ের সামান্য অবস্থান পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট শব্দের (noise) কারণে যন্ত্রের সংগৃহীত তথ্যে বড় ধরনের তারতম্য বা ভুল আসতে পারে। ড. ইয়াং ওয়েই স্পষ্ট করে বলেন, হৃৎস্পন্দন পরিমাপের জন্য সবচেয়ে আদর্শ জায়গা হচ্ছে কব্জি বা সরাসরি হৃদযন্ত্র। আঙুলে পরা স্মার্ট রিং থেকে কখনোই শতভাগ নির্ভুল তথ্য পাওয়া সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, এই ওয়ারেবল ডিভাইসের সেন্সর ও ডেটা প্রসেসিং সফটওয়্যারগুলোর ক্ষেত্রে এখনো কোনো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (International Standard) নেই এবং তথ্য কীভাবে সংগ্রহ বা উপস্থাপন করা হবে, তারও কোনো অভিন্ন বৈশ্বিক নিয়ম নেই।
অক্সফোর্ডের ব্যস্ত জেনারেল প্র্যাক্টিশনার (জিপি) ড. হেলেন সালিসবারি এই প্রযুক্তির আরেকটি মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক দিক তুলে ধরেছেন। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “আমরা হয়তো এমন একটি সমাজ তৈরি করছি যেখানে মানুষের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্নায়বিক রোগ ‘হাইপোকন্ড্রিয়া’ (নিজের স্বাস্থ্য নিয়ে অবান্তর ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করার রোগ) এবং স্বাস্থ্যের অতিরিক্ত খুঁতখুঁতে পর্যবেক্ষণের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে”।
আমাদের দেহে কোনো সাময়িক পরিবর্তন বা ডিভাইসের অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে অনেক সময় হৃদস্পন্দন বৃদ্ধির মতো সাময়িক অস্বাভাবিক ডেটা স্ক্রিনে ভেসে উঠতে পারে, যার বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আসলে কোনো চিকিৎসা বা ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার প্রয়োজন থাকে না। কিন্তু যন্ত্রের স্ক্রিনে এই সামান্য তারতম্য দেখেই মানুষ আতঙ্কিত হয়ে ডাক্তারের কাছে ছুটে যাবে। ড. সালিসবারির মতে, সব ধরনের টিউমার বা মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যার ইঙ্গিত কোনো ঘড়ি বা অ্যাপ দিতে পারে না। তাই মানুষের শরীর যখন নিজে থেকে অসুস্থ বোধ করবে, তখনই কেবল চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, কোনো ডিভাইসের নোটিফিকেশন দেখে নয়। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, সুস্থ থাকার মূল উপায় হলো—বেশি হাঁটা, অতিরিক্ত মদ্যপান না করা এবং স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা; এই চিরন্তন পরামর্শগুলো প্রযুক্তির যুগেও কখনোই বদলায় না।
ডিভাইসের অতিরিক্ত বা ভুল জরুরি সতর্কতা (False Positive) অনেক সময় মানুষের মধ্যে চরম বিভ্রান্তি ও ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন—বেন উড নামে এক ব্যক্তি যখন রেস ট্র্যাকে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, তখন তার হাতের অ্যাপল ওয়াচ সেটিকে একটি মারাত্মক ‘গাড়ি দুর্ঘটনা’ মনে করে তার স্ত্রীর ফোনে একের পর এক স্বয়ংক্রিয় জরুরি নোটিফিকেশন পাঠাতে শুরু করে, যা ছিল সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও বিভ্রান্তিকর।
কিংস ফান্ডের ডিজিটাল প্রযুক্তি বিষয়ক ফেলো প্রিতেশ মিস্ত্রি মনে করেন, রোগীদের তৈরি করা এই বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত ডেটা বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মূল কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। কারণ, প্রযুক্তি সক্ষমতার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি এবং এই ডেটা বিশ্লেষণ করার জন্য স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের প্রয়োজনীয় দক্ষতা, জ্ঞান ও সামর্থ্য বৃদ্ধি না করা হলে, পরিধানযোগ্য এই আধুনিক প্রযুক্তিগুলো চিকিৎসকদের সহায়তার বদলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর উল্টো অতিরিক্ত মানসিক ও প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করবে।