• শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ অপরাহ্ন

দক্ষতার অভাবে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে ব্যর্থ বাংলাদেশ

Reporter Name / ১ Time View
Update : শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি গত কয়েক দশকে কৃষিভিত্তিক কাঠামো থেকে শিল্পভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হয়েছে এবং বিশ্ববাজারে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। দেশের মোট রফতানি আয়ের প্রায় পুরোটাই এখন উৎপাদিত পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কিন্তু এই বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির আড়ালে লুকিয়ে আছে একটি গভীর কাঠামোগত দুর্বলতা। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য যে ধরনের প্রযুক্তিগত গভীরতা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী শিল্পের প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেই দৌড়ে সমকক্ষ বা প্রতিযোগী অর্থনীতিগুলোর চেয়ে অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে। দেশের শিল্প খাতের সম্প্রসারণ ঘটলেও এর সিংহভাগই এখনো নিম্ন প্রযুক্তিনির্ভর। ফলে শিল্পের আকার ও রফতানি সক্ষমতা প্রতিনিয়ত বাড়লেও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন এবং প্রকৃত উৎপাদনশীলতার মাপকাঠিতে একটি বিশাল শূন্যতা বা ব্যবধান রয়ে গেছে। জাতিসংঘের শিল্প উন্নয়ন সংস্থার (ইউনিডো) সর্বশেষ কম্পিটিটিভ ইন্ডাস্ট্রিয়াল পারফরম্যান্স বা সিআইপি সূচকেও বাংলাদেশের শিল্প খাতের এই রূঢ় বাস্তবতা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার বিষয়টি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এই সূচকটি মূলত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পোৎপাদন, রফতানি সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির তুলনামূলক অবস্থান অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করে থাকে।

ইউনিডোর প্রকাশিত ২০২৬ সালের বৈশ্বিক দেশ শ্রেণীবিন্যাস বা কান্ট্রি ক্ল্যাসিফিকেশনে বাংলাদেশ, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামকে ‘এমার্জিং ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিকস’ বা উদীয়মান শিল্প অর্থনীতির শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত যেসব দেশের অর্থনীতি শিল্পোৎপাদনে একটি ধারাবাহিক ও টেকসই অগ্রগতি দেখাতে সক্ষম হয়েছে, সংস্থাটি তাদেরকেই এই বিশেষ শ্রেণীতে স্থান দিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০০ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে এই শ্রেণীভুক্ত দেশগুলোর মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজন গড়ে প্রতি বছর আট দশমিক সাত শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু একই শ্রেণীভুক্ত হয়েও অন্যান্য প্রতিযোগী ও তুলনীয় অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় সার্বিক সিআইপি সূচকে বাংলাদেশ বেশ হতাশাজনকভাবে পিছিয়ে রয়েছে। ইউনিডোর সিআইপি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান বর্তমানে ৬২তম। এই সূচকে বাংলাদেশের অর্জিত স্কোর হলো মাত্র দশমিক শূন্য চার তিন, যেখানে বৈশ্বিক গড় স্কোর হলো দশমিক শূন্য ছয় চার। এর বিপরীতে আমাদের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের অবস্থান ৩০তম, ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ৩৮তম এবং প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবস্থান ৩৯তম। অর্থাৎ, এই তিনটি দেশের শিল্প সক্ষমতার স্কোর বাংলাদেশের চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে রয়েছে, যা আমাদের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।

সামগ্রিক শিল্প সক্ষমতার পাশাপাশি প্রযুক্তিগত গভীরতা বা টেকনোলজিক্যাল ডেপথ পরিমাপের সূচকেও বাংলাদেশের পিছিয়ে থাকার এক ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ২০২৪ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের শিল্প খাতে মোট উৎপাদন মূল্যসংযোজনের বিশাল একটি অংশ, অর্থাৎ ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশই এসেছে সম্পূর্ণ নিম্ন প্রযুক্তির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড থেকে। এর বিপরীতে মধ্যম প্রযুক্তির অংশ ছিল মাত্র এক দশমিক নয় শতাংশ এবং উচ্চ প্রযুক্তির বা হাই-টেক কর্মকাণ্ডের অংশ ছিল একেবারেই নগণ্য, মাত্র দশমিক আট শতাংশ। আধুনিক বিশ্বে যেখানে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তির কর্মকাণ্ডই অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি, সেখানে এই সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৩টি দেশের মধ্যে ১১৭তম। ঠিক একইভাবে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তিপণ্যের রফতানি অংশের সূচকেও বাংলাদেশের অবস্থান তলানির দিকে, অর্থাৎ ১৪৬তম স্থানে রয়েছে। রফতানির প্রযুক্তিগত কাঠামোর দিক থেকে প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের এই ব্যবধান আকাশপাতাল। বাংলাদেশ থেকে উৎপাদিত পণ্য রফতানিতে মধ্যম ও উচ্চ প্রযুক্তির অংশ মাত্র তিন শতাংশ। এর বিপরীতে এই একই হার ইন্দোনেশিয়ায় ৩৫ দশমিক ২ শতাংশ, ভারতে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ভিয়েতনামে বিস্ময়করভাবে ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। সহজ কথায় বলতে গেলে, সমজাতীয় অর্থনীতির অন্যান্য দেশগুলো যখন উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য রফতানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, তখন বাংলাদেশের রফতানি খাত এখনো মূলত সস্তা শ্রম ও নিম্ন প্রযুক্তির পণ্যের ওপরই পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে আছে।

