• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৪৫ অপরাহ্ন
Headline
যেভাবে আমাদের ‘স্ট্যান্ডার্ড’ কমে যায় চোখের সমস্যা নিয়ে স্টিয়ারিংয়ে চালক: ৬০ শতাংশেরই ছিল অজানা, বড় ঝুঁকিতে সড়ক নিরাপত্তা ভারতের মুসলিমদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হতে হবে: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী সরকারের আচরণে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে : ১১ দলীয় ঐক্য এনসিপির ১৯৫ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা, আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ফের হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে ৭ দেশের তেল স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেবে ইরান ইউরোপের দেশে দেশে কেন বিক্ষোভ ধুলার মৃত্যুফাঁদে জীবন জাপানের বিনিয়োগে নতুন সমীকরণ: বিগ-বি ২.০ এবং ঢাকার বিপুল প্রত্যাশা জমি কেনাবেচায় প্রকৃত মূল্যের হিসাব ও কালো টাকার লাগাম

জমি কেনাবেচায় প্রকৃত মূল্যের হিসাব ও কালো টাকার লাগাম

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশে স্থাবর সম্পদ কেনাবেচা ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দীর্ঘকাল ধরে চলে আসা অপ্রদর্শিত অর্থের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আদায় কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে এক যুগান্তকারী ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে জমি, আবাসন প্লট কিংবা ফ্ল্যাটের হস্তান্তরে নামে মাত্র সরকারি ‘মৌজা মূল্য’-এর ভিত্তিতে দলিল সম্পন্ন করার সনাতন সুযোগ বন্ধ করে সম্পত্তির প্রকৃত লেনদেন বা বাজারমূল্য দলিলে প্রদর্শন নিশ্চিত করার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত এই বড় ধরনের সংস্কারের মাধ্যমে সম্পদ কেনাবেচায় কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি রোখা এবং অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা তৈরি হওয়ার সবচেয়ে বড় গোপন পথটি চিরতরে বন্ধ করাই রাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য। দীর্ঘদিনের বকেয়া এই জাতীয় সংস্কার কার্যকর করতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্ট সবকটি প্রশাসনিক দপ্তরকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত দ্রুতগতিতে কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করেছে ভূমি মন্ত্রণালয় এবং আইন ও বিচার বিভাগ।

সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নতুন এই মূল্যায়ন পদ্ধতি সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে তিন স্তরের এক বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে। বিভাগ, জেলা এবং উপজেলা—এই তিন ধাপে গঠিত বিশেষায়িত কমিটিগুলোকে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে করে তারা নিজ নিজ ভৌগোলিক এলাকার জমি, বাণিজ্যিক অবকাঠামো, আবাসিক ফ্ল্যাট ও অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তির বর্তমান ও বস্তুনিষ্ঠ বাজারদর পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরূপণ করতে পারে। এই প্রশাসনিক সমন্বয় ও মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম শেষ করতে কমিটিগুলোকে আগামী চার মাসের এক সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ভূমি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. এমদাদুল হক চৌধুরী নিশ্চিত করেছেন যে বহুধাপবিশিষ্ট এই কৌশলগত উদ্যোগ ইতোমধ্যে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভার মাধ্যমে নীতিগত অনুমোদন পেয়েছে এবং খুব শিগগিরই বিভাগীয় ও স্থানীয় কমিটিগুলো তাদের কাজ শুরু করতে যাচ্ছে।

সম্পত্তির এই বাজারমূল্য নির্ধারণী কমিটিকে কেবল একটি সাময়িক বা অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে সরকার, যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো বিজ্ঞানসম্মত স্থায়ী ব্যবস্থা চালু করা। ভূমি সচিবের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন কমিটিগুলোর মূল্য নিরূপণের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের সরাসরি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় বাংলাদেশে স্থাবর সম্পদের আধুনিক ‘ভ্যালুয়েশন মডেল’ তৈরি করা হচ্ছে। ডিজিটাল ও প্রামাণিক উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে গঠিত এই সায়েন্টিফিক মডেলেই ভবিষ্যতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে যেকোনো এলাকার জমির প্রকৃত বাজারদর নির্ধারিত হবে। সম্পূর্ণ স্থায়ী এই প্রামাণিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একটি নতুন মেগা প্রকল্প বর্তমানে চূড়ান্ত প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে শতভাগ সফলভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।

সরকারের এই দীর্ঘ প্রতীক্ষিত সংস্কার প্রয়াসকে স্বাগত জানিয়ে দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ও সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বিষয়টিকে যুগান্তকারী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে যদি সঠিক নিয়মে এই পরিকল্পনাটি মাঠপর্যায়ে রূপায়ণ করা সম্ভব হয়, তবে জাতীয় রাজস্ব আহরণে এক অভূতপূর্ব ও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে তিনি এ-ও স্মরণ করিয়ে দেন যে কেবল কাগজের কলমে বাজারদর পুনর্নির্ধারণ করলেই কাক্সিক্ষত সুফল পাওয়া যাবে না। এর সাথে দেশের জরাজীর্ণ ও আমলাতান্ত্রিক সাব-রেজিস্ট্রি প্রশাসন এবং প্রাচীন আমলের দলিল প্রস্তুতকরণ প্রক্রিয়ার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। পাশাপাশি নতুন মূল্যায়ন কাঠামো এমনভাবে নিখুঁত ও বিজ্ঞানভিত্তিক হতে হবে, যাতে সমগ্র দেশে তা সমানভাবে কার্যকর করা যায় এবং প্রভাবশালীরা প্রশাসনিক ফাঁকফোকর তৈরি করে কোনো অনৈতিক সুবিধা লুটে নিতে না পারে।

