• শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৫৬ অপরাহ্ন

ধুলার মৃত্যুফাঁদে জীবন

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশের অনানুষ্ঠানিক ও কম নজরদারিপূর্ণ উৎপাদন খাতে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন নীরব এক আতঙ্কের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। পেট চালানোর তাগিদে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ পাথর ভাঙার চাতাল, চালকল কিংবা সুতা তৈরির কারখানাগুলোতে হাড়ভাঙা খাটুনি খাটছেন। কিন্তু এসব কর্মক্ষেত্রের বাতাসে ভেসে বেড়ানো অদৃশ্য, সূক্ষ্ম ও মারাত্মক ক্ষতিকর ধূলিকণা প্রতিনিয়ত নিঃশ্বাসের সাথে প্রবেশ করে ক্ষতবিক্ষত করছে তাঁদের ফুসফুস। নিরাপত্তা সরঞ্জামের চরম অভাব, আইনি বাধ্যবাধকতার শিথিলতা এবং মালিকপক্ষের উদাসীনতার কারণে পাথর কাটা, ধান ছাঁটাই ও তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের শ্রমিকেরা কাজের সুফল পাওয়ার আগেই প্রাণঘাতী পেশাগত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। কর্মক্ষমতা হারিয়ে বহু মানুষ স্থায়ী শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য জটিল শারীরিক ব্যাধিতে ধুঁকছেন, যা দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রম নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ জাতীয় সংকট তৈরি করেছে।

পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিচালিত একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও স্বাস্থ্য পরীক্ষার তথ্যে। আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সাময়িকী ‘হেলথ সায়েন্স রিপোর্টস’-এ ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, লালমনিরহাটের বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার ১৩টি পাথর কাটার কারখানায় নিয়োজিত অন্তত তিন বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ২০০ জন শ্রমিকের ফুসফুসের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলে তাঁদের মধ্যে ১৭৮ জন বা ৮৯ শতাংশেরই দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের কোনো না কোনো গুরুতর উপসর্গ পাওয়া গেছে। গবেষণা চলাকালে জানা যায়, পরীক্ষাধীন শ্রমিকদের ৭৫ দশমিক ৫ শতাংশ প্রতিনিয়ত বুকে তীব্র চাপ অনুভব করেন, ৭৪ দশমিক ৫ শতাংশ চরম শ্বাসকষ্টে ভুগছেন এবং ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশের শরীরে স্থায়ী বা দীর্ঘস্থায়ী কাশির উপস্থিতি স্পষ্ট। এছাড়া ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশের শ্বাস গ্রহণের সময় বুকের ভেতরে বাঁশির মতো অস্বাভাবিক শব্দ তৈরি হয় এবং ৪৫ দশমিক ৫ শতাংশ শ্রমিকের কফ জমাসহ প্রাত্যহিক স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা গেছে।

পাথর ভাঙার কারখানার এসব শ্রমিকের স্বাস্থ্যসূচক পরীক্ষার ফলাফল চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের রীতিমতো শঙ্কিত করে তুলেছে। গবেষণায় যুক্ত ১৭৮ জন অসুস্থ শ্রমিকের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা স্পাইরোমেট্রি পরীক্ষার মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫৩ জন শ্রমিকের শ্বাসপ্রশ্বাসের বায়ু চলাচলে স্থায়ী বাধার উপস্থিতি রয়েছে এবং ৭৬ জন শ্রমিকের ফুসফুসের স্বাভাবিক প্রসারণ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাকিদের স্বাস্থ্যগত প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক ধাপে থাকলেও তাঁদের শারীরিক সক্ষমতা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম। কেবল ফুসফুসের ক্ষমতা স্বাধীনভাবে মেপেই চিকিৎসকরা ক্ষান্ত হননি; ২০০ জন শ্রমিকের বুকের রেডিওগ্রাফি বা এক্স-রে করা হলে ৭৬ জনের ফুসফুসে স্পট বা অস্বাভাবিক ক্ষতি শনাক্ত হয়। তাঁদের মধ্যে ৫৪ জনের ফুসফুসের উভয় পাশে একাধিক গুটি বা দাগের ছায়াসদৃশ তন্তুময় টিস্যুর উপস্থিতি মিলেছে এবং ১০ জন শ্রমিকের ফুসফুসে প্রোগ্রেসিভ ম্যাসিভ ফাইব্রোসিস বা ব্যাপকভাবে টিস্যু পচে শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো অনারোগ্য ক্ষত ধরা পড়েছে। আরও ১২ জনের ফুসফুসের লসিকাগ্রন্থিতে ডিমের খোসার মতো অস্বাভাবিক ক্যালসিয়াম জমার লক্ষণ দেখা গেছে, যা সিলিকোসিসের সুনির্দিষ্ট আলামত।

