• বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন
Headline
আদালতের সমন উপেক্ষা: সময় টিভির সাবেক এমডি আহমেদ জোবায়ের কারাগারে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভারসাম্য রক্ষার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর সাগর-রুনি হত্যা মামলা: তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ পেছাল ১২৭ বার ইতিহাসের সর্বোচ্চ লোকসানে দেশের ব্যাংক খাত পুশইনে বিএসএফের নতুন কৌশল ও রুট পঞ্চগড়ে সেনানিবাস স্থাপনের দাবি তুললেন সারজিস আলম মাতারবাড়ী সংযোগ সড়ক প্রকল্পে সাড়ে৪শ কোটি টাকার হরিলুট তেহরানের কৌশলগত বিজয় ও পরাশক্তির অহংকার চূর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দফা যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর মহাতারকার অফ-ফর্ম ও দীর্ঘ খরা: কঙ্গোর বিপক্ষে পর্তুগালের পয়েন্ট হারানোর নেপথ্যে রোনালদো

পাচারের আট লাখ কোটি টাকা ফেরানোর জটিল সমীকরণ

অর্থনৈতিক বিশ্লেষক / ৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

ইতিহাসে রাজা হারিয়েছেন রাজ্য, ব্যবসায়ী হারিয়েছেন জাহাজ, আর কৃষক হারিয়েছেন ফসল—এমন নজির অনেক আছে। কিন্তু একটি রাষ্ট্র যখন নিজেই বুঝতে পারে যে বছরের পর বছর ধরে তার বুক থেকে রক্তক্ষরণ হয়েছে, তখন সেই ক্ষত পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অর্থপাচারের গল্পটা ঠিক তেমনই এক নিঃশব্দ অর্থনৈতিক মহাপ্লাবন, যার ঢেউ আজ এসে ঠেকেছে রাষ্ট্রের দেয়ালে। পাচার হওয়া টাকা যখন দেশের সীমানা পেরিয়ে যায়, তখন তা কেবল টাকা থাকে না; তা হয়ে যায় আন্তর্জাতিক আইনের জটিল কুয়াশা।

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা পরিষদের উচ্চপর্যায়ের উদ্যোগে এবং গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ও শ্বেতপত্র কমিটির তথ্যে দেখা গেছে, গত ১০ বছরে দেশ থেকে প্রায় ৬ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকা) পাচার হয়েছে। এটি কেবল সাধারণ দুর্নীতি নয়, এটি ছিল সুপরিকল্পিত অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ।

পাচারের প্রধান পথ ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা

অর্থনীতির ভাষায় এই পাচারের প্রধান হাতিয়ার ছিল ‘ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং’ বা আমদানি-রপ্তানির হিসাব জালিয়াতি। কাগজের কলমে পণ্যের দাম বাড়িয়ে বা কমিয়ে দেখিয়ে এই বিপুল অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। প্রযুক্তিগতভাবে এটিকে অপরাধ বলা হলেও, বাস্তবে এটি ছিল একটি অত্যন্ত সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা। কারণ এই ধরনের পাচার একা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব নয়; এর পেছনে ব্যাংক, আমলা, ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিক ছায়াপ্রধানদের একটি শক্তিশালী চক্র জড়িত ছিল। আমরা কেবল এই অর্থই হারাইনি, এর সাথে হারিয়েছি অসংখ্য কর্মসংস্থান, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন সম্ভাবনা।

আন্তর্জাতিক আইনি গোলকধাঁধা

বাংলাদেশের টাকা দেশ থেকে বিদেশে গেছে কোনো ভিসা ছাড়াই, কিন্তু ফেরার সময় তাকে পাসপোর্ট, ভিসা, সাক্ষী, আইনজীবী এবং আদালতের কঠোর পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো দেশ কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে এক ডলারও ফেরত দেয় না। টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি ধাপে বিভক্ত:

  • প্রথম ধাপ: প্রমাণ করতে হবে যে অর্থটি অবৈধভাবে অর্জিত হয়েছিল।

  • দ্বিতীয় ধাপ: নিখুঁত নথিপত্র দিয়ে প্রমাণ করতে হবে যে সেটি বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে।

  • তৃতীয় ধাপ: সংশ্লিষ্ট দেশের আদালতের মাধ্যমে সেই সম্পদ জব্দের (Asset Freezing) নির্দেশ আনতে হবে।

সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, অতীতে অত্যন্ত দক্ষ লক্ষণ বা পেশাদারদের দিয়ে এই টাকা পাচার করা হয়েছে। যারা টাকা সরিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক আইন, অফশোর কোম্পানি ও ব্যাংকিং গোপনীয়তার মারপ্যাঁচে সিদ্ধহস্ত। ফলে সেই টাকার হদিস পাওয়া এবং তা আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ করা অত্যন্ত দুরূহ।

মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিক (MLAT)

বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থের প্রধান গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকং। এসব দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আইনি কাঠামো কঠোর। তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, তবে কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা বা অনুমানের ভিত্তিতে নয়, সুনির্দিষ্ট নথিপত্র ও প্রমাণের ভিত্তিতে। এই লড়াইয়ে এখন সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অস্ত্র হয়ে উঠেছে মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ট্রিটি (MLAT) বা পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তি।

আদালতের এই লড়াইয়ে প্রতিপক্ষের বা পাচারকারীদের আইনজীবীরা রাষ্ট্রীয় প্রমাণকে দুর্বল করার সব ধরনের চেষ্টা চালাবেন। ফলে এটি কোনো রাজনৈতিক যুদ্ধের ময়দান নয়, এটি সম্পূর্ণ দলিল ও প্রমাণের যুদ্ধ।

‘ট্যাক্স হ্যাভেন’ ও শেল কোম্পানির বাধা

অর্থ উদ্ধারের পথে অন্যতম বড় বাধা হলো বিভিন্ন ট্যাক্স হ্যাভেন (Tax Haven) বা কর ফাঁকি দেওয়ার নিরাপদ অঞ্চল। বিশ্বের কিছু অঞ্চলে কোম্পানির প্রকৃত মালিকের নাম সম্পূর্ণ গোপন রাখা যায়। পাচারকারীরা সেখানে ‘শেল কোম্পানি’ বা অস্তিত্বহীন কাগজি প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সম্পদ লুকিয়ে রাখে। ফলে টাকা এক দেশ থেকে আরেক দেশে এমনভাবে ঘুরতে থাকে যেন তার কোনো নির্দিষ্ট নাগরিকত্বই নেই।

বিশ্ব ইতিহাস ও বাংলাদেশের পরীক্ষা

বিশ্বের ইতিহাস বলে, এই আইনি যুদ্ধ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। ফিলিপাইন তাদের সাবেক প্রেসিডেন্ট মার্কোসের এবং নাইজেরিয়া বহু বছর আইনি লড়াই চালিয়ে স্বৈরশাসক সানি আবাচার লুকানো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার উদ্ধার করতে পেরেছে। তবে দুটি দেশই একটি সত্য শিক্ষা দিয়েছে—এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার প্রধান শর্ত হলো ‘ধৈর্য’

বর্তমান সরকার অর্থপাচারের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে এবং ১১টি যৌথ অনুসন্ধান দল গঠন করেছে। এটি একটি ইতিবাচক সংকেত। আন্তর্জাতিক আদালত কোনো দেশে সম্পদ ফেরত দেওয়ার আগে সবার আগে দেখে, ওই অর্থ যে দেশ থেকে এসেছে সেখানে সত্যিই অপরাধীদের বিচার হচ্ছে কি না। যদি নিজ দেশে বিচারিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হয়, তবে আন্তর্জাতিক মহল সম্পদ ফেরত দিতে আগ্রহ দেখায় না।

বাংলাদেশ এখন আন্তর্জাতিক আইনের এক কঠিন পরীক্ষার হলে বসে আছে। প্রশ্নপত্র কঠিন নয়, কিন্তু উত্তর মেলানোর সময়টা দীর্ঘ। এখানে তাড়াহুড়ো করলে পুরো উত্তরপত্র বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে, আবার ভুল করলে নম্বর কাটা যাবে। তাই অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সাথে আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে ব্যবহার করতে হবে এবং দক্ষ জনবল তৈরি করতে হবে। যখন আইন, কূটনীতি এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা একই পথে হাঁটবে, তখনই টাকা ফেরত আনা সম্ভব। দিনশেষে এই লড়াই কোনো দল বা সরকারের নয়; এটি সাধারণ শ্রমিকের ঘাম, প্রবাসীর রেমিট্যান্স এবং করদাতার আমানত ফিরিয়ে আনার লড়াই। টাকা চুরি হতে এক মুহূর্ত সময় লাগলেও, ন্যায়বিচার ফিরে আসতে সময় লাগে। আর সেই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ধৈর্যই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

তথ্যসূত্র: দ্যা প্রেস


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category