অন্যদিকে সুশাসনের নীতিগত জায়গা থেকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন যে হস্তান্তরের সময় প্রকৃত মূল্য লেখা বাধ্যতামূলক করা হলে জমিতে কালো টাকার অনুপ্রবেশ বহুলাংশে কমে আসবে। এই সংস্কারের টেকসই সাফল্যের জন্য তিনি ভৌগোলিক অবস্থান, অবকাঠামোগত সুবিধা ও ভূমির বহুমুখী ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে স্পষ্ট ও স্বচ্ছ মানদণ্ড নির্ধারণের তাগিদ দেন। একই সাথে নির্দিষ্ট সময় পরপর জমির দর সরকারিভাবে আপডেট করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্থানীয় জনগণ ও অংশীজনদের বাধ্যতামূলক গণশুনানির মুখোমুখি করার মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি, যা নীতি বাস্তবায়নে জনকল্যাণ সুগম করবে।

প্রশাসনিক পর্যায় থেকে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক নীতিনির্ধারণী বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গত ৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ভূমি এবং আইন ও বিচার বিভাগের সচিবদের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়। নির্দেশনার আলোকেই বিভাগীয় কমিটিগুলোকে সিটি করপোরেশন ও বড় শহরগুলোর স্থাবর সম্পত্তির দর নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে; জেলা কমিটিগুলো পৌরসভা ও ক্যাণ্টনমেন্ট এলাকার দর ঠিক করবে এবং উপজেলার যাবতীয় পল্লী ও মফস্বল এলাকার জমির বাজারদর ঠিক করবে উপজেলা কমিটিগুলো। জমি বা সম্পত্তির আগের রেজিস্ট্রিকৃত প্রকৃত দলিলের তথ্য, সাম্প্রতিক ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার দর, ভূমির বাণিজ্যিক ব্যবহার বা যোগাযোগ সুবিধা, বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ঠিক করা মূল্য এবং স্থানীয় বাজারে সরেজমিন তথ্য অনুসন্ধানের ভিত্তিতে এই প্রকৃত মূল্যায়ন চূড়ান্ত করা হবে।

চূড়ান্ত এই মূল্যায়ন প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন শেষে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে এক বিশেষ পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই সভায় নতুন করে নির্ধারিত বাস্তবভিত্তিক মৌজা মূল্যের ওপর ভিত্তি করে বিদ্যমান ফি ও করের হার প্রয়োগ করলে সাধারণ মানুষের কেনাবেচার মোট খরচ কতটা বাড়বে এবং সরকারের কোষাগারে অতিরিক্ত রাজস্বের কী প্রভাব পড়বে, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা হবে। অতিরিক্ত করের বোঝা থেকে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দিতে এবং দলিলে আসল দাম লিখতে উৎসাহিত করতে সে সময় বিদ্যমান করের হার যৌক্তিকীকরণ বা হ্রাস করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে। সকল পর্যালোচনা ও আইন সংশোধনের পর এই নতুন নিবন্ধিত ফি ও করের হার ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে সারা দেশে একযোগে কার্যকর করার সুনির্দিষ্ট সময়সূচি নির্ধারণ করেছে সরকার।

অর্থ বিভাগের গভীর পর্যালোচনায় স্পষ্ট দেখা গেছে, বর্তমানে কেনাবেচায় প্রকৃত লেনদেনের অঙ্কের চেয়ে অবিশ্বাস্যরকম কম সরকারি ‘মৌজা মূল্যে’ সম্পত্তি রেজিস্ট্রি করার এক মারাত্মক অনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এতে ভূমি হস্তান্তরের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব থেকে রাষ্ট্র সরাসরি বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে অপ্রদর্শিত টাকার পাহাড়ে কালো অর্থনীতির ব্যাপ্তি জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। ২০১০ সালে সম্পত্তির সর্বনিম্ন দর নির্ধারণে বিধিমালা করা এবং ২০১৫ সালে কিছু সংশোধন আনা হলেও গত এক দশকে বাজারে জমির দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও সরকারি বেঞ্চমার্ক মূল্যের কোনো বাস্তব সমন্বয় করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, গুলশান সাব-রেজিস্টার কার্যালয়ের অধীনে জোয়ার সাহারা, মহাখালী কিংবা কড়াইল এলাকায় বহুগুণ দামে জমি কেনাবেচা হলেও সরকারি সর্বনিম্ন দর প্রদর্শিত হচ্ছে নামমাত্র মূল্যে, যা অনলাইন প্রোপার্টি প্ল্যাটফর্ম বা সাধারণ বাজারদরের চেয়ে কয়েক গুণ কম।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ২০২৩-২৪ অর্থবছরের উপাত্ত অনুযায়ী, জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রির কর-ফি থেকে সরকারের আয় হয়েছিল ১২ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকা। কিন্তু সিপিডির অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দলিলে প্রকৃত বাজারমূল্য গোপন করার কারণে সরকার প্রতিবছর কমপক্ষে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ রাজস্ব আয় হারাচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের ভাষ্যমতে, বাস্তবে দলিলে শত লাখ টাকার জমিকে কয়েক লাখ টাকা দেখিয়ে রেজিস্ট্রি করার ফলে হস্তান্তরিত অতিরিক্ত অর্থটি সম্পূর্ণ হিসাবের বাইরে থেকে যায়, যা দেশের প্রচলিত অর্থনীতিতে অপ্রদর্শিত বা কালো টাকা সৃষ্টির সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে কাজ করে আসছে। তাই আগামী ২০২৭ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সর্বাত্মক সংস্কার কেবল জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং দেশের আবাসন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় এক নতুন স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত অধ্যায়ের সূচনা করবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category