আহা! কী সুন্দর ফুটে উঠে মাতৃভূমি হারানোর কষ্ট।
‘ হোয়েন দ্য উইকড
ক্যারিড আস এয়ো ইন ক্যাপটিভিটি ,
রিকোয়ার্ড ফ্রম আস আ সং।
নাউ হাউ শ্যাল উই সিঙ
দা লর্ড’স সঙ
ইন আ স্ট্রেঞ্জ ল্যান্ড?’
“যখন দুষ্ট আত্মা আমাদের বেঁধেছে শিকলে,
আর শুনতে চাইছে আমাদের গান,
আমরা কীভাবে এ অপরিচিত দেশে ঈশ্বরের গান গাই?”
পলিন যখন রাতের সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে একমনে গায় তখন মনে হয় ১৯৭০ সালে ব্রেন্ট ডো আর ট্রেভর ম্যাকনাটন রোহিঙ্গাদের নিয়েই গানটি লিখেছিলেন।
চতুর্থ দিন আমার শরীর খারাপ করলো। জ্বর জ্বর ভাব। মনে হয় দীর্ঘ সময় রাতে সমুদ্রের তীরে নভেম্বরের ঠান্ডায় বসে থাকার ফল। আমি পলিনকে জিজ্ঞেস করলাম, “‘আজ যদি আমি না যাই তোমার কী সমস্যা হবে। অবশ্য তরুণ ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন, আর স্থানীয় চেয়ারম্যান তো আছেনই।”
পলিন জানালো তার কোনো সমস্যাই হবে না, বরং আমার রেস্ট নেওয়াই উচিত। তবে পরিচিত দুষ্টামির হাসি হেসে বলল, তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত জ্বরকে থাকার অনুমতি দেওয়া হলো। তারপর তাকে বিদায় দেবে। রাতে পুরুষ মানুষের অসুস্থতা মানায় না, হাহাহাহা, ক্লিয়ার মিস্টার ড্যানিয়েল ক্রেইগ।”
আমি অবাক হয়ে বললাম, “ড্যানিয়েল ক্রেইগ?”
“হাহাহাহা। গায়ের রঙ মিলালে তোমাকে বরং ড্যানজেল ওয়াশিংটন ডাকা উচিত। কিন্তু আমার যে ক্রেইগকে ভালো লাগে। জেমস বন্ডের চরিত্রে ওর চাইতে বেশি আর কাউকে মানিয়েছে বলে আমার মনে হয় না। আমরা ভালো বন্ধু অ্যান্ড আই গ্যারান্টি ছবিতে তোমরা ওকে যেরকম দেখো বাস্তবে তারচে সে অনেক বেশি এমেইজিং অ্যান্ড হি নোজ দা আর্ট—- হাহাহাহাহা। সেদিক দিয়ে তুমি হচ্ছো নিরামিষ। গেরুয়া পরা হিউস্টন মেমোরিয়াল পার্কে কীর্তন গাওয়া সন্ন্যাসী। হাহাহাহা।”
“তুমি কীর্তন শুনেছো?”
“আমি একজন অভিনেত্রী। ফ্লপ মারলেও অভিনেত্রী। বলা যায় না আবার পর্দা ফাটিয়ে ফেরতও আসতে পারি। আমাদের সব জানতে হয় মিস্টার ড্যানিয়েল—– কথা শেষ না করেই সে লাফ দিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো।
সেদিন ফিরে আসার পরও একই চেহারা। সকালের উচ্ছ্বাস হারিয়ে গেছে। চোখের তারায় ঘন কান্না। নিঃশ্বাসে বেদনা।
রাতে ডিনারের আগে ‘রয়্যাল ব্লু’ নিয়ে বুঁদ হয়ে থাকা। বনি এম এর বিষণ্ন গান।
এভাবেই কেটে গেল ছয়টি দিন। পরদিন ও চলে যাবে।
আগের দিন সন্ধ্যায় আমরা খোলা বিচে বসলাম। একদম সমুদ্রের কাছে। ঢেউ এসে মাঝে মাঝে পা ছুঁয়ে যাওয়ার অবস্থা। সেখানে আলাদা টেবিল বসানো হয়েছে। তার উপর জ্বলছে দুটো হারিক্যান। বাতাসের ধাক্কায় মাঝে মাঝে চিমনির ভেতরের শিখা কাঁপছে। মাথার উপর পূর্ণ চাঁদ। তার আলোয় পুরো বঙ্গোপসাগর চকচক করছে। মনে হচ্ছে কেউ যেন সাগরের জলে পারদ ছড়িয়ে দিয়েছে। মাঝে মাঝে ঝিলিক দিচ্ছে ফসফরাস।
খাবার মেনু কিন্তু সিম্পল। আমি পড়েছি এক ফুড ফোবিয়াকের কবলে। সালাদ, রূপচাঁদা ভাজা, আর আমার জোরাজুরিতে দুটো মাঝারি সাইজের লবস্টার। পলিন এর মধ্যে যোগ করেছে ভিন্টেজ পোর্ট ওয়াইন ‘টেইলর’। বিশ বছরের পুরানো। ওপেনার দিয়ে কর্ক খুলতে খুলতে সে বললো, “টু সেলিব্রেইট আওয়ার ফ্রেন্ডশিপ।”
তারপর বোতলের কর্ক হুশ করে উপরে উড়ে গেলো, ফোঁস করে ভেতরের তরল বুদবুদ হয়ে লাফ দিল।
পলিন দুটