গত দেড় মাসে সারা দেশে হাম এবং হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে প্রায় তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, এই মৃতদের তালিকায় সংখ্যাগরিষ্ঠই হলো কোমলমতি শিশু। একটি দেশে যেখানে হাম প্রায় নির্মূলের পথে চলে গিয়েছিল, সেখানে হঠাৎ করে এই বিপুল সংখ্যক শিশুর মৃত্যু পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি স্পর্শকাতর জায়গায় প্রশাসনিক অদূরদর্শিতা এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের টানাপোড়েন কীভাবে সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শিশুদের জীবনের জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, চলমান এই হামের প্রাদুর্ভাব তারই একটি জ্বলন্ত ও মর্মান্তিক উদাহরণ। দেশে হামের এই ভয়াবহ বিস্তারের পর বর্তমানে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার মুখে পড়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের টিকা কেনা ও সংগ্রহের ইস্যুটি।
বাংলাদেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) একসময় সারা বিশ্বে একটি রোল মডেল হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু দেশব্যাপী হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব আমাদের সামনে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন, হতাশাজনক ও চরম অব্যবস্থাপনার চিত্র তুলে ধরেছে। এত বড় একটি সাফল্যের পর হঠাৎ কেন এই পতন, তা নিয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তা এবং বর্তমান সরকারের মধ্যে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, মূলত টিকাদান কর্মসূচির ধারাবাহিকতা অব্যাহত না থাকা এবং টিকা কেনার ক্ষেত্রে সচরাচর ও পরীক্ষিত পদ্ধতি অবলম্বন না করে নতুন পদ্ধতির পরীক্ষানিরীক্ষাই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির মূল কারণ।
১৯৮৫ সালে দেশব্যাপী শিশুদের প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষার জন্য শুরু হয়েছিল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি বা ইপিআই। এই যুগান্তকারী কর্মসূচির অধীনে বর্তমানে দেশের শিশুদের ১২টি মারাত্মক রোগের প্রতিরোধে ১০টি টিকা প্রদান করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যান এবং স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ইপিআই কর্মসূচি শুরু হওয়ার আগে রোগাক্রান্ত হয়ে প্রতি হাজারে শিশু মৃত্যুর হার ছিল ১৫১ জন। ধারাবাহিক ও সফল টিকাদান কর্মসূচির ফলে এই মৃত্যুহার অবিশ্বাস্যভাবে কমে ২০২৪ সালে এসে দাঁড়িয়েছিল মাত্র ২১ জনে। অর্থাৎ, এই কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের কারণে দেশে শিশু মৃত্যুর হার ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল।
টিকাদানে বাংলাদেশ যখন বিশ্বের অনেক উন্নয়নশীল দেশের কাছে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত, ঠিক তখনই হামের মতো একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের এমন মারাত্মক বিস্তার জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের মতো একটি নিরবচ্ছিন্ন প্রক্রিয়ায় সামান্য ছেদ পড়লেই তার পরিণতি হয় ভয়াবহ, আর বাংলাদেশ এখন সেই ছেদ পড়ারই চরম মাশুল গুনছে।
হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাব এক দিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে রয়েছে গত কয়েক বছরের ধারাবাহিক গাফিলতি এবং কর্মসূচির ছন্দপতন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, ২০২০ সালে বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে হামের টিকার ক্যাম্পেইন স্থগিত করতে বাধ্য হয় সরকার। এরপর ওই একই বছরের ডিসেম্বরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে পুনরায় এই টিকা কর্মসূচি চালু করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতি চার বছর পরপর দেশব্যাপী শিশুদের জন্য হামের টিকার এই বিশেষ ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেই হিসেবে ২০২৪ কিংবা ২০২৫ সালে অত্যন্ত জোরালোভাবে হামের টিকার ক্যাম্পেইন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৪ সালে নির্ধারিত টিকা কর্মসূচি আয়োজনের কথা থাকলেও দেশব্যাপী চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পটপরিবর্তনের কারণে তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ওই বছরের আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর স্বাস্থ্য খাতের অন্যান্য দিকে নজর দিলেও এই অত্যন্ত জরুরি টিকা কর্মসূচির বিষয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে লাখ লাখ শিশু তাদের প্রাপ্য ও জীবনরক্ষাকারী টিকা থেকে বঞ্চিত হতে থাকে।
টিকা সংকটের মূল কারণ হিসেবে প্রশাসনিক কাঠামোর আকস্মিক পরিবর্তনকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি সেক্টর কর্মসূচি (এইচপিএনএসপি) প্রথম শুরু হয় ১৯৯৮ সালে। দীর্ঘ সময় ধরে এই কাঠামোর অধীনেই স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছিল। ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও জনসংখ্যা সেক্টর কর্মসূচি’র মেয়াদ শেষ হয়, যদিও এই কর্মসূচি মূলত আরও দুই বছর আগেই শেষ হওয়ার কথা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, ওই বছরের জুলাই মাস থেকে ‘পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচি’ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি।
এই সেক্টর কর্মসূচির আওতায় থাকা ‘অপারেশনাল প্ল্যান’ (ওপি)-এর মাধ্যমেই মূলত ইপিআই টিকাসহ প্রাইমারি হেলথ কেয়ার, কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার, পুষ্টি, কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল এবং হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি সেবা কার্যক্রমগুলো পরিচালিত হতো। কিন্তু ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে অন্তর্বর্তী সরকার হঠাৎ করেই এই দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। ওপি বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে সরাসরি প্রভাব পড়ে টিকাদান কর্মসূচিতে। ফলশ্রুতিতে, ২০২৪ সাল থেকেই দেশে পিসিভি, আইপিভি, পেন্টা ভ্যালেন্ট, এবং এমআর (হাম-রুবেলা) প্রভৃতিসহ শিশুদের প্রায় সবগুলো জীবনরক্ষাকারী টিকার তীব্র সংকট দেখা দেয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র থেকে জানা যায়, পূর্ববর্তী সেক্টর কর্মসূচিগুলোতে অর্থায়নের সিংহভাগ আসত বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। কিন্তু পরবর্তীকালে এই অর্থায়নের পরিমাণ কমতে শুরু করে। এর ফলে সেক্টর কর্মসূচির ব্যয়ভার ধীরে ধীরে দেশীয় অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এই যুক্তি দেখিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার পঞ্চম সেক্টর কর্মসূচির অনুমোদন না দিয়ে অপারেশনাল প্ল্যানগুলো সম্পূর্ণ বাতিল করে দেয়। ওই সময়ে সেক্টর ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রকল্পভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। গত বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তৎকালীন উপসচিব শিরিন আকতারের সই করা এক চিঠিতে এই সেক্টর কর্মসূচির বিকল্প পরিকল্পনার কথা প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়।
পরবর্তীতে, একই বছরের ৬ মার্চ সেক্টর পরিকল্পনা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে অপারেশনাল প্ল্যানের (ওপি) কাজগুলোকে মূল রাজস্ব কাঠামোতে নিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হয়। এর আওতায় জনবল, ওষুধ, এমএসআর, টিকা, জরুরি পরিবার পরিকল্পনা পরিষেবা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, যানবাহন রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি ইত্যাদি অপরিহার্য বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিচালন বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়। কিন্তু এই আমলাতান্ত্রিক রূপান্তরের মাঝেই আটকে যায় শিশুদের টিকা।
