• বুধবার, ০৬ মে ২০২৬, ০৮:২৯ অপরাহ্ন
Headline
চীনের সিপিপিসিসি চেয়ারম্যানের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠক বিদেশি বিনিয়োগের বড় বাধা সরকারি সংস্থাগুলোর ধীরগতি: মির্জা ফখরুল সংরক্ষিত নারী আসন: সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন এনসিপির নুসরাত তাবাসসুম শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড: রাজসাক্ষী হতে চান সাবেক ডিআইজি জলিল, জামিন নামঞ্জুর সীমান্তে ‘পুশইন’ ঠেকাতে বিজিবিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ্মা ব্যারেজ: মরুকরণ ও লবণাক্ততার অভিশাপ ঘোচাতে ৩৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের সবুজ সংকেত নড়াইলে বেড়াতে এসে ঘুমন্ত স্ত্রীকে বঁটি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা, স্বামী গ্রেপ্তার নওগাঁয় মাঠে কাজ করার সময় বজ্রপাতে দুই কৃষকসহ নিহত ৩ মান্দায় পিছিয়ে পড়া ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে ছাগল ও গৃহনির্মাণ সামগ্রী বিতরণ সত্তরে স্বাস্থ্য রক্ষা— শুরু করতে হয় ত্রিশে: সাতটি পরামর্শ

পদ্মা ব্যারেজ: মরুকরণ ও লবণাক্ততার অভিশাপ ঘোচাতে ৩৪ হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের সবুজ সংকেত

Reporter Name / ২ Time View
Update : বুধবার, ৬ মে, ২০২৬

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এবং পানির ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার রক্ষাকবচ ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প এবার সত্যিকার অর্থেই আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। দেশের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ এই মেগা প্রকল্পটির কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের (ফিজিবিলিটি স্টাডি) কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার (৬ মে ২০২৬) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি এই যুগান্তকারী সুখবরটি দেশবাসীকে জানিয়েছেন।

জানা গেছে, প্রকল্পটি এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং শিগগিরই তা জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপন করা হবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা কেবল দেশের সেচ ব্যবস্থাতেই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতি, পরিবেশ সুরক্ষা এবং ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও এক বিশাল পরিবর্তন নিয়ে আসবে।

ফারাক্কার অভিশাপ ও পদ্মা ব্যারেজের প্রয়োজনীয়তা

স্বাধীনতার পর থেকেই গঙ্গার পানির প্রবাহ নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এক দীর্ঘস্থায়ী অমীমাংসিত সংকট চলে আসছে। উজানে ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণের পর থেকে শুষ্ক মৌসুমে (জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত) বাংলাদেশের পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়। এর ফলে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে, বিশেষ করে বরেন্দ্র অঞ্চলে তীব্র খরা ও মরুকরণ দেখা দেয়। অন্যদিকে, পদ্মার প্রধান শাখা নদী গড়াইয়ে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে (খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট অঞ্চল) সমুদ্রের লোনা পানি তীব্র বেগে দেশের ভেতরে প্রবেশ করে।

এই লবণাক্ততার কারণে বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে, সুন্দরী গাছের ‘আগামরা’ রোগ দেখা দিয়েছে এবং ওই অঞ্চলের কৃষিকাজ প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে সৃষ্ট এই পানিসংকট, মরুকরণ এবং লবণাক্ততা রোধ করাই পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। বর্ষা মৌসুমে পদ্মায় যে বিপুল পরিমাণ মিষ্টি পানি প্রবাহিত হয়ে সাগরে গিয়ে পড়ে, ব্যারেজ নির্মাণের মাধ্যমে সেই পানি আটকে রেখে একটি বিশাল জলাধার তৈরি করা হবে। পরে শুষ্ক মৌসুমে সেই সংরক্ষিত পানি গড়াইসহ অন্যান্য শাখা নদীতে প্রবাহিত করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে লবণাক্ততার হাত থেকে বাঁচানো হবে।

