• মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬, ০৪:০৯ অপরাহ্ন
Headline
রাতের ভ্রমণে ১০টি সতর্কতা মালয়েশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মির্জা আব্বাসকে দেখতে গেলেন গোলাম পরওয়ার দিল্লি ফেরালেই আইনি সুরক্ষা, তবে শাস্তি আদালতের হাতে: হাসিনার পরিণতি নিয়ে সরকারের স্পষ্ট বার্তা কোরবানির ঈদ নিয়ে ভিন্ন ভাবনায় পরীমনি পেলের রাজকীয় রেকর্ডে নেইমারের ছোঁয়া: ১০ নম্বর জার্সিতে সেলেসাওদের শেষ মহাকাব্যের অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব ফুটপাত পথচারীর, নাকি হকারের? জায়গা বরাদ্দ নীতিমালার বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের কড়া রুল আগ্রাসনের কড়া জবাব: সীমান্তে প্রতিরোধের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ কওমি রাজনীতিতে ক্ষমতার নতুন মেরুকরণ: জামায়াত-হেফাজত স্নায়ুযুদ্ধে ভাঙনের মুখে ইসলামী ঐক্য ‘ভূমি সেবা জনগণের প্রতি করুণা নয়’: হয়রানিমুক্ত আধুনিক ব্যবস্থাপনার কড়া বার্তা প্রধানমন্ত্রীর ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন রূপরেখা

পশ্চিমবঙ্গে ইমাম ও পুরোহিতদের সরকারি ভাতা বাতিল

Reporter Name / ৪ Time View
Update : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে গত ৪ মে এক ঐতিহাসিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। দীর্ঘদিনের তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় প্রথমবারের মতো আসীন হয়েছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। আর ক্ষমতায় বসেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এমন কিছু যুগান্তকারী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে শুরু করেছে, যা রাজ্যের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোয় বড় ধরনের ভূকম্পন তৈরি করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং চাঞ্চল্যকর সিদ্ধান্তটি হলো রাজ্যের সমস্ত ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং হিন্দু পুরোহিতদের জন্য এতদিন ধরে চলে আসা সরকারি মাসিক ভাতা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া। আজ সোমবার (১৮ মে) নবগঠিত রাজ্য সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আর সেই প্রথম বৈঠকেই এই বড় সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়েছে, যা আগামী জুন মাস থেকেই কার্যকর হতে যাচ্ছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।

সোমবারের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার বৈঠকে মূলত দুটি বড় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। প্রথম সিদ্ধান্তটি হলো ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ভাতা প্রদান প্রথার সম্পূর্ণ অবসান ঘটানো। আর দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি হলো সমাজে পিছিয়ে পড়া বা অনগ্রসর শ্রেণিদের (ওবিসি) জন্য এতকাল ধরে চালু থাকা বিভিন্ন সরকারি সুবিধা ও সংরক্ষণ আপাতত বাতিল করা। রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, সমাজের প্রকৃত পিছিয়ে পড়া মানুষদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের ভিত্তিতে সম্পূর্ণ নতুন একটি আলাদা কোটা বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মন্ত্রিসভার প্রথম দিনের এই জোড়া সিদ্ধান্ত স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে, নতুন সরকার পূর্বতন সরকারের তথাকথিত ‘তোষণনীতি’র মূল শেকড় উৎপাটন করতে বদ্ধপরিকর এবং তারা তাদের নিজস্ব আদর্শিক রূপরেখা অনুযায়ী রাজ্য পরিচালনা করতে চাইছে।

পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সরকারি কোষাগার থেকে ভাতা দেওয়ার এই প্রথাটির একটি দীর্ঘ ও বিতর্কিত ইতিহাস রয়েছে। ২০১২ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি রাজনৈতিকভাবে রাজ্যের একটি বড় ভোটব্যাংককে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র মুসলিম সম্প্রদায়ের ইমামদের জন্য মাসিক ২ হাজার ৫০০ রুপি ভাতা প্রদানের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে এর সঙ্গে মুয়াজ্জিনদের জন্যও মাসিক ১ হাজার রুপি ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। শুরুতে রাজ্য সরকারের সরাসরি কোষাগার থেকে এই ভাতা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও, কলকাতা হাইকোর্টে তা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। আদালত তখন এই সিদ্ধান্তকে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থি বলে রায় দিয়েছিল। এরপর তৎকালীন রাজ্য সরকার কৌশল পরিবর্তন করে রাজ্যের সংখ্যালঘু ওয়েলফেয়ার বা কল্যাণ বিভাগের অধীনে থাকা ওয়াকফ বোর্ডের মাধ্যমে এই ভাতার অর্থ বিতরণের ব্যবস্থা করে। মূলত রাজ্য সরকার অনুদান হিসেবে ওয়াকফ বোর্ডকে অর্থ দিত এবং সেখান থেকেই ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের এই ভাতা প্রদান করা হতো।

ইমাম ভাতা চালুর পর থেকেই তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপি এই নীতির তীব্র সমালোচনা করে আসছিল। তাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল যে, তৃণমূল সরকার রাজ্যের মুসলিম ভোটব্যাংক নিশ্চিত করার জন্য নগ্নভাবে ‘সংখ্যালঘু তোষণনীতি’ বা তুষ্টিকরণের রাজনীতি করছে। একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে করদাতার টাকায় কেন নির্দিষ্ট একটি ধর্মের উপাসনালয়ের নেতাদের বেতন বা ভাতা দেওয়া হবে, সেই প্রশ্ন তুলে বিজেপি বারবার রাজনৈতিক মাঠ সরগরম করেছে। এই তোষণের অভিযোগ থেকে নিজেদের ভাবমূর্তি রক্ষা করতে এবং হিন্দু ভোটারদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ২০২০ সালে বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরেকটি কৌশলগত পদক্ষেপ নেন। তিনি রাজ্যের সনাতন ধর্মাবলম্বী পুরোহিতদের জন্যও সরকারি মাসিক ভাতা চালুর ঘোষণা দেন। শুরুতে সনাতন ব্রাহ্মণ ট্রাস্টের মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় ৮ হাজার হতদরিদ্র পুরোহিতকে মাসে ১ হাজার রুপি করে ভাতা দেওয়া শুরু হয়। তবে সর্বশেষ ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে আগে রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের লক্ষ্যে এই পুরোহিত ভাতা বাড়িয়ে ২ হাজার রুপি করা হয়েছিল।

মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের যুক্তি হলো, করদাতার অর্থ কোনোভাবেই ধর্মীয় কাজে বা ধর্মীয় নেতাদের ব্যক্তিগত ভাতায় ব্যয় হওয়া উচিত নয়। সরকারের মূল কাজ হলো রাজ্যের অবকাঠামোগত উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতের উন্নতি সাধন করা। বিজেপি নেতাদের মতে, পূর্ববর্তী সরকার শুধুমাত্র ভোটের রাজনীতির হিসাব মেলাতে গিয়ে রাজ্যের কোষাগারের ওপর এই বিপুল আর্থিক বোঝা চাপিয়েছিল। এখন থেকে এই ভাতার পেছনে ব্যয় হওয়া কোটি কোটি রুপি রাজ্যের প্রকৃত উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে। তাদের আদর্শিক স্লোগান ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’-এর ওপর জোর দিয়ে সরকার বার্তা দিতে চাইছে যে, ধর্মের ভিত্তিতে কোনো বিভাজন বা বিশেষ আর্থিক সুবিধা এই রাজ্যে আর বরদাস্ত করা হবে না।

তবে সরকারের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে রাজ্যের প্রান্তিক পর্যায়ের ইমাম ও পুরোহিতদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ এবং হতাশা নেমে এসেছে। শহরের বড় বড় মসজিদ বা মন্দিরের ইমাম ও পুরোহিতদের আয় তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও, পশ্চিমবঙ্গের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্রামের অনেক ছোট মসজিদ ও মন্দিরের ইমাম বা পুরোহিতদের নির্দিষ্ট কোনো বড় আয়ের উৎস নেই। সমাজের মানুষের দেওয়া সামান্য অনুদান এবং এই সরকারি ভাতার ওপর ভিত্তি করেই তাদের অনেকের সংসার চলত। হঠাৎ করে আগামী মাস থেকে এই ভাতা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘোষণায় তাদের অনেকেই এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে এমনিতেই মুদ্রাস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেড়েছে, তার ওপর এই সরকারি সহায়তার পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছেন হাজার হাজার ধর্মীয় সেবক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনেক পুরোহিত এবং ইমাম হতাশা ব্যক্ত করে বলেছেন, রাজনীতির এই পালাবদলের খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেন তারা, যারা শুধুমাত্র ধর্মকর্ম নিয়ে সাধারণ জীবনযাপন করতেন।

মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় সিদ্ধান্তটি অর্থাৎ পিছিয়ে পড়া গোষ্ঠীদের সুবিধা বাতিলের বিষয়টিও সমানভাবে রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়াচ্ছে। ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও তপশিলি জাতি (এসসি), তপশিলি উপজাতি (এসটি) এবং অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে বিগত সরকারের আমলে ওবিসি তালিকাভুক্তির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু মুসলিম সম্প্রদায়কে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়েছিল বলে বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিল। এমনকি কলকাতা হাইকোর্টেও সম্প্রতি ওবিসি তালিকা প্রণয়ন নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেই সেই পুরো সংরক্ষণ প্রক্রিয়াটি স্থগিত করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো ওবিসি তালিকাকে ঢেলে সাজানো। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ধর্ম নয়, বরং প্রকৃত সামাজিক ও অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার ভিত্তিতেই নতুন কোটা বা সংরক্ষণ ব্যবস্থা নির্ধারণ করা হবে।

বিরোধী দলগুলো, বিশেষ করে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের এই পদক্ষেপগুলোর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তাদের মতে, এটি চরম প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং বিভাজনমূলক রাজনীতির বহিঃপ্রকাশ। তৃণমূল নেতাদের দাবি, ইমাম বা পুরোহিতদের যে ভাতা দেওয়া হতো, তা তাদের ধর্মীয় কাজের জন্য নয়, বরং তাদের আর্থসামাজিক দুর্দশা লাঘবের একটি মানবিক সহায়তা মাত্র। একইভাবে অনগ্রসর শ্রেণির সুবিধা বাতিল করাকে তারা প্রান্তিক মানুষের অধিকার কেড়ে নেওয়ার শামিল বলে আখ্যায়িত করছেন। তবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা নতুন সরকার বিরোধীদের এই সমালোচনাকে খুব একটা আমলে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না।

বিশ্লেষকদের মতে, শুভেন্দু অধিকারীর সরকারের এই পদক্ষেপগুলো মূলত বিজেপির সর্বভারতীয় হিন্দুত্ববাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষতার নিজস্ব ব্যাখ্যারই একটি বাস্তব প্রয়োগ। ভারতের অন্যান্য বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতেও তারা এই একই মডেল অনুসরণ করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশকের বামপন্থি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনের পর বিজেপির এই ডানপন্থি নীতির সরাসরি প্রয়োগ রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে চলেছে। আগামী দিনগুলোতে এই ভাতা এবং কোটা বাতিলের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আদালতে আইনি লড়াই এবং রাজপথে রাজনৈতিক আন্দোলন দেখা যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। জুন মাস থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হলে রাজ্যের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও রাজনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি কী প্রভাব পড়ে, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category