• রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৬:৫৭ অপরাহ্ন

নিরাপদ বিদেশযাত্রার শর্তেই সাবেক রাষ্ট্রপতির বঙ্গভবন ত্যাগ

Reporter Name / ২ Time View
Update : রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

দেশে অবাধে চলাচলের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং রাজনৈতিক হয়রানি ছাড়া নির্বিঘ্নে বিদেশে পাড়ি জমানোর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি পাওয়ার পরেই শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জল্পনা-সংস্থান ও নেপথ্য দরকষাকষির পর ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সঙ্গে এক বিশেষ সমঝোতার মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপ্রধানের পদ থেকে সরে দাঁড়ান। বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে পদত্যাগী রাষ্ট্রপতির এই বিশেষ অনুরোধটি মেনে নেওয়া হলেও রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কোনো আইনি দায় না নেওয়ার অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালীন সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের আওতায় যেসব আইনি প্রতিরক্ষা ও সুরক্ষার বিধান রয়েছে, পদত্যাগের পরও তিনি তা পুরোপুরি পাবেন বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে।

সরকারের নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে, পদত্যাগের পরপরই মো. সাহাবুদ্দিনের দ্রুত বিদেশে চলে যাওয়াটা সব পক্ষের জন্যই তুলনামূলক নিরাপদ। বিগত সরকারের আমলে মনোনীত ও নির্বাচিত এই রাষ্ট্রপ্রধানকে ঘিরে দেশে নানা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব। জনসমক্ষে বিস্তারিত মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকলেও দলের ভেতরের আলোচনায় বিষয়টি পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। পদত্যাগী রাষ্ট্রপ্রধান নিজেও নিজের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার দোহাই দিয়ে খুব দ্রুত দেশ ছাড়তে আগ্রহী। বঙ্গভবন ছাড়ার পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি জানান যে, শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই আগামী ১০ থেকে ১২ দিনের মধ্যে তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাবেন।

যদিও সমঝোতার বিষটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কোনো সরাসরি উত্তর না দিয়ে জানান যে, সংবিধানের নিয়ম মেনে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদে গোপন ভোটের মাধ্যমে পরবর্তী রাষ্ট্র প্রধান নির্বাচন করা হবে এবং এই প্রার্থীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের আসন্ন বৈঠকে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবির তথা জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ এবং নেপথ্যের সমঝোতা সম্পর্কে আগে থেকেই অবগত ছিল। দলটির এক জ্যেষ্ঠ নেতা নিশ্চিত করেছেন যে, রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের মাধ্যমে সরানোর জন্য তাদের দিক থেকে চাপ থাকলেও, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত একটি কৌশলগত সমঝোতা ও সম্মানজনক বিদায়ের মাধ্যমে সাহাবুদ্দিনের বিদেশে যাওয়ার পথ সুগম করাকেই শ্রেয় মনে করেছে বিএনপি সরকার।

ক্ষমতা ছাড়ার পরও প্রটোকল অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ সরকারি নিরাপত্তা পেলেও, রাজপথে কিংবা বাসভবনে রাজনৈতিক সংগঠন বা বিক্ষোভকারীদের মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এই ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তাকে দ্রুত বিদেশে পাঠানোর কৌশলটিকে রাজনৈতিকভাবে বেশি কার্যকর বলে মনে করছে নীতিনির্ধারকরা। ইতঃপূর্বে গুলশান-১ নম্বরের রেসিডেনসিয়াল এলাকায় একটি অভিজাত ফ্ল্যাট সাজিয়ে প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে বঙ্গভবন থেকে বিদায় নেওয়ার পর তিনি সাময়িকভাবে অবস্থান করবেন। সহকারী একান্ত সচিবের সূত্রে জানা গেছে, দু-এক দিনের মধ্যেই বঙ্গভবনের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে তিনি গুলশানের ওই নতুন ঠিকানায় উঠবেন।

সমঝোতার পুরো প্রক্রিয়াটিকে রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে সাজাতে রাষ্ট্রপতি এবং সরকারি দল উভয় পক্ষই ‘গুরুতর শারীরিক অসুস্থতা’ শব্দজোড়াকে মূল কারণ হিসেবে সামনে এনেছে। জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি ও স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ এক সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, প্রবীণ এই রাষ্ট্রপ্রধান একজন মানুষ এবং তিনি স্রেফ অসুস্থতাজনিত শারীরিক কারণেই দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। বিএনপি ক্ষমতার আসার পর থেকেই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের মর্যাদাহানি না করে তাকে সম্মানজনকভাবে বিদায় জানানোর একটি সুনির্দিষ্ট পথ খুঁজছিল। যার প্রতিফলন দেখা গেছে আইনমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্যে, যেখানে তিনি স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেন যে রাষ্ট্রপতি পদে থাকাকালীন সাহাবুদ্দিনের নেওয়া যেকোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপ নিয়ে পরবর্তীতে কেউ কোনো আইনি ঝামেলা বা মামলা দায়ের করতে চাইলে সরকার তা যাচাই-বাছাই ছাড়া বরদাশত করবে না।

তবে সুরক্ষার এই প্রতিশ্রুতি কেবল রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়টুকুর জন্যই প্রযোজ্য থাকবে। এর বাইরে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকাকালীন ভূমিকা, ঋণ অনুমোদন বা অন্যান্য ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সাথে তার সম্পর্কের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব নাকচ করেছে সরকার। বিশেষ করে ২০১৭ সালে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসেবে ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদে যোগ দেওয়া, পরবর্তীতে ভাইস চেয়ারম্যান পদে উন্নীত হওয়া এবং সংশ্লিষ্ট গ্রুপের ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ ও শেয়ার দুর্নীতি সংক্রান্ত নথিপত্র বর্তমানে আদালতের বিচারে বিচারাধীন রয়েছে। ওই সব পুরনো অনিয়মের দায়ভার সরকার বা বিএনপি বহন করবে না বলে আইনি সূত্রে জানা গেছে।

ইতিমধ্যেই সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেছেন এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত দুটি আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বরে বসতে যাওয়া জাতীয় সংসদের অধিবেশনেই ৯০ দিনের আইনি বাধ্যবাধকতার ভেতর দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। তবে পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান কে হচ্ছেন, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রার্থী এখনও নির্ধারণ করা হয়নি বলে নিশ্চিত করেছে সরকারের একাধিক উচ্চপর্যায়। সব মিলিয়ে, রাজনৈতিক সমীকরণ রক্ষা, আইনি জটিলতা এড়িয়ে যাওয়া এবং রাষ্ট্রপ্রধানকে সম্মানজনকভাবে বিদেশে পাঠানোর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এক উত্তপ্ত সাংবিধানিক সংকটের সাময়িক ইতি টানল বর্তমান সরকার।

তথ্যসূত্র: টাইমস অফ বাংলাদেশ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category