প্রকল্পের রূপরেখা ও ব্যয়ভার

প্রস্তাবিত পরিকল্পনা ও কারিগরি সমীক্ষা অনুযায়ী, রাজবাড়ী জেলার পাংসা পয়েন্টে এই ব্যারেজটি নির্মাণ করা হবে। এই পয়েন্টটিকে ভূতাত্ত্বিক ও কৌশলগতভাবে সবচেয়ে উপযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পের প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৪,৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। বিশাল এই বাজেটের মধ্যে ব্যারেজ নির্মাণ, নদীশাসন, সংযোগ খাল খনন এবং আনুষঙ্গিক অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ব্যারেজটি নির্মিত হলে পদ্মার বুকে প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল জলাধার সৃষ্টি হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে অন্তত ২.৯ বিলিয়ন ঘনমিটার মিষ্টি পানি ধরে রাখতে সক্ষম হবে বলে পানি বিশেষজ্ঞরা এর আগে মত দিয়েছিলেন।

কৃষি, মৎস্য ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, এই প্রকল্পের মাধ্যমে রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৪টি জেলার মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। এটি কেবল একটি গতানুগতিক সেচ প্রকল্প নয়; বরং এটি দেশের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা, মৎস্য চাষ এবং কৃষির সামগ্রিক উন্নয়নে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।

বর্তমানে সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে রাজশাহীর বরেন্দ্র অঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। অনেক জায়গায় আর্সেনিক দূষণ দেখা দিচ্ছে। পদ্মা ব্যারেজ হলে ভূ-উপরিস্থ পানির প্রাপ্যতা বাড়বে, ফলে মাটির নিচ থেকে পানি তোলার প্রবণতা কমবে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় রিচার্জ হওয়ার সুযোগ পাবে। এছাড়া, সারা বছর নদীতে পর্যাপ্ত মিঠা পানি থাকলে ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র প্রসারিত হবে, যা দেশের মৎস্য সম্পদে এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও কূটনৈতিক সতর্কতা

পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে রাজশাহীতে আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় এই মেগা প্রকল্পের বিষয়ে সরাসরি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সরকার গঠনের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই প্রকল্পের কাজ এগিয়ে নেওয়া সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব প্রতিফলন।

তবে, প্রকল্পের বিশালতা এবং আন্তর্জাতিক নদীর ওপর এর অবস্থান বিবেচনায় নিয়ে সরকার কূটনৈতিক দিকটিতেও বিশেষ নজর রাখছে। ভারতের সঙ্গে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি এবং সামগ্রিক নদী ব্যবস্থাপনার বিষয়টি সরকারের বিশেষ নজরদারিতে রয়েছে। যেহেতু গঙ্গা একটি অভিন্ন নদী, তাই আন্তর্জাতিক পানি আইনের কাঠামোর ভেতরে থেকেই বাংলাদেশ তার এই ন্যায্য অধিকার ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইছে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং দেশব্যাপী খাল খনন কর্মসূচি

প্রধানমন্ত্রীর সাথে অনুষ্ঠিত এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে শুধু পদ্মা ব্যারেজ নয়, বরং উত্তরের আরেক জীবনরেখা ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে তিস্তা প্রকল্পের ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

পাশাপাশি, দেশের অভ্যন্তরীণ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় গতি আনতে সরকার এক বিশাল উদ্যোগ নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমের আগেই দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচিকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী জানিয়েছেন, আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও পুনঃখননের এক মাস্টারপ্ল্যান হাতে নেওয়া হয়েছে। এই খালগুলো খনন করা হলে একদিকে বর্ষায় জলাবদ্ধতা দূর হবে, অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা খালের পানি ব্যবহার করে সহজেই সেচ কাজ চালাতে পারবেন।

বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন সাংবাদিকদের জানান, ঘণ্টাব্যাপী এই ফলপ্রসূ বৈঠকে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করা এবং নদী শাসন নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে যখন বিশুদ্ধ এবং ব্যবহারযোগ্য পানির সংকট বিশ্বজুড়ে তীব্র হচ্ছে, তখন পদ্মা ব্যারেজের মতো একটি প্রকল্প বাংলাদেশের জন্য শুধু উন্নয়ন নয়, বরং অস্তিত্ব রক্ষার এক লড়াই। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে এটি দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের পানির দীর্ঘস্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। মরুকরণের অভিশাপ থেকে বাঁচবে উত্তরবঙ্গ, লবণাক্ততার থাবা থেকে মুক্তি পাবে দক্ষিণবঙ্গ এবং নতুন প্রাণ ফিরে পাবে সুন্দরবন। এখন পুরো দেশবাসীর অপেক্ষা একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদন এবং দ্রুততম সময়ে এই স্বপ্নের প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category