• শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩০ অপরাহ্ন

প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফরে খুলছে রুদ্ধ শ্রমবাজার

Reporter Name / ৪৩ Time View
Update : সোমবার, ৮ জুন, ২০২৬

দীর্ঘ দুই বছর ধরে সম্পূর্ণ বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় উন্মুক্ত হওয়ার এক নতুন ও জোরালো আশার আলো দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বিশেষ ও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণে আগামী ২১শে জুন কুয়ালালামপুর সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২২শে জুন পর্যন্ত নির্ধারিত এই অতি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে কেন্দ্র করে দুই দেশের কূটনৈতিক ও জনশক্তি রপ্তানি খাতে এক অভূতপূর্ব নড়াচড়া শুরু হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনের উচ্চপর্যায়ের সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের মূল এজেন্ডাই হতে যাচ্ছে প্রায় দুই বছর ধরে ঝুলে থাকা অভিবাসন জট খোলা। সবকিছু ঠিক থাকলে ২১শে জুনের এই মেগা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক থেকেই বাংলাদেশি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বহুল কাঙ্ক্ষিত মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর ঐতিহাসিক ঘোষণা আসতে পারে। এই সফর শেষ করেই আবার ২৩ থেকে ২৬শে জুন প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে, যা বর্তমান সরকারের বৈশ্বিক কূটনীতির এক বড় অংশ।

সিন্ডিকেটের কালো ছায়া ও নীতিগত পরিবর্তনের আশঙ্কা

শ্রমবাজার খোলার এই উজ্জ্বল সম্ভাবনার সমান্তরালে রিক্রুটিং এজেন্সি এবং জনশক্তি বিশেষজ্ঞদের মনে একটি বড় ধরনের পুরোনো আতঙ্ক ও উদ্বেগ নতুন করে দেখা দিয়েছে। সেটি হলো—অতীতের সেই কুখ্যাত ও বিতর্কিত ‘নিয়োগ সিন্ডিকেট’ ব্যবস্থার পুনরুত্থান। অভিবাসন খাতের ভেতরের তথ্য বলছে, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে অতীতে স্বাক্ষরিত বিতর্কিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কোনো ধরনের মৌলিক সংশোধন বা পরিবর্তন ছাড়াই পুনরায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করার গোপন আলোচনা চলছে। বর্তমান সমঝোতা স্মারকের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, এতে যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি বেছে নেওয়ার সম্পূর্ণ ও একচেটিয়া ক্ষমতা মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)-এর সাবেক যুগ্ম মহাসচিব টিপু সুলতানসহ অন্যান্য ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, বিদ্যমান চুক্তির ফাঁকফোকর এবং মালয়েশিয়ার দেওয়া কিছু কঠোর শর্তের কারণে বাংলাদেশের প্রায় আড়াই হাজার লাইসেন্সধারী এজেন্সির ভবিষ্যৎ অন্ধকারের মুখে পড়বে। এর ফলে মাত্র অল্প কয়েকটি প্রভাবশালী ও অর্থশালী এজেন্সির হাতে পুরো দেশের নিয়োগ প্রক্রিয়া অবরুদ্ধ বা কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়বে। এর আগে ২০২২ সালে যখন বাজারটি খুলেছিল, তখন মাত্র ১০০টি এজেন্সির একটি বিশেষ সিন্ডিকেট চক্র সাধারণ কর্মীদের পকেট থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছিল। সরকারের বেঁধে দেওয়া অভিবাসন ব্যয় যেখানে ছিল মাত্র ৭৯ হাজার টাকা, সেখানে এক একজন অসহায় কর্মীকে মালয়েশিয়ায় পৌঁছাতে প্রায় ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত চড়া মাশুল দিতে হয়েছিল।

মালয়েশিয়ার ১০টি বিতর্কিত শর্ত ও বাংলাদেশের দরকষাকষি

জনশক্তি বাজার চালুর প্রক্রিয়াটি গতিশীল করতে গত ২০২৫ সালের ২৮শে অক্টোবর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশকে ১০টি বাধ্যতামূলক শর্ত জুড়ে দিয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছিল। এই শর্তগুলোর ওপর ভিত্তি করেই কর্মী পাঠাতে সক্ষম রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা চাওয়া হয়। তবে এই শর্তগুলোর বেশ কয়েকটি দেশের সাধারণ এজেন্সির জন্য চরম বৈষম্যমূলক হওয়ায় বাংলাদেশ এর তীব্র আপত্তি জানায়। দীর্ঘ দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষির পর মালয়েশিয়া সরকার শেষ পর্যন্ত ৩টি শর্ত কিছুটা শিথিল করতে সম্মত হয়েছে। মালয়েশিয়ার মূল বিতর্কিত শর্তগুলোর কয়েকটি নিচে তুলে ধরা হলো:

  • পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা: বিগত ৫ বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে অন্তত ৩ হাজার প্রবাসী কর্মী পাঠানোর বাস্তব পূর্ব-অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

  • বিশাল স্থায়ী অফিস: এজেন্সির নিজস্ব মালিকানাধীন বা তিন বছর ধরে সচল অন্তত ১০ হাজার বর্গফুটের একটি বিশাল স্থায়ী অফিস স্পেস থাকতে হবে।

  • নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র: কর্মীদের কারিগরি ও ভাষা শিক্ষার জন্য এজেন্সির নিজস্ব বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকা বাধ্যতামূলক।

