হিজরি বর্ষপঞ্জির সর্বশেষ ও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ মাস হলো জিলহজ। ইসলামী শরিয়তে এই মাসটি এক অনন্য ও অসামান্য ফজিলতের অধিকারী। পবিত্র কোরআনের সূরা তাওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তাআলা যে চারটি মাসকে বিশেষভাবে সম্মানিত ও পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন, জিলহজ মাস তার মধ্যে অন্যতম। এই পবিত্র মাসগুলোর মর্যাদা এতই বেশি যে, জাহিলি যুগেও আরবরা এই মাসগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ ও রক্তপাত থেকে বিরত থাকত। তবে তারা নিজেদের স্বার্থ ও মর্জিমতো মাস বা বছরের হিসাব কমবেশি ও আগপিছ করে পবিত্র মাসগুলোর পবিত্রতা নষ্ট করত। পরবর্তীতে বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই বিকৃতি সংশোধন করে ঘোষণা করেন যে, সময়ের হিসাব তার নিজস্ব ও সঠিক স্থানে ফিরে এসেছে, ঠিক যেমনটি আসমান ও জমিন সৃষ্টির সময় নির্ধারিত ছিল। বারো মাসে এক বছর এবং এর মধ্যে চারটি মাস পরম সম্মানিত। এই চারটি মাসের মধ্যে তিনটি মাস হলো ধারাবাহিকভাবে জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম এবং আরেকটি হলো রজব মাস, যা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মধ্যবর্তী সময়ে আসে। সহিহ বুখারির হাদিস দ্বারা এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সত্যটি সুপ্রতিষ্ঠিত।
এই মাসের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, ইসলাম ধর্মের স্বতন্ত্র ও মৌলিক দুটি ইবাদত—হজ ও কোরবানি এই মাসেই সংঘটিত হয়। এই ইবাদত দুটি কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং এগুলো হলো ‘মিন শাআইরিল্লাহ’ বা ইসলামের অন্যতম প্রধান পরিচয়-চিহ্ন ও প্রতীক। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমান এই মাসে পবিত্র মক্কায় সমবেত হন কাবা তাওয়াফ ও আরাফার ময়দানে উপস্থিত হওয়ার জন্য। মূলত হজের মতো এমন একটি বিশাল ও তাৎপর্যপূর্ণ ইবাদতের দিকে সম্বন্ধিত করেই এই মাসের নামকরণ করা হয়েছে ‘জিলহজ’ বা হজের মাস। যেহেতু হজ ও কোরবানি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র দুটি ইবাদত এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে লুকিয়ে আছে হজরত ইবরাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.)-এর চরম আত্মত্যাগের অবিস্মরণীয় আখ্যান, তাই এই ইবাদতগুলোর জন্য রয়েছে আলাদা গুরুত্ব, পৃথক মর্যাদা ও স্বতন্ত্র বিধান।
জিলহজ মাসের ফজিলাতপূর্ণ দিনগুলোর কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে ‘আশারায়ে জিলহজ’ বা এই মাসের প্রথম দশ দিনের কথা। কোরআন মাজিদে সূরা ফাজরের শুরুতে আল্লাহ তাআলা যে দশটি রহস্যময় রজনীর শপথ করেছেন, তাফসিরকারকদের মতে সেই ‘দশ রজনী’ হলো জিলহজের এই প্রথম দশক। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত ইবনে যুবাইর (রা.) ও মুজাহিদ (রাহ.) সহ পূর্ববর্তী ও পরবর্তী অনেক প্রখ্যাত মুফাসসির এই মতই ব্যক্ত করেছেন। ইসলামী চিন্তাবিদ ও স্কলাররা ব্যাখ্যা করে বলেছেন, জিলহজের এই প্রথম দশ দিনের মর্যাদা এতই ব্যাপক যে, অনেক দিক থেকে এটি রমজানের শেষ দশ দিনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। রমজানের শেষ দশ রাতের শ্রেষ্ঠত্ব লাইলাতুল কদরের কারণে, কিন্তু দিনের বেলার শ্রেষ্ঠত্বের বিচারে জিলহজের প্রথম দশ দিন অতুলনীয়। কারণ, এই দশ দিনের মধ্যেই এমন কিছু ইবাদত একত্রিত হয়েছে, যা বছরের অন্য কোনো সময় একসঙ্গে পালন করা সম্ভব নয়—যথা নামাজ, রোজা, সদকা, হজ এবং কোরবানি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দশকের মর্যাদার ব্যাপারে স্পষ্ট ভাষায় ইরশাদ করেছেন যে, আল্লাহর নিকট জিলহজের এই দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। এমনকি সাহাবিরা যখন জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি এর চেয়ে উত্তম নয়? নবীজি উত্তর দিয়েছিলেন, জিহাদও নয়; তবে হ্যাঁ, সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে নিজের জান ও মাল নিয়ে জিহাদে বের হলো এবং এর কোনোটি নিয়েই আর ফিরে এলো না।
