• শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

পরিত্যক্ত রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানায় বৈশ্বিক ও দেশীয় বিনিয়োগের জোর সম্ভাবনা

Reporter Name / ৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

দেশের অর্থনীতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার করতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ, লোকসানি ও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানাগুলোকে পুনরায় পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে ফেরানোর এক ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা হাজার হাজার একর অব্যবহৃত সরকারি জমি এবং বিদ্যমান অবকাঠামোকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি বৃহৎ বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)। বছরের পর বছর ধরে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, সুশাসনের অভাব, আধুনিক প্রযুক্তির অপ্রতুলতা এবং নীতিগত ব্যর্থতার কারণে যে কারখানাগুলোতে মরিচা ধরেছিল, সেগুলোকে এবার স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নতুন বেসরকারি উদ্যোক্তাদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।

বিডার প্রণীত বিনিয়োগ পোর্টাফোলিও অনুযায়ী, দেশের পাঁচটি প্রধান সরকারি করপোরেশনের অধীনে থাকা মোট ৪৪টি বন্ধ ও অলাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং তাদের বিশাল ভূসম্পত্তিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই তালিকাভুক্ত সম্পদগুলোর ভৌগোলিক সীমানায় প্রায় ১০ হাজার একরেরও বেশি তৈরি শিল্পজমি রয়েছে, যেখানে পূর্ব থেকেই বিদ্যুৎ সংযোগ, গ্যাস লাইন, সড়ক যোগাযোগ এবং সুবিশাল শেড বা গুদামঘরের সুবিধা বিদ্যমান। ফলে নতুন কোনো উদ্যোক্তা সেখানে সরাসরি মূলধন ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করে দ্রুততম সময়ে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করতে পারবেন। কেবল কারখানা চালু করাই নয়, বরং সরকারের ওপর থেকে বিশাল ঋণের বোঝা কমানো, অগণিত নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা এবং জাতীয় রপ্তানি সক্ষমতা বহু গুণে বৃদ্ধি করাই এই মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য।

অচল শিল্পপ্রতিষ্ঠানের এই তালিকায় কেমিক্যাল, টেক্সটাইল, চিনি ও খাদ্য, স্টিল অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এবং পাট মিলস করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে খুলনার ঐতিহ্যবাহী নিউজপ্রিন্ট মিল, সাভারের ঢাকা লেদার কোম্পানি, বারবকুণ্ডের চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স কিংবা দিনাজপুরের কটন মিলের মতো ঐতিহাসিক শিল্পসম্পদগুলো আন্তর্জাতিক দরপত্র, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) বা আধুনিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে অতীতের সরকারগুলোর সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে লিজের নামে বহু মূল্যবান জমি দখল বা ফেলে রাখার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তা আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরসন করে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

ইতিমধ্যেই দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত শিল্পগোষ্ঠী এই পরিত্যক্ত কারখানা ও সরকারি জমিতে যৌথ বা একক বিনিয়োগের প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে। চীনের জিরো জিয়াম, জার্মানির সাফা প্লাস কিংবা দেশের স্বনামধন্য ট্রান্সকম, আকিজ, প্রাণ-আরএফএল, এসিআই ও নাবিল গ্রুপের মতো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিডার এই পোর্টফোলিওকে বেশ ইতিবাচকভাবে দেখছে। অনেক শিল্পগ্রুপ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রস্তাবপত্র জমা দিয়েছে এবং বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা পর্যালোচনা করছে। সরকারি নীতি-নির্ধারকেরা মনে করছেন, দ্রুত পর্যালোচনার ভিত্তিতে নির্ভরযোগ্য ও দক্ষ ব্যবসায়ীদের নির্বাচন করা গেলে দেশের শিল্প খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা ঘটবে।

তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি সতর্কতার সাথে বাস্তবায়নের ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। তাদের মতে, অলাভজনক সরকারি কারখানাগুলোর কাঁধে বিপুল পরিমাণ বকেয়া ঋণ ও প্রশাসনিক কাঠামোগত দুর্বলতা জমে রয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে বিনিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত, স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের না করা গেলে কেবল লিজ দিয়ে সাফল্য পাওয়া কঠিন হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে শুধু চুক্তি স্বাক্ষর নয়, বরং লিজ নেওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শিল্প স্থাপন নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে যৌথ অংশীদারিত্ব বা শেয়ার ছাড়ার মতো আধুনিক কৌশল অবলম্বন করা জরুরি।

তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category