দেশের এই প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, সামগ্রিক বিবেচনায় বাংলাদেশের রফতানি আয় পরিমাণগত দিক থেকে অনেক বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে সেই অনুপাতে কোনো বাস্তব অগ্রগতি সাধিত হয়নি। তিনি উদাহরণ হিসেবে ভিয়েতনামের কথা উল্লেখ করে বলেন যে, আমাদের অন্যতম প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের রফতানি কাঠামোতে নিম্ন প্রযুক্তির অংশ ধারাবাহিকভাবে কমেছে এবং এর জায়গা দখল করে নিয়েছে উচ্চ প্রযুক্তির পণ্য। এর ঠিক বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো নিম্ন প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দুষ্টচক্রেই বেশি আটকে আছে এবং ঠিক এই কারণেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আমরা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ছি। ভিয়েতনামের এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান যে, ভিয়েতনাম মূলত বিদেশী বিনিয়োগ বা এফডিআই-নির্ভর শিল্পের দেশ, যার ফলে বিদেশী কোম্পানিগুলোর হাত ধরে সেখানে প্রযুক্তির উৎকর্ষ ও স্থানান্তর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে আমাদের রফতানিমুখী শিল্প খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প সম্পূর্ণ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় সেখানে উন্নত প্রযুক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে ধীরগতিতে। তবে এর মাঝেও আমাদের রফতানি আয়ে গার্মেন্টস খাতের অবদান বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অর্থনীতিবিদের মতে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়াতে হলে কাঠামোগত সংস্কার এবং প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যাপক নীতিগত পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ঢালাওভাবে সব খাতকে প্রণোদনা দেওয়ার বদলে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং বা হালকা প্রকৌশল এবং সেমিকন্ডাক্টরের মতো উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে বিনিয়োগকারীদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বা টার্গেটেড ইনসেনটিভ দেওয়া যেতে পারে। এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দেশের শিল্পের বৈচিত্র্য যেমন বাড়বে, তেমনি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও সার্বিক উৎপাদনশীলতাও নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

এতসব নেতিবাচক পরিসংখ্যানের মাঝেও মোট রফতানিতে উৎপাদিত পণ্যের অংশের দিক থেকে বাংলাদেশ একটি অনন্য ও শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশের মোট রফতানির ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশই হলো উৎপাদিত বা ম্যানুফ্যাকচার্ড পণ্য। এই হার ভিয়েতনামে ৯২ দশমিক ৮ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ায় ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভারতে মাত্র ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ। এই তথ্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মূল দুর্বলতা আসলে শিল্পভিত্তির বা কারখানার অভাব নয়। আমাদের প্রধান ব্যর্থতা হলো বিদ্যমান এই বিশাল শিল্পভিত্তিকে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এবং উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী উৎপাদনে সময়মতো রূপান্তর করতে না পারা। এছাড়া মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজনের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বড় প্রতিযোগী দেশের চেয়ে বাংলাদেশ কিছুটা এগিয়ে রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতে মাথাপিছু মূল্যসংযোজন ছিল ৬১৫ ডলার, যা ভারতের ৩৪১ ডলার এবং ভিয়েতনামের ৫১৮ ডলারের চেয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এক্ষেত্রেও ইন্দোনেশিয়া ৮১৫ ডলার নিয়ে আমাদের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। ইউনিডোর সূচকে মাথাপিছু উৎপাদন মূল্যসংযোজনের সক্ষমতায় বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান ৮৪তম। এই নির্দিষ্ট সূচকে বাংলাদেশের স্কোর দশমিক শূন্য দুই শূন্য, যেখানে বৈশ্বিক গড় স্কোর হলো দশমিক শূন্য সাত চার, যা প্রমাণ করে যে আমাদের এখনো অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।

বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের রফতানি খাতকে শুধু ভারত, ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার সাথেই লড়তে হচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি চীন ও তুরস্কের মতো দেশের পণ্যের সাথেও তীব্র প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বৈশ্বিক শিল্প সক্ষমতা সূচকে চীন বর্তমানে দ্বিতীয় এবং তুরস্ক ২৬তম অবস্থানে রয়েছে। শিল্প খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, দেশের শিল্প সক্ষমতা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়াতে এবং ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন খাতের সার্বিক ব্যয় কমাতে বেশ কিছু জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় রাখা, কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, দেশে টেকসই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পূর্ণ নিরাপত্তা বজায় রাখা, মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ব্যাংক ঋণসহ অর্থায়ন ও অবকাঠামোগত ব্যয় কমানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। তবে শুধুমাত্র অবকাঠামো বা নীতিগত সহায়তা দিলেই হবে না, উৎপাদনশীলতা কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নিতে হলে শিল্পের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন ও পেশাগতভাবে দক্ষ বিশাল এক জনবল গড়ে তোলাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রযুক্তি ও দক্ষতার এই প্রকট ঘাটতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন যে, বর্তমান বিশ্বে শিক্ষা ব্যবস্থা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যে অভাবনীয় পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এখনো সেই পর্যায়ের ধারেকাছেও নিতে পারিনি। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের পেশাগত দক্ষতা শিল্পের আধুনিক ও পরিবর্তনশীল চাহিদার সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এবং শিল্প খাতের মধ্যে যে নিবিড় সংযোগ বা ইন্ডাস্ট্রি-অ্যাকাডেমিয়া লিংকেজ থাকা প্রয়োজন ছিল, তা এখনো তৈরি হয়নি। তিনি আরো আক্ষেপ করে বলেন যে, যদি আমরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পন্ন পেশাজীবী ও কর্মী তৈরি করতে পারতাম, তবে লাইট ইঞ্জিনিয়ারিংসহ শিল্পের বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। মূলত দক্ষ জনবলের এই তীব্র ঘাটতির কারণেই সম্ভাবনাময় খাতগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং বাধ্য হয়ে আমরা এখনো সস্তা ও নিম্ন মূল্যের পণ্য উৎপাদনেই বেশি কেন্দ্রীভূত হয়ে আছি। তৈরি পোশাক খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন যে, এই খাতটিকেও এখন দ্রুত উচ্চ মূল্যসংযোজনকারী পণ্যের দিকে ধাবিত হতে হবে এবং এই রূপান্তরের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির কোনো বিকল্প নেই।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও দক্ষতায় প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে থাকার এই কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়েই দেশব্যাপী পালিত হচ্ছে জাতীয় উৎপাদনশীলতা দিবস। এই বিশেষ দিনটি উপলক্ষে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক গুরুত্বপূর্ণ গোলটেবিল বৈঠকে দেশের নীতিনির্ধারকরাও বিষয়টি নিয়ে তাদের ভাবনার কথা জানিয়েছেন। বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য সরকারি কার্যক্রমে সমন্বয় আনার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন যে, দেশের প্রকৃত উৎপাদনশীলতা বাড়াতে হলে সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর মধ্যে ওভারল্যাপিং বা একই ধরনের কার্যক্রমের অহেতুক পুনরাবৃত্তি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। এই অপচয় রোধ করার জন্য বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় যেকোনো নতুন প্রকল্প গ্রহণের আগে বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর সঙ্গে এর উদ্দেশ্য ও কার্যক্রমের কোনো ধরনের ওভারল্যাপিং রয়েছে কিনা, তা আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন। এডিপির নতুন প্রকল্প প্রস্তাবগুলো এআই-ভিত্তিক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ব্যবস্থায় যাচাইয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী জানান যে, অত্যাধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করে যদি একই উদ্দেশ্যে অন্য কোনো মন্ত্রণালয় বা সংস্থায় চলমান প্রকল্প আগেই শনাক্ত করা যায়, তবে সরকারের ব্যয়ের দক্ষতা বহুগুণ বাড়বে এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

বিশ্ববাজারের বর্তমান কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরে মন্ত্রী তার বক্তব্যে আরো বলেন যে, উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর বিষয়টি এখন শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বরং টিকে থাকার স্বার্থে বিশ্বের সব দেশের জন্যই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বর্তমান মুক্তবাজার অর্থনীতিতে যদি কোনো পণ্য প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ও মানে উৎপাদন করা সম্ভব না হয়, তবে সেই আন্তর্জাতিক বাজার খুব সহজেই অন্য কোনো দেশের দখলে চলে যাবে। তাই শুধু দেশীয় বাজার সুরক্ষার নীতি নিয়ে বসে থাকলে চলবে না, বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্প ও অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে এগিয়ে নিতে হলে এখন প্রয়োজন অত্যন্ত বাস্তবভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ, সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা, যুগোপযোগী ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সর্বোপরি সর্বস্তরে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব নিশ্চিত করা। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলেই কেবল বাংলাদেশ প্রযুক্তিগত দুর্বলতা কাটিয়ে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদনের মানচিত্রে একটি সম্মানজনক ও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

তথ্যসূত্র:  বণিক বার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category