টিকাদান একটি চলমান প্রক্রিয়া, এখানে শূন্যতার কোনো সুযোগ নেই। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, রুটিন টিকার নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর একটি প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। এতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রস্তাবিত টিকার অর্ধেক সংগ্রহ করার এবং বাকি অর্ধেক উন্মুক্ত দরপত্র বা টেন্ডারের মাধ্যমে কেনার জন্য প্রশাসনিক অনুমোদনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু এই অর্ধেক টিকা কেনার চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগেই অন্তর্বর্তী সরকার সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যা পুরো প্রক্রিয়াকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়।
টিকা কেনার এই প্রক্রিয়াটি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় কীভাবে বিলম্বিত হয়েছে, তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। এই টিকা কেনার জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রথম চিঠি দেওয়া হয় ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট। এরপর অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি তাতে নীতিগত অনুমোদন দেয় এবং মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয় ২২ সেপ্টেম্বর।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের টিকা ইউনিসেফের মাধ্যমে সংগ্রহের লক্ষ্যে ৪১৯ কোটি ৯৭ লাখ টাকা সরাসরি ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ দিয়ে সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদন প্রদান করে ২৪ নভেম্বর। এই অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছিল ২৯ অক্টোবর। এরপর স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে চূড়ান্ত অনুমোদন সংক্রান্ত চিঠি ইস্যু করা হয় ৭ ডিসেম্বর। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর অর্থ ছাড়ের জন্য অর্থ বিভাগ অনুমোদন দেয় ১৪ জানুয়ারি। সবশেষে সেই অর্থ ইউনিসেফের কাছে অগ্রিম পরিশোধ করার জন্য ২০ জানুয়ারি চিঠি দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, সহজ কথায় বলতে গেলে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাস থেকে টিকা কেনার প্রক্রিয়া শুরু হলেও এর চূড়ান্ত অর্থ ছাড় করে ইউনিসেফকে দিতে সময় লেগে যায় পাক্কা পাঁচ মাস। এই পাঁচ মাসের প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার সময়েই সারা দেশে হামের বিস্তার নীরবে মারাত্মক আকার ধারণ করতে শুরু করে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুরো পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশন প্ল্যান সম্পর্কে এক ধরনের নেতিবাচক ধারণা ছিল। স্বাস্থ্য খাতের সব কিছু কেন একটিমাত্র প্ল্যানের অধীনে থাকবে, তা নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। এর ফলেই সেখান থেকে বেরিয়ে এসে খাতভিত্তিক অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিকল্পনা গ্রহণের নতুন সিদ্ধান্ত হয়। সেক্টর কর্মসূচি বাতিলের কারণে টিকাদানের মতো জায়গায় যেখানে সরাসরি ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা ছিল, সেখানে আরডিপিপি সংক্ষিপ্ত করে দুই বছরের জন্য ডিপিপি তৈরি করতে বলা হয়। কিন্তু মুশকিল হলো, যখন এই নির্দেশনা দেওয়া হয়, ততদিনে মূল্যবান সাতটি মাস পার হয়ে গেছে। সেক্টর কর্মসূচিতে প্রতিবছর আলাদা আলাদা পরিকল্পনা হয়, চাইলেই রাতারাতি সংক্ষেপে তা করা সম্ভব ছিল না। আবার নতুন করে পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প তৈরি করার মতো সময়ও হাতে ছিল না। এই উভয়সংকটের মধ্যেই দুই বছরের জন্য ডিপিপি প্রস্তুত করে তড়িঘড়ি করে সেক্টর কর্মসূচি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।”