পাথর কাটার স্থানগুলোতে কর্মক্ষেত্রের বাতাসের মান পরীক্ষা করে দেখা গেছে, সেখানে ভাসমান ক্ষতিকর ধূলিকণার পরিমাণ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সহনশীল মাত্রার চেয়ে বহু গুণ বেশি। গবেষণায় প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর পরিমাণ পাওয়া গেছে ৯৭৯ দশমিক ৭৮ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০-এর পরিমাণ ১২৯৮ দশমিক ৩৫ মাইক্রোগ্রাম, যা যেকোনো সুস্থ মানুষের জন্য উন্মুক্ত বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত বিষাক্ত। এত বিষাক্ত পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ কাজ করা সত্ত্বেও অংশগ্রহণকারী ৯৬ শতাংশ শ্রমিক কাজের সময় কোনো ধরনের কার্যকর পার্সোনাল প্রটেক্টিভ ইকুইপমেন্ট বা মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করতেন না। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সচেতনতা ও নিরাপত্তা উপকরণের অভাবে তারা দিনের পর দিন পাথর গুঁড়ো হয়ে উড়ে আসা সিলিকন কণা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসের গভীরে টেনে নিতে বাধ্য হয়েছেন।

একই ধরনের বায়ুদূষণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা গেছে দেশের চালকল বা অটো ও সনাতন চাতালগুলোতে। রংপুর অঞ্চলে পরিচালিত অপর এক বিশদ জরিপে ৪৭টি চালকলের ৩৪৬ জন শ্রমিক এবং কারখানার বাইরে বাস করা সমসংখ্যক সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য তুলনা করা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, চালকলের ৫২ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমিকের অন্তত একটি দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা রয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এই উপসর্গের হার ছিল মাত্র ১৭ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ চালকলের বাতাসে ক্ষতিকর ধূলিকণা উড়ে চাতাল শ্রমিকদের দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এসব চালকলের শ্রমিকদের প্রায় ৩৮ দশমিক ৭ শতাংশ দীর্ঘস্থায়ী কাশির শিকার এবং ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়মিত নাক দিয়ে পানি পড়া ও সর্দিতে ভোগেন। ২২ দশমিক ৫ শতাংশের ফুসফুসে কফ জমে থাকে এবং ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ শ্রমিক বুকে অবর্ণনীয় চাপ অনুভব করার কথা জানিয়েছেন।

চালকলের ধূলিকণায় স্বাস্থ্যের ক্ষতি কাজের সময় এবং মেয়াদের ওপর অনেকাংশে নির্ভর করে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শ্রমিক ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে চাতাল বা মিলিং লাইনে কাজ করছেন, তাঁদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নতুনদের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ গুণ বেশি। একই সাথে যারা দৈনিক ১০ ঘণ্টার বেশি একটানা ডিউটি করেন, তাঁদের শ্বাসতন্ত্রের ক্ষতি হওয়ার প্রবণতাও লক্ষণীয়ভাবে বেশি। চালকলের ধান ছাঁটাই বা মিলিং বিভাগে বাতাসের সূক্ষ্ম ধূলিকণা পিএম ২.৫-এর মাত্রা পাওয়া গেছে প্রতি ঘনমিটারে ৪৯২ দশমিক ১ মাইক্রোগ্রাম এবং পিএম ১০-এর মাত্রা ছিল ৬৭৮ দশমিক ১৯ মাইক্রোগ্রাম। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এত বিষাক্ত ধূলিঝড়ের মাঝে কাজ করা সত্ত্বেও জরিপে দেখা গেছে মাত্র ৬ দশমিক ৬ শতাংশ চাতাল শ্রমিক নিয়মিত মাস্ক পরতেন। বিশেষ করে সনাতন পদ্ধতির খোলা চাতালে কর্মরত শ্রমিকেরা আধুনিক সয়ংক্রিয় রাইস মিলের শ্রমিকদের চেয়ে স্বাস্থ্যগত দিক দিয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন।

অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে দেশের বস্ত্র ও পোশাক শিল্পের অন্যতম প্রাথমিক উৎস তুলা ও সুতা প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোতে। গাজীপুরের কোনাবাড়ী এলাকায় তুলা থেকে সুতা তৈরির একটি কারখানার ১০০ জন শ্রমিকের সঙ্গে ১০০ জন সুস্থ মানুষের ফুসফুসের বাতাসের ক্ষমতা বা পালমোনারি ফাংশন তুলনা করে দেখা গেছে, তুলার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আঁশ ও ধূলিকণা শ্রমিকদের ফুসফুসের কার্যক্ষমতা আশঙ্কাজনকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে। পরীক্ষায় দেখা গেছে, এক সেকেন্ডে সজোরে ফুসফুস থেকে বাতাস বের করে দেওয়ার প্রত্যাশিত প্রমিত মাত্রা ২ দশমিক ৯২ লিটার হওয়া উচিত হলেও তুলা কারখানার শ্রমিকদের গড় মাত্রা পাওয়া গেছে মাত্র ২ দশমিক ৪৭ লিটার, যা স্বাভাবিক ক্ষমতার তুলনায় প্রায় ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ কম। সজোরে ফুসফুসের পূর্ণ বাতাস খালি করার স্বাভাবিক ধারণক্ষমতা ৩ দশমিক ৩৪ লিটার হওয়ার কথা থাকলেও পরীক্ষায় মিলেছে ২ দশমিক ৮৬ লিটার, যা প্রমিত চাহিদার চেয়ে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ কম।

কারখানার ভিন্ন ভিন্ন বিভাগের বাতাসের মান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যেখানে তুলা মেশিনে দিয়ে প্রাথমিক প্রসেসিং করা হয় বা ‘ব্লো রুম’, সেখানকার প্রতি ঘনমিটার বাতাসে পিএম ২.৫-এর মাত্রা ১২৫ মাইক্রোগ্রাম। ফলে এই বিভাগের শ্রমিকদের ফুসফুসের বায়ু ধারণক্ষমতা অন্য প্যাকেজিং বা স্পিনিং বিভাগের তুলনায় সবচেয়ে কম পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী শ্রমিকদের ৫৩ শতাংশই কাজের সময় মাস্ক পরিধান করেন না। আর যারা মাস্ক পরেন বলে জানিয়েছেন, তাদের অনেকেই সাধারণ পুনর্ব্যবহারযোগ্য এক পরতের কাপড়ের মাস্ক ব্যবহার করতেন, যা ধুলার ক্ষুদ্রতম পিএম ২.৫ কণা আটকানোর জন্য মোটেও কার্যকর নয়।

বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, পাথর ভাঙার সময় বাতাসে ওড়া সিলিকন কণা বা অত্যন্ত সূক্ষ্ম বালুকণা বাতাসের সাথে শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে স্থায়ী ‘সিলিকোসিস’ রোগের জন্ম দেয়। এটি ফুসফুসের এক ধরনের ক্রনিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ বা ডিপিএলডি জাতীয় ব্যাধি। এসব ক্ষুদ্র কণা ফুসফুসের বায়ুকোঠিতে জমা হয়ে অনবরত প্রদাহ তৈরি করে এবং একপর্যায়ে ফুসফুসের টিস্যুকে স্থায়ীভাবে শক্ত ও তন্তুময় করে তোলে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ফাইব্রোসিস বলা হয়। এর ফলে ফুসফুস স্বাভাবিক বাতাস টেনে নেওয়ার প্রসারণ ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে এবং আক্রান্ত ব্যক্তি তীব্র ও অনারোগ্য শ্বাসকষ্টে পতিত হন। এটি এমন এক ক্ষতিকারক শারীরিক অবক্ষয় প্রক্রিয়া যা একবার শরীরে শুরু হলে কোনো আধুনিক ওষুধ বা চিকিৎসায় ফুসফুসকে আর পূর্বের সুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। অধিকন্তু, এটি যক্ষ্মা ও জটিল ফুসফুসীয় সংক্রমণের ঝুঁকি বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

এই নিরবচ্ছিন্ন পেশাগত বিপর্যয় নিরসনে এখন সমন্বিত ও আইনি কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছাড়া বিকল্প নেই। কেবল শ্রমিকদের ব্যক্তিগতভাবে মাস্ক বা সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে রাষ্ট্র ও মালিকপক্ষ পার পেতে পারে না। সুনির্দিষ্ট টেকসই সমাধান আনতে হলে কারখানার ভেতরে ধূলিকণা সৃষ্টির উৎস স্থলেই আধুনিক ডাস্ট কালেক্টর, ভেজা বা স্প্রে পদ্ধতি এবং বাতাস চলাচলের জন্য যথাযথ বায়ু নিষ্কাশন ব্যবস্থার বা ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যেন অনানুষ্ঠানিক খাতগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার আওতায় এনে কারখানায় আন্তর্জাতিক মানের এন-৯৫ বা কার্যকর রেসপিরেটরি মাস্ক বিতরণ এবং শ্রমিকদের প্রতি ছয় মাস পর পর বাধ্যতামূলক ফুসফুস ও বুকের এক্স-রে পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া সিলিকোসিস বা কর্মক্ষেত্রে আক্রান্ত হয়ে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ে ফেলা শ্রমিকদের আইনি কাঠামো তৈরি করে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান, পুনর্বাসন এবং বিকল্প উপার্জনের সুযোগ তৈরি করা জাতীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category