“ঈশ্বরের দোহাই লাগে, এই কাজটি করবেন না!”—২০২৫ সালে তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে ঠিক এভাবেই বারবার সতর্ক করেছিলেন ইউনিসেফের তৎকালীন বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স। কিন্তু সেই আকুতি সেদিন কেউ শোনেনি। আমলাতান্ত্রিক জেদ আর নেপথ্যের ‘কমিশন বাণিজ্যের’ লোভে সেদিন যে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তার চরম মূল্য আজ চোকাচ্ছে দেশের নিরীহ শিশুরা।
সময়টা মে ২০২৬। দেশজুড়ে এখন হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব। গণমাধ্যমের হিসাবমতে, এরই মধ্যে হাম ও হামের উপসর্গে অন্তত ৩১১ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল ‘হিমশৈলীর চূড়া’ (Tip of the iceberg) মাত্র। কারণ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অসংখ্য আনরিপোর্টেড মৃত্যুর খবর গণমাধ্যম বা চিকিৎসাকেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছায়নি। একটি সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য ও প্রতিরোধযোগ্য রোগে এতগুলো শিশুর মৃত্যু দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার চরম অব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক গাফিলতির এক নগ্ন দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক সংস্থা ইউনিসেফ এবং গ্যাভির (Gavi) সহায়তায় অত্যন্ত সফলভাবে হাম-রুবেলার টিকা সংগ্রহ করে আসছিল। কিন্তু ২০২৫ সালে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করেই এই পরীক্ষিত ব্যবস্থা থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা উন্মুক্ত দরপত্র (Open Tender) পদ্ধতির মাধ্যমে সরাসরি টিকা কেনার উদ্যোগ নেয়।
দৈনিক প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে ইউনিসেফের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত বাংলাদেশ প্রতিনিধি স্ট্যানলি গোয়াইভুয়া জানান, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে টিকা কিনতে সর্বোচ্চ ১২ মাস সময় লাগতে পারে বলে অন্তর্বর্তী সরকারকে স্পষ্টভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা সম্পূর্ণ উপেক্ষিত হয়। ফলস্বরূপ, দরপত্র প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায় এবং দেশে টিকার মজুত পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।
পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে, সরকারি ওয়েবসাইটের তথ্যমতেই ২০২৫ সালে মাত্র ৫৯ শতাংশ যোগ্য শিশু হামের টিকা পেয়েছিল (যা পরে ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়)। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সাল থেকে পিছিয়ে আসা হাম-রুবেলার সম্পূরক টিকাদান ক্যাম্পেইনটিও শেষমেশ বাতিল করে দেয় তৎকালীন সরকার। জাতীয় টিকাদান পরামর্শ কমিটি এবং আন্তর্জাতিক মহল বারবার সতর্ক করেছিল—টিকা না দিলে হাম প্রবল শক্তিতে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই কথায় কর্ণপাত করা হয়নি।
কেন একটি সফল ব্যবস্থা বাতিল করে উন্মুক্ত দরপত্রের দিকে হেঁটেছিল অন্তর্বর্তী সরকার? স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা এর পেছনে ভয়াবহ এক ‘কমিশন বাণিজ্যের’ ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী এক সাক্ষাৎকারে সরাসরি অভিযোগ তুলে বলেন, “সরকার নিজেরা টিকা কিনতে চেয়েছিল কমিশনের লোভে। ৮০০ কোটি টাকার টিকা কেনায় ১০ শতাংশ হলেও ৮০ কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য হতো। ইউনিসেফ বা গ্যাভির মাধ্যমে টিকা আনলে তো কোনো কমিশন পাওয়ার কায়দা নেই, কারণ ১৫ শতাংশ প্রকিউরমেন্ট কস্ট সরাসরি ইউনিসেফের কাছে চলে যায়। এই কমিশনের লোভেই তারা টিকা কিনতে গিয়ে গোটা দেশের শিশুদের বিপদে ফেলেছে।”
তিনি এই ঘটনাকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ (Crime against humanity) হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, “এর জন্য অবিলম্বে তদন্ত হওয়া দরকার। আড়াইশ থেকে তিনশ শিশু মারা গেছে। এর জন্য ড. ইউনূস, নূরজাহান বেগম এবং তাদের পুরো মন্ত্রিসভা সরাসরি দায়ী। তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।”
এই সংকটের দায় কেবল বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের নয়, বর্তমান সরকারের ভূমিকার দিকেও আঙুল তুলছেন বিশেষজ্ঞরা। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসে। মার্চ মাসেই দেশজুড়ে হামের তীব্র বিস্তার দৃশ্যমান হতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অতীত সরকারের এই ব্যর্থতাকে “জীবন বিনাশকারী এবং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ” বলে কড়া সমালোচনা করেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে বর্তমান সরকারের তৎপরতা নিয়ে। মার্চ মাসে নতুন স্বাস্থ্যমন্ত্রী উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি বাতিলের নির্দেশ দিয়ে এপ্রিলে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিতে এবং জরুরি টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করতে প্রায় দেড় মাস (৫০ দিন) সময় পার হয়ে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট দৃশ্যমান হওয়ার পরও বর্তমান সরকারের প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট দ্রুত ছিল না। এই ৫০ দিনের বিলম্বের কারণেই অনেক শিশুর প্রাণ ঝরেছে।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স (Science) এবং আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্স (AAAS) তাদের এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর সরকারের টিকা ক্রয় ব্যবস্থায় যে অপরিণামদর্শী পরিবর্তন আনা হয়েছিল, তার ফলেই দেশজুড়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার এই বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) এক প্রতিবেদনেও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, মিয়ানমারে গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানকার টিকাদান ব্যবস্থা আগে থেকেই ভেঙে পড়েছে। এখন বাংলাদেশ থেকে যদি হামের এই অত্যন্ত সংক্রামক স্ট্রেইনটি সীমান্তবর্তী ভারত বা মিয়ানমারে ছড়িয়ে পড়ে, তবে পুরো অঞ্চলে এক নতুন স্বাস্থ্য বিপর্যয় অনিবার্য।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এখনই টিকার ঘাটতি পুরোপুরি মেটানো না গেলে মৃত্যুহার জ্যামিতিক হারে বাড়বে। হামের টিকা ও ভিটামিন ‘এ’-এর অভাবে শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, অন্ধত্ব ও মারাত্মক অপুষ্টির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বড় ভয়ের কারণ হলো আস্থার সংকট। সরকারের এই ধারাবাহিক ভুলের কারণে সাধারণ মানুষের মনে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির প্রতি অনাস্থা তৈরি হতে পারে, যার ফলে পোলিও বা ধনুষ্টংকারের মতো যেসব রোগ বাংলাদেশ থেকে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল, সেগুলোও পুনরায় ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
শিশুদের এই মৃত্যু কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু নয়; এটি প্রশাসনিক অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে সৃষ্ট এক কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড। যারা টিকার বৈশ্বিক রাজনীতি ও সংগ্রহ পদ্ধতি না বুঝে কেবল কমিশনের লোভে নিরীহ শিশুদের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, তাদের দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সূত্র: ; দ্যা পোস্ট