তিনি আরও জানান, নতুন সিদ্ধান্ত ছিল প্রতিটি সেক্টরের জন্য আলাদা আলাদা প্রকল্প গ্রহণ করা। কিন্তু একটি নতুন প্রকল্প তৈরি করে, সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে, যাচাই-বাছাই শেষে চূড়ান্ত অনুমোদন করানো একটি অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ বিষয়। এই সময়ের অপচয়ই শিশুদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা কেনার এই নতুন পদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকেও চরম উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, ইউনিসেফ বারবার সতর্ক করার পরেও তৎকালীন সরকার গ্লোবাল ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের (গ্যাভি) মাধ্যমে হাম-রুবেলার টিকা কেনা স্থগিত করেছিল। সরকার চেয়েছিল উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে এই টিকা কিনতে। কিন্তু দরপত্রের দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় পুরো বিষয়টি আটকে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এর এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো সামনে আনা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, পরবর্তীকালে এই টিকার অভাবেই বাংলাদেশে হামের এমন ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে। সায়েন্স-এর ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে ইউনিসেফ অত্যন্ত সফলভাবে বাংলাদেশে এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল। বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব তহবিলের পাশাপাশি এর একটি বড় অংশের অর্থায়ন করত গ্যাভি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ‘টিকা কেনা বন্ধ’ করে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করার সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারের এই হঠকারী সিদ্ধান্তে তীব্র আপত্তি জানিয়েছিল খোদ ইউনিসেফ।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স সে সময় সরকারকে কড়া ভাষায় সতর্ক করে বলেছিলেন, “উন্মুক্ত দরপত্রে প্রক্রিয়া শেষ করে টিকা পেতে অনেক বেশি সময় লাগবে। এর ফলে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হলে দেশে মহামারি বা প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকে বারবার সতর্ক করার স্মৃতিচারণ করে রানা ফ্লাওয়ার্স সায়েন্স সাময়িকীকে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, “আমি তাকে স্পষ্টভাবে বলেছিলাম– সৃষ্টিকর্তার দোহাই লাগে, এই কাজটি আপনারা করবেন না।” তিনি আরও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কেন সে সময় হঠাৎ করে এত ভালো একটি ক্রয় প্রক্রিয়া পরিবর্তন করা হয়েছিল, তার একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার।”
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রসঙ্গের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইউনিসেফের সাথে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়, ফলে তার কোনো বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
সায়েন্স সাময়িকীর এই বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, যিনি সেই সময়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নীতি নির্ধারণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন— তিনি একটি ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন। তিনি দাবি করেছেন যে, টিকা কেনার ক্ষেত্রে কোনো পদ্ধতি অন্তর্বর্তী সরকার পরিবর্তন করেনি, বরং যা করা হয়েছে তা আইনের গণ্ডির ভেতরে থেকেই করা হয়েছে।
তিনি তার ব্যাখ্যায় বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে টিকা ক্রয় প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পরিবর্তন প্রয়োগ করা হয়নি। বিধি অনুযায়ী, সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে কোনো কিছু ক্রয় করার ক্ষেত্রে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬’ কঠোরভাবে অনুসরণ করার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে।”
