• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১২:০৯ অপরাহ্ন
Headline
রাজধানীর গণপরিবহনে নতুন যুগের সূচনা: ৮৬১টি বাস নিয়ে সাত কোম্পানির যাত্রা ও শ্রমিকদের মাসিক বেতন নিশ্চিতকরণ পড়ালেখায় আগ্রহ হারাচ্ছে কিশোররা আয়-ব্যয় ও অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে টিআইবির গবেষণা: দলগুলোর এত টাকা আসে কোথা থেকে রাজস্ব ঘাটতি ও পে-স্কেলের চাপে সরকারের ব্যাংক ঋণ: চার মাসেই ৪৮ হাজার কোটি টাকার নিট ঋণ বেসরকারি খাতের বড় সংকট: অবসরের নির্দিষ্ট আর্থিক পরিকল্পনা নেই দেশের ৮১ শতাংশ কর্মীর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন অভিযানের ইঙ্গিত, যা বললো রাশিয়া জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মজুরির ব্যবধান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্তরায় শীতে ঘাড় ব্যথার কারণ ও প্রতিকার বাই দ্য রিভারস অব ব্যাবিলন – ৭ মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচন: ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার পতন এবং কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অগ্নিপরীক্ষা

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় ও মজুরির ব্যবধান: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের অন্তরায়

Reporter Name / ৭ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পুনরুত্থান প্রক্রিয়ায় এক মারাত্মক ও মৌলিক দুর্বলতা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে, যা হলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাসের ক্রমবর্ধমান সংকট। জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাধারণ শ্রমিক ও কর্মচারীদের মজুরি বৃদ্ধি পাচ্ছে না। এর ফলে নিত্যদিনের মৌলিক খরচ মেটাতে গিয়ে খেটে খাওয়া মানুষ চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়ছে। মুদ্রাস্ফীতি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা বাহ্যিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নীতিনির্ধারক মহলে নানা আলোচনা চললেও, প্রকৃত অর্থনৈতিক সুস্থতার মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত সাধারণ নাগরিকরা খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও যাতায়াতের মতো মৌলিক প্রয়োজনগুলো কোনো ধরনের ঋণ বা সঞ্চয় ভেঙে ফেলা ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যে মেটাতে পারছেন কি না।

পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে গত সেপ্টেম্বর মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিক সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে আট দশমিক চৌত্রিশ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাত দশমিক বাইশ শতাংশ হলেও খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ছিল আরও অনেক বেশি, যা প্রায় নয় দশমিক ত্রিশ শতাংশ। অথচ একই সময়ে সাধারণ মানুষের গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল সাত দশমিক নব্বই শতাংশ, যা প্রধান মূল্যস্ফীতির হারের চেয়েও নিচে অবস্থান করছে। মূল্যস্ফীতি ও মজুরি বৃদ্ধির এই ব্যবধান কেবল মাসিক পরিসংখ্যানের একটি সাধারণ ফারাক নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় এবং সঞ্চয়কে দ্রুত ক্ষয় করে দিচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের সিংহভাগই ব্যয় করে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্য ও সেবা খাতের পেছনে, ফলে মূল্যস্ফীতির এই ধাক্কা উচ্চবিত্তদের তুলনায় তাদের ওপর বহুগুণ বেশি মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের প্রবৃদ্ধি মন্থর হওয়ার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির স্থায়ী চাপ এবং নতুন করে মানুষের দারিদ্র্যসীমায় পতিত হওয়ার মতো উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই বাস্তব পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে কেবল বড় বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক বা জিডিপির খণ্ডিত প্রবৃদ্ধি দিয়ে দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষের আয়ের সুষম বণ্টন, কাজের সুযোগের মান এবং পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। যখন সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পায়, তখন তারা পুষ্টিকর খাবার, চিকিৎসা এবং সন্তানদের শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর ব্যয় কমাতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি বা সুদের হার বাড়ানোর ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। সুদের হার বাড়িয়ে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হলেও তা দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি পণ্যের সংরক্ষণাগার সংকট, পরিবহন খাতের জটিলতা, সরবরাহ চেইনের ত্রুটি কিংবা বাজার সিন্ডিকেটের কারসাজি দূর করতে পারে না। নিত্যপণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আনা, কঠোর বাজার মনিটরিং এবং প্রতিযোগিতা আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি আমদানিপালিসির ক্ষেত্রে সময়োপযোগী ও সুদূরপ্রসারী সিদ্ধান্ত নিয়ে অভ্যন্তরীণ বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ বজায় রাখতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করতে হলে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমের উৎপাদনশীলতা এবং শিল্প খাতের টেকসই বিকাশ ঘটাতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার প্রসারে নীতিগত সহায়তা প্রদান, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার এবং মানসম্মত কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা আবশ্যক। একই সঙ্গে গরিব ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিধি ও স্বচ্ছতা বাড়িয়ে তাদের জীবনমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার প্রকৃত সফলতা তখনই অর্জিত হবে, যখন দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ন্যূনতম নিরাপত্তা এবং স্বস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণ নিশ্চিত করতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়ের বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। জনবান্ধব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই মুদ্রাস্ফীতির চাপ থেকে সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category