এই পবিত্র দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে জিলহজ মাসের নবম তারিখ, যা ইসলামী পরিভাষায় ‘ইয়াওমে আরাফা’ বা আরাফার দিন হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিত। এই দিনে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসা লাখো হাজি সাদা ইহরামের কাপড় পরে আরাফার বিশাল ময়দানে অবস্থান বা উকূফ করেন। পবিত্র হজ পালনের সবচেয়ে বড় ও প্রধান ফরজ বিধানই হলো এই দিনে আরাফার ময়দানে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থান করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। এই দিনটিকে হজের মূল দিন বলা হয়। আরাফার ময়দানে সমবেত হওয়াটা মূলত রোজ হাশরের বা কিয়ামতের দিনের এক ক্ষুদ্র ও বাস্তব প্রতিচ্ছবি। এই দিনে মহান রবের রহমতের বারিধারা প্রবল বেগে বান্দার দিকে ধাবিত হয়। আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং ফেরেশতাদের কাছে নিজ বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন। অসংখ্য-অগণিত বান্দাকে তিনি এই দিনে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নামের ভয়াবহ আগুন থেকে মুক্তি দেন। উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না।
আরাফার দিনের পরেই আসে জিলহজ মাসের দশম তারিখ, যা মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চরম আনন্দের দিন। হাদিসের ভাষায় এই দিনটিকে বলা হয় ‘ইয়াওমুন নাহর’ বা কোরবানির দিন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দিনের শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে বলেছেন, আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলার কাছে সবচেয়ে মহিমান্বিত ও মর্যাদাপূর্ণ দিন হচ্ছে এই কোরবানির দিন। আল্লাহ তাআলা এই দিনটিকে বিশ্ব মুসলিমের জন্য ঈদুল আজহা বা আনন্দের দিন হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, আমাকে ‘ইয়াওমুল আজহা’র আদেশ করা হয়েছে, অর্থাৎ এই দিনে পশু কোরবানি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং এই দিবসকে আল্লাহ তাআলা এই উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। এই কোরবানি কেবল পশু জবাই করার নাম নয়, বরং এটি হলো নিজের ভেতরের পশুত্ব, অহংকার ও দুনিয়ার মোহকে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় জবাই করার এক প্রতীকী রূপ। কোরবানির গোশত গরিব-দুঃখী ও আত্মীয়স্বজনের মাঝে বিলিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে যে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার সৃষ্টি হয়, তা ইসলামের এক অনবদ্য সৌন্দর্য।
আশারায়ে জিলহজ, হজ, কোরবানি, ইয়াওমে আরাফা এবং আইয়ামে তাশরিক—সব মিলিয়ে জিলহজ মাসটি হলো নেকি ও কল্যাণে বেষ্টিত এক অভাবনীয় সুযোগের মাস। তাই এই মাসের খায়ের ও বরকত হাসিল করার ব্যাপারে প্রতিটি মুমিনকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হয়। এই বরকতময় দিনগুলোকে বিভিন্ন নেক আমল ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে প্রাণবন্ত রাখার মাঝেই প্রকৃত সফলতা নিহিত রয়েছে। এই পবিত্র দিনগুলোতে আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য বেশি বেশি জিকির করার প্রতি তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর নিকট আশারায়ে জিলহজের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং এই দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (তাহলিল), ‘আল্লাহু আকবার’ (তাকবির) ও ‘আলহামদু লিল্লাহ’ (তাহমিদ) পাঠ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাহাবায়ে কেরামের যুগে হজরত ইবনে ওমর (রা.) এবং হজরত আবু হুরায়রা (রা.) এই দশ দিনে বাজারে গিয়ে উচ্চস্বরে তাকবির পাঠ করতেন, যাতে তাদের শুনে অন্যরাও তাকবির পাঠে মশগুল হয়।
