• বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৪:০৩ অপরাহ্ন

অথোরিটি উন্ড: চাকরিজীবীদের নীরব সমস্যা—আমার অভিজ্ঞতা

বাদল সৈয়দ / ০ Time View
Update : বুধবার, ১৫ জুলাই, ২০২৬

১ ) ক্ষত পর্ব-

১৯৯৩ সাল

আমি বর্তমান চাকরিতে আসার আগে বছরখানেক একটি ব্যাংকে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে কাজ করেছিলাম। পদবি ছিল প্রবেশনার অফিসার।

আমার প্রথম পোস্টিং ছিল চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায়। প্রথমে আমাকে কাজ শেখার জন্য ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিপার্টমেন্টে পাঠানো হলো।

আমার বস ছিলেন হায়দার স্যার। অবসরপ্রাপ্ত সামরিক অফিসার। খুব কড়া হিসেবে পরিচিত।

প্রথমদিন কাজ শুরু করার এক ঘণ্টার মধ্যেই তার কড়া মেজাজের প্রমাণ পেলাম।

ছোট একটি ভুল করেছিলাম। তিনি বিশাল ধমক দিয়ে বললেন, ‘ইউ ডাফার, হু সিলেক্ট ইউ ফর দিস ব্যাংক। দে আর ডাফার ঠু।‘

প্রথম অভিজ্ঞতাতেই এরকম ধমক খাওয়ায় খুব দমে গেলাম।

পরেরদিন কাজ শুরু করার আগেই তিনি বললেন, ‘ইফ ইউ মেইক অ্যানি সিঙ্গেল মিসটেক, আই উইল মেইক সিউর, ইউ লুজ ইয়োর জব।‘

কয়েকদিনের মধ্যে হায়দার স্যার আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুললেন। একমাস পর সিদ্ধান্ত নিলাম চাকরি ছেড়ে দেবো। এভাবে চাকরি করা সম্ভব নয়।

ভাগ্যক্রমে তখন একই ব্যাংকে কাজ করতেন আমাদের কলোনির রুমি ভাই। কয়েক বছর আগে তিনি যোগদান করেছিলেন। আমি তাঁকে আমার ইচ্ছার কথা বললাম।

তিনি সব শুনে বললেন, ‘তুমি না হয় এ চাকরি ছেড়ে অন্য জায়গায় যাবে। কিন্তু অথোরিটি উন্ড থেকে বের হতে না পারলে কোথাও গিয়ে ভালো করবে না।‘

আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘অথোরিটি উন্ড কী?’

রুমি ভাই উত্তর দিলেন, ‘মনোবিজ্ঞানের একটি জনপ্রিয় ধারণা। তবে এটিকে কোনো মনোরোগ বলা যাবে না। সহজ কথায়, ক্ষমতাবান কারো দ্বারা বারবার অপমানিত হলে যে মানসিক ক্ষত তৈরি হয় তা-ই অথোরিটি উন্ড। এটা একবার স্থায়ী হয়ে গেলে মানুষের আত্মবিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়। তখন যেকোনো ক্ষমতাবান মানুষকে অকারণে ভয় লাগে। নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় লাগে। সবাইকে খুশি করার প্রবণতা তৈরি হয়। তুমি এ চাকরি ছেড়ে অন্য জায়গায় গেলেও একই ভীতিতে ভুগবে। ভালো করতে পারবে না। তাই আমার পরামর্শ হলো, তুমি হায়দার ভাইকে ফেস করো। তার মন জয় করো। এটাই তোমার অথোরিটি উন্ড কাটানোর সবচেয়ে ভালো উপায়।’

আমি হতাশ গলায় বললাম, ‘এটা অসম্ভব। আমি পারব না।‘

রুমি ভাই বললেন, ‘হায়দার ভাইয়ের আন্ডারে অনেকেই খুশি মনে কাজ করছেন। তাঁরা যদি তাঁকে জয় করতে পারেন, তুমি পারবে না কেন? শুধু অবজারভ করো কীভাবে কাজ করলে তিনি খুশি হন। উনি কিন্তু মানুষ খারাপ না। একটু বেশি পারফেকশনিস্ট এই আর কী?’

আমি চুপ করে বসে রইলাম।

রুমি ভাই আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘আমাদের কলোনির ছেলেরা সাহসী বলে সুনাম আছে- এই ইজ্জত নষ্ট করো না।‘

তাঁর শেষ কথাটিই আমার মগজে কামড় বসালো।

২ ) চেষ্টা পর্ব-

এরপর আমি গভীরভাবে চিন্তা করলাম হায়দার স্যার কী কী পছন্দ করেন। তারপর সেগুলো মাথায় রেখে কিছু নিয়ম সেট করলাম।

ক) একদম ঠিক টাইমে অফিসে যেতাম।

খ) ভুল হলে অজুহাত দিতাম না।

গ) কোনো ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করলে তা বিনয়ের সাথে বলে দিতাম।

ঘ) দায়িত্ব নিলে প্রতিটি কাজ

নির্ভুলভাবে করার চেষ্টা করতাম। না পারলে আগেই বলে দিতাম।

ঙ) হাত কচলাতাম না। চোখে চোখে রেখে কথা বলতাম। তাতে বিনয় থাকত, কিন্তু ভয় থাকত না।

