• শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:৪৪ অপরাহ্ন

হাসিনার জন্য ভারতের এত দরদ কেন?

Reporter Name / ৫ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সাউথ এশিয়ার ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ (এফসিসি)-র উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় অনলাইন অডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য রেখেছেন। প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থান করার পর আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। তবে ভারতের মাটিতে বসে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের অডিও বার্তা দেওয়ার সুযোগ পাওয়াকে ভারতের “ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” বা দ্বিমুখী নীতি হিসেবে দেখছে ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এমন অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “শেখ হাসিনার প্রতি ভারত সরকারের এত মায়া যে তাকে ভিডিও না হলেও অডিও বার্তার মাধ্যমে প্রকাশ্যে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এটি স্পষ্টতই তাদের ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের বহিঃপ্রকাশ।” বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, অতীতে ট্রানজিট, ট্রানশিপমেন্ট, বিদ্যুৎ ও বন্দর সুবিধা পাওয়ার কারণেই শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগকে ভারত সরকার তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু মনে করে এবং এই ‘মায়া’ প্রদর্শন করে আসছে। একই সাথে রিজভী মন্তব্য করেন যে, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠার পেছনে এবং দলটির উত্থানে নির্দিষ্ট বিশেষ গোষ্ঠীর মদদ ও সমর্থন ছিল।
নয়াদিল্লির এই সংবাদ সম্মেলনে সজীব ওয়াজেদ জয় দেশের বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন ও পরবর্তী শাসনকালের প্রেক্ষাপট টেনে বর্তমান পরিবেশকে একটি ‘ব্যর্থ রাষ্ট্র’ হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়েছে এবং আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও পুলিশ হত্যায় দায়মুক্তি দিতে এক ধরনের ইনডেমনিটি বা আইনি সুরক্ষা প্রদান করা হয়েছে। তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জুলাই-আগস্টের প্রাণহানির ঘটনায় কোনো প্রকার অনুশোচনা বা সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি তারা এড়িয়ে যান। অন্যদিকে, অডিও সংযোগে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা তাঁর মেয়াদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন এবং পুলিশ হত্যা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বাংলাদেশকে একটি ‘নিরাপত্তা ঝুঁকিপূর্ণ’ বা ‘অকার্যকর রাষ্ট্র’ হিসেবে তুলে ধরাই আওয়ামী লীগের মূল কৌশলে পরিণত হয়েছে। শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি কেবল দেশের ভেতর নয়, বরং ভারতসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এবং এর ফলে সীমান্তে জঙ্গিবাদ ও উগ্রপন্থা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। সম্প্রতি দেশে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন বোমা ও আস্তানাগুলোকে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের অস্থিতিশীলতার প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করার কৌশল নিয়েছে দলটি। উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের এই নিরাপত্তা শঙ্কার বিষয়টি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ কে এম শামসুল ইসলামের সাথে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও আলোচনায় উঠে আসে।
তবে পুরো সংবাদ সম্মেলনে সবচেয়ে বড় আলোচনার জন্ম দিয়েছে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বার্তা। কয়েকদিন আগে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি চলতি বছরের ‘ডিসেম্বরের মধ্যে’ দেশে ফেরার সুস্পষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করলেও, দিল্লির এই সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকরা সরাসরি তারিখ বা সময় জানতে চাইলে তিনি নির্দিষ্ট কোনো মাসের কথা উল্লেখ করেননি। তিনি কেবল জানান যে, তিনি জেলের ভয় বা মৃত্যুর হুমকি পরোয়া করেন না এবং দেশের মানুষের টানে তিনি অবশ্যই দেশে ফিরবেন। সময় উল্লেখ না করায় প্রশ্ন উঠেছে—তবে কি তিনি ডিসেম্বরে ফেরার পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছেন? বিশ্লেষকদের মতে, নিশ্চিত রূপরেখা না দিয়ে অস্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে চরম হতাশায় থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা রাখা ও নিজের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দেওয়া।
সংবাদ সম্মেলনটিতে শেখ হাসিনার পাশে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ছাড়া অন্য কোনো শীর্ষস্থানীয় নেতার উপস্থিতি দেখা যায়নি। হঠাৎ করে ব্যারিস্টার নওফেলকে এত গুরুত্ব দেওয়ায় দলের ভেতরে ও বাইরে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে যে, তবে কি তিনি আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক হতে যাচ্ছেন বা জ্যেষ্ঠ নেতাদের ওপর শেখ হাসিনার আস্থা উঠে গেছে?
সব মিলিয়ে, দিল্লির এই প্রেস মিট এবং শেখ হাসিনার অডিও বক্তব্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে অস্থিতিশীল দেখানোর একটি কূটনৈতিক চাল বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তবে ভারতের এই সমর্থন ও ‘মায়া’ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতিপথে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ফেলে, তা নির্ভর করবে আগামী দিনের পরিবর্তিত রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা ও দ্যা ওয়েভ ২৪


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category