জিকিরের পাশাপাশি এই দশকটি নফল রোজা রাখার জন্য অত্যন্ত ফজিলাতপূর্ণ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজের প্রথম নয় দিন রোজা রাখার ব্যাপারে অত্যন্ত যত্নবান ছিলেন। তবে এর মধ্যে ৯ তারিখ বা ‘ইয়াওমে আরাফা’র রোজার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। যারা হজে যাননি, তাদের জন্য এই দিনে রোজা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। এই দিনের রোজার বিষয়ে নবীজি (সা.) আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন যে, তিনি এই এক দিনের রোজার অসিলায় বান্দার পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের (মোট দুই বছরের) গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। তাই এই দিনটিকে অবহেলায় না কাটিয়ে রোজা, দোয়া-দরুদ, কান্নাকাটি ও তওবা-ইস্তিগফারের মাধ্যমে অতিবাহিত করা প্রতিটি সচেতন মুসলিমের কর্তব্য।
জিলহজ মাসের আরেকটি বিশেষ আমল ও বিধান হলো চুল ও নখ না কাটার বিধান। হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী, যখন আকাশে জিলহজের চাঁদ দেখা যাবে, তখন থেকে কোরবানির পশু জবাই করা পর্যন্ত ওই ব্যক্তির জন্য নিজের চুল, নখ ও শরীরের অবাঞ্ছিত লোম কাটা বা মোড়ানো থেকে বিরত থাকা মুস্তাহাব, যার কোরবানির করার সামর্থ্য ও ইচ্ছা রয়েছে। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এর পেছনের হিকমত বা প্রজ্ঞা হলো, হাজিরা যেমন ইহরাম অবস্থায় চুল-নখ কাটেন না, তেমনি যারা হজে যেতে পারেননি, তারাও নিজ বাড়িতে থেকে হাজিদের সাথে এই নিয়মের সাদৃশ্য অবলম্বন করে সওয়াবের অংশীদার হতে পারেন।
এর পাশাপাশি জিলহজ মাসের ৯ তারিখ ফজর থেকে শুরু করে ১৩ জিলহজ আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার ‘তাকবিরে তাশরিক’ পাঠ করা ওয়াজিব। তাকবিরটি হলো— ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’ পুরুষরা এই তাকবির উচ্চস্বরে পড়বেন এবং নারীরা অনুচ্চস্বরে বা মনে মনে পড়বেন। এই পাঁচ দিন তাকবিরে তাশরিক বলা হলেও ইসলামী পরিভাষায় সাধারণত ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজকে ‘আইয়ামে তাশরিক’ বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আইয়ামে তাশরিক হলো মূলত পানাহার করা এবং আল্লাহর জিকির করার দিন। যেহেতু এই দিনগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য আতিথেয়তার দিন এবং পানাহারের দিন, তাই জিলহজের ১০ তারিখ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত মোট চার দিন রোজা রাখা ইসলামী শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম বা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
পরিশেষে, জিলহজ মাস আমাদের সামনে আসে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ ও পরম করুণাময়ের সন্তুষ্টি অর্জনের এক বিশাল সুযোগ নিয়ে। শয়তান সব সময়ই মানুষের ইবাদতের একাগ্রতা ও ইখলাস নষ্ট করে দেওয়ার পাঁয়তারায় লিপ্ত থাকে। তাই এই পবিত্র মাসগুলোতে শয়তানের ধোঁকা থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে, একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় ইবাদতগুলো পালন করতে হবে। হজের আনুষ্ঠানিকতা, কোরবানির ত্যাগ, আরাফার রোজার পবিত্রতা এবং তাকবিরের ধ্বনি—সবকিছু মিলিয়ে জিলহজ মাস আমাদের শিক্ষা দেয় কীভাবে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করা যায়। মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সকলকে এই পবিত্র জিলহজ মাসের প্রতিটি মুহূর্তের গুরুত্ব যথাযথভাবে অনুধাবন করে ইবাদতের মাধ্যমে তা ফলপ্রসূ করার তাওফিক দান করুন।