তিনি আরও দাবি করেন যে, যেহেতু ইপিআই একটি নিয়মিত এবং রুটিন কর্মসূচি, তাই প্রতি বছর ‘জরুরি ধারা’ বা ইমার্জেন্সি ক্লজ ব্যবহার করে এটি চালানো কোনোভাবেই প্রশাসনিকভাবে সঠিক নয়। এই বিবেচনায় টিকার আন্তর্জাতিক বাজার অনানুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করে রাষ্ট্রীয় অর্থ সংস্থানের প্রাথমিক সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়। এমতাবস্থায় প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে টিকা ক্রয়ের সম্ভাবনা এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সরাসরি টিকা ক্রয়ের নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন করা সরকারের কাছে প্রয়োজনীয় বলেই প্রতীয়মান হয়েছিল।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে পরিবর্তিত কোনো পদ্ধতিতে ইপিআই’র টিকা কেনা হয়নি বলে জোরালো দাবি করে ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, “২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরকারের টিকা কেনা বন্ধ করা হয়েছে বলে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে যা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। এর প্রমাণ হলো, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই ইউনিসেফের কাছ থেকে প্রি-ফাইন্যান্সিং বা প্রাক-অর্থায়ন সহায়তার মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মূল্য বাংলাদেশ সরকার পরবর্তীকালে পরিশোধ করেছে।”
তবে সাবেক সরকারের এই ব্যাখ্যার সঙ্গে কোনোভাবেই একমত নয় বর্তমান সরকার। হামের এই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবের মাঝে টিকা সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এবং তার আগের আওয়ামী লীগ সরকারকে সরাসরি দোষারোপ করেছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, “পূর্ববর্তী সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের চরম অবহেলা এবং ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই শিশুদের জন্য সময়মতো প্রয়োজনীয় টিকা আনা সম্ভব হয়নি। আর তাদের এই ব্যর্থতার অমার্জনীয় ফলশ্রুতিতেই আজ দেশের এতগুলো কোমলমতি শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।” সম্প্রতি হাম-রুবেলা টিকার একটি বিশেষ ক্যাম্পেইন উদ্বোধনকালে তিনি আরও বলেন, “কেবলমাত্র কিছু মানুষের ব্যক্তিগত গাফিলতি এবং প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার কারণে একটি সফল টিকাদান কার্যক্রম চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব আজ দেশের শিশুস্বাস্থ্যে পড়েছে।”
নতুন সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেনও একইভাবে আগের সরকারগুলোর সমালোচনা করে তাদের দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, “টিকা কেনা ও সংগ্রহের ক্ষেত্রে পূর্ববর্তী সরকারের চরম অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই মূলত দেশে টিকার মজুতে এই ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে শুধু হামের টিকাই নয়, বরং শিশুদের জীবনরক্ষাকারী আরও ছয় ধরনের টিকার তীব্র অভাব দেখা দেয়, যার কারণে আজকের এই জাতীয় সংকট তৈরি হয়েছে।”
অন্যদিকে, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের বর্তমান সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী অবশ্য টিকা কেনার এই দীর্ঘ প্রশাসনিক বিলম্বের পাশাপাশি আরও কয়েকটি পারিপার্শ্বিক কারণ তুলে ধরেছেন। তার মতে, “করোনাকালে এবং তার ঠিক পরবর্তী সময়ে আমাদের মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা তাদের বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে একসময় ছোট ছোট আন্দোলন করেছিলেন এবং কর্মবিরতি পালন করেছিলেন। সেই সময়েও আমাদের টিকার কিছু সংকট তৈরি হয়েছিল। এই বহুমুখী সংকটের মধ্যে আবার কিছু মায়েরা হয়তো তাদের শিশুদের নিয়ে ঠিক সেদিনই টিকাকেন্দ্রে এসেছিলেন, যেদিন স্বাস্থ্যকর্মীদের কর্মবিরতি চলছিল। হতাশ হয়ে ফিরে যাওয়ার পর ওই মায়েরা হয়তো আর পুনরায় কেন্দ্রে আসেননি। এসব বিবিধ কারণে মাঠপর্যায়ে টিকাদানে কিছু জায়গায় বড় ধরনের শূন্যতা বা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। আমাদের প্রাথমিক তদন্ত (প্রাইমারি ইনভেস্টিগেশন) বলছে যে, মূলত ওই গ্যাপগুলোর কারণেই সমাজে এত দ্রুত হাম ছড়িয়ে পড়েছে।” তবে তিনিও স্বীকার করেন যে, “নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম যদি কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়ে অব্যাহত থাকত, তাহলে আজকের এই করুণ পরিস্থিতির সৃষ্টি কোনোভাবেই হতো না।”