  • ক্লিন ইমেজ: এজেন্সির নূন্যতম ৫ বছরের বৈধ লাইসেন্স, অন্তত ৩টি ভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ট্র্যাক রেকর্ড এবং বলপূর্বক শ্রম বা মানব পাচারে জড়িত না থাকার ‘গুড কন্ডাক্ট সার্টিফিকেট’ থাকতে হবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে সমস্ত নিয়মকানুন মেনে চলা ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি পরিচ্ছন্ন ও নতুন তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। তবে দেশটির আমলাতান্ত্রিক ধীরগতি ও প্রশাসনিক ফাইলের জটিলতার কারণে এখনও চূড়ান্ত অনুমোদন মেলেনি।

প্রতিযোগী দেশগুলোর আগ্রাসন ও হাতছাড়া হওয়া বাজার

বাংলাদেশ যখন অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট ভাঙা এবং শর্ত শিথিলের প্রশাসনিক ও আইনি মারপ্যাঁচে আটকে রয়েছে, ঠিক সেই দীর্ঘসূত্রতার পূর্ণ সুযোগ লুফে নিচ্ছে আমাদের প্রতিযোগী দেশগুলো। নেপাল, ভারত, পাকিস্তান এবং মিয়ানমার কোনো ধরনের বড় ঝামেলা ছাড়াই মালয়েশিয়ার বাজারে নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিজেদের কর্মী সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে, বাংলাদেশের জন্য বাজারটি আনুষ্ঠানিকভাবে উন্মুক্ত হওয়ার আগেই দেশটির কলকারখানা ও সেবা খাতের সিংহভাগ জনশক্তির চাহিদা অন্য দেশগুলো পূরণ করে ফেলছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই সংকটের মূল কারণ কেবল সাধারণ প্রশাসনিক বা দাপ্তরিক ফাইল চালাচালি নয়; এর পেছনে লুকিয়ে আছে দুই দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী একটি মাফিয়া গোষ্ঠী, মধ্যস্বত্বভোগী দালাল চক্র এবং নিয়োগ সিন্ডিকেটের বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়িক স্বার্থ। এই অশুভ চক্রটিকে যদি প্রধানমন্ত্রীর কুয়ালালামপুর সফরের টেবিল থেকে সম্পূর্ণ দূর করা না যায়, তবে বাংলাদেশের এই বিশাল ও আকর্ষক শ্রমবাজারটি স্থায়ীভাবে অন্য দেশগুলোর দখলে চলে যাবে।

মন্ত্রীর জিরো টলারেন্স নীতি ও পদত্যাগের কঠোর চ্যালেঞ্জ

এই ভয়াবহ সিন্ডিকেট চক্র রুখতে সরকারের পক্ষ থেকে এক নজিরবিহীন ও অনড় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। সম্প্রতি মালয়েশিয়া সফর শেষে মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে তিনি সিন্ডিকেট চক্রের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করে বলেন:

“আমি প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলে আসছি, আমি যতদিন এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে চেয়ারে থাকবো, ততদিন কোনো ধরনের অনৈতিক সিন্ডিকেটের সুযোগ দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। যদি আমি একটি সম্পূর্ণ সিন্ডিকেটমুক্ত ও স্বচ্ছ শ্রমবাজার দেশবাসীকে উপহার দিতে না পারি, তবে আমি স্বেচ্ছায় মন্ত্রিত্ব ছেড়ে চলে যাবো। এটিই আমার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।”

মন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন যে, আগামী ১০ থেকে ১৫ দিন কিংবা সর্বোচ্চ এক মাসের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও বৈপ্লবিক নতুন প্রস্তাবনা দেশবাসী দেখতে পাবেন, যা পুরো ধোঁয়াশা দূর করে শ্রমবাজারের দরজা খুলে দেবে।

রেমিট্যান্সের নতুন দিগন্ত ও পাঁচ বছরের মহাপরিকল্পনা

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সালে মাত্র ২৩ জন সাহসী শ্রমিকের হাত ধরে মালয়েশিয়ার বুকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে এই রুটটি ছিল দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ফুসফুস। বিশেষ করে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে রেকর্ডসংখ্যক ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকে এক লাফে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ২০০৮, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৩১শে মে—বারবার দুর্নীতির কালো থাবায় ও মানব পাচারের অভিযোগে এই বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়।

বর্তমান সরকারের লক্ষ্য আগামী ৫ বছরে দেশের ১ কোটি বেকারের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা। এই বিশাল ও উচ্চাভিলাষী জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে মালয়েশিয়ার মতো কর্মবান্ধব ও উচ্চ বেতনের বাজারটিকে কোনোভাবেই হাতছাড়া করা যাবে না। মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় মালয়েশিয়ার আবহাওয়া, কাজের পরিবেশ ও বেতন-ভাতা এদেশের শ্রমিকদের জন্য অনেক বেশি মাননসই। বায়রা নেতৃবৃন্দের দাবি, রাষ্ট্র বা সরকারের চেয়ে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা ব্যবসায়ী গোষ্ঠী কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না। তাই ২১শে জুন দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যকার শীর্ষ বৈঠকের মাধ্যমে সমস্ত কালো হাত গুঁড়িয়ে দিয়ে দেশের সকল বৈধ এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ বা ‘ওপেন মার্কেট’ নিশ্চিত করা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা করছেন দেশের কোটি সাধারণ মানুষ ও রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।

তথ্যসূত্র: মানবজমিন


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category