হায়দার স্যারকে পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছিল, তিনি এ ব্যাপারগুলো পছন্দ করতেন।

৩) পারফিউম পর্ব-

১৯৯৪ সাল

এ বছরের এপ্রিল মাসে আমি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে দিলাম। কারণ নতুন চাকরি পেয়েছি। বিকেলে ব্যাংক থেকে ছোট্ট একটি ফেয়ারওয়েলের আয়োজন করা হয়েছে। দুপুরে দেখি হায়দার স্যার নেই। অবাক হলাম! তিনি সাধারণত এরকম মাঝ অফিসে কখনো চলে যান না। কেউ জানেন না, তিনি কেন চলে গেছেন। একটু মন খারাপ হলো। আজ আমি বিদায় নেবো, আর স্যার থাকলেন না!

একটা কথা বলে রাখি। তখন দিনের বেলায় খাতুনগঞ্জে গাড়ি ঢুকতে পারত না। দূরদূরান্তে পাইকারি মাল কিনে নিয়ে যাওয়ার জন্য শত শত ট্রাক রাস্তা বন্ধ করে রাখত। আমরা বেশ দূরে রিকশা ছেড়ে বাকিটা পথ হেঁটে আসতাম।

বিকেল চারটার দিকে দেখি হায়দার স্যার ঘর্মাক্ত অবস্থায় হাঁপাতে হাঁপাতে অফিসে ঢুকছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, কোথায় গিয়েছিলেন? কোনো সমস্যা?’

তিনি প্রথমে বাঁজখাই গলায় বললেন, ‘আমি কোথায় গিয়েছিলাম তোমাকে বলতে হবে?’

আমি ধমক খেয়ে মন খারাপ করে সরে যেতে চাইলাম। এমন সময় তিনি ডাকলেন, ‘বাদল।‘

আমি ফিরে তাকালাম।

তিনি ব্যাগ থেকে একটি পারফিউমের প্যাকেট বের করে বললেন, ‘একদম ভুলে গিয়েছিলাম যে আজ তুমি চলে যাবে। তাই নিউমার্কেট গিয়েছিলাম- নাও, এই ছোট্ট গিফটটা নাও।‘

আমি অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছি।

তিনি কোমল গলায় বললেন, ‘যারা নতুন জয়েন করে তাদের আমার কাছে পাঠানো হয় লোহা পিটিয়ে ছুরি বানানোর জন্য। যাতে তারা যেকোনো সমস্যাকে মাখনের মতো কেটে টুকরো টুকরো করে বঙ্গোপসাগরে ছুঁড়ে ফেলতে পারে। কাজটা কঠিন। ধমক ছাড়া করা যায় না। বাট আই লাইক ইউ, ইয়াংম্যান, আই লাইক মোর দ্যান আই কুড সে।‘

আমারও মাসুদ রানার মতো বলতে ইচ্ছে হলো, ‘আই লাভ ইউ ম্যান।মোর দ্যান আই কুড সে।‘

বলা হলো না।

সবসময় সব কথা বলা হয় না।

৪) ম্যাজিক পর্ব-

আমার ধারণা, হায়দার স্যারের আমাকে আহত করার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি আমাকে ভবিষ্যতে যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে চেয়েছিলেন।

তার মানে এই নয় যে, সব বস এরকম মহৎ ইচ্ছে নিয়ে এটা করেন। অনেকের স্বভাবই হলো এমন। তাই বলে সেই ক্ষত পুষে রাখা যাবে না। রাখলে ক্যারিয়ার বরবাদ হবে। এটা কাটানোর অনেক সাইকোলজিক্যাল উপায় আছে। তবে আমার মনে হয়, এ ধরনের বসকে মোকাবেলা করতে হবে কৌশল দিয়ে। সেরা কৌশল হলো, দক্ষতা দিয়ে সম্পর্কের ভারসাম্য বদলে দেওয়া।

কিন্তু কীভাবে সেটা সম্ভব?

এটি সম্ভব করার একটিই উপায়। তা হলো, কাজটা ভালোভাবে শেখা, যাতে আপনাকে ছাড়া কাজ না চলে। বস বুঝতেই পারবেন না, কখন তিনি আপনার উপর নির্ভরশীল হয়ে গেছেন।

আসলে হায়দার স্যারকে আমি বদলাইনি। বদলেছিলাম নিজেকে।

এটাই অথোরিটি উন্ড জয় করার আসল ম্যাজিক।

৫) কৃতজ্ঞতা পর্ব-

হায়দার স্যারের সাথে যোগাযোগ নেই প্রায় পঁচিশ বছর। রুমি ভাইয়ের সাথে মাঝে মাঝে কথা হয়। তাঁরা এ লেখা পড়বেন কি না জানি না, যদি পড়েন, সেদিন যা বলতে পারিনি তা আজ বলতে চাই- ‘আই লাভ বোথ অব ইউ, ম্যান। মোর দ্যান আই কুড সে।’

#আসুন মায়া ছড়াই


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category