হামের প্রাদুর্ভাবের প্রকৃত কারণ খুঁজতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা কেবল প্রশাসনিক বিলম্বকেই একমাত্র কারণ মানতে নারাজ, তারা এখানে ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতাকে বড় করে দেখছেন। ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনার বৈশ্বিক জোট গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের (গ্যাভি) সিএসও স্টিয়ারিং কমিটির চেয়ার ও বিশিষ্ট জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. নিজাম উদ্দীন আহম্মেদ পুরো পরিস্থিতির একটি বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন।
তিনি বলেন, “বর্তমানে ভ্যাকসিনের যে মারাত্মক ক্রাইসিস আমরা দেখছি এবং আজ দেশজুড়ে যে আউটব্রেক বা প্রাদুর্ভাব হচ্ছে, তার মানে এটি হঠাৎ করে এক দিনে হয়নি বা এক বছরের মধ্যেও তৈরি হয়নি। এটি হলো একটি কিউমুলেটিভ বা ক্রমাগত পুঞ্জীভূত প্রক্রিয়া। যে শিশুটি গত কয়েক বছরে টিকা পায়নি, সেই সংখ্যাটি ধীরে ধীরে বাড়তে বাড়তে এখন ১০ থেকে ২০ লাখ পার হয়ে গেছে। বিপুল সংখ্যক অরক্ষিত শিশুর এই মজুতটাই মূলত হামের প্রাদুর্ভাবের প্রধান ও সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, “হামের টিকার জাতীয় কাভারেজ বাংলাদেশে কখনোই ৮০ ভাগের ওপরে পৌঁছায়নি। বিজ্ঞানের ভাষায়, আমরা যদি টিকাদানের ক্ষেত্রে ৯৫ পারসেন্ট লেভেলে বা স্তরে পৌঁছাতে না পারি, তাহলে সমাজে ইমিউনিটি এবং হার্ড ইমিউনিটি (গোষ্ঠীগত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) কোনোভাবেই তৈরি হবে না। এর পাশাপাশি এখন যেগুলো নিয়ে সবাই সবচেয়ে বেশি আলোচনা করছে— যেমন ‘লজিস্টিক ইস্যু’, ‘ম্যানেজমেন্ট ইস্যু’, কিংবা ভ্যাকসিন সাপ্লাই ছিল কি না— সেই প্রশ্নগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক। এটা সত্যি যে টিকার সাপ্লাই গত বছরের অক্টোবরে ইন্টারাপ্টেড বা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু এটাও সত্যি যে ভ্যাকসিন কেনার জন্য সরকার প্রয়োজনীয় টাকার জোগান দিয়েছে। সেই টাকা দিয়ে টিকা হয়তো কিনতে বা আমলাতান্ত্রিক কারণে হাতে পেতে দেরি হয়েছে।”
স্বাস্থ্য খাতের লিডারশিপ বা নেতৃত্বের জায়গায় আমূল উন্নতি হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, “আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে, এটি কেবল একটি পলিটিক্যাল বা রাজনৈতিক ইস্যু। এটি পুরোটাই ম্যানেজমেন্ট এবং ম্যানেজমেন্ট ইনফিশিয়েন্সি (ব্যবস্থাপনাগত অদক্ষতা) ইস্যু। কারণ হলো, ওই সময়ে প্রশাসনে যারা নতুন দায়িত্ব নিয়ে এসেছিলেন, তারা হয়তো অনেকেই স্বাস্থ্য খাতের মতো একটি জটিল জায়গার এই জিনিসটা ঠিকমতো বুঝতেই পারেননি যে, এর গুরুত্বটা ঠিক কতখানি এবং টিকা সরবরাহে এক দিনের বিলম্বও কত বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।”
পরিশেষে এটি বলা যায় যে, সরকার পরিবর্তন, নীতিগত পরীক্ষানিরীক্ষা এবং আমলাতান্ত্রিক ফাইলের নিচে চাপা পড়ে যে সময়টুকু হারিয়ে গেছে, সেই সময়ের মূল্য চোকাতে হয়েছে দেশের শত শত পরিবারকে তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ— সন্তানের জীবনের বিনিময়ে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্য খাতের মতো জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী কার্যক্রমে যেন কোনো ধরনের পরীক্ষানিরীক্ষা বা আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা স্থান না পায়, হামের এই প্রাদুর্ভাব রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের জন্য সেই কঠোর বার্তাই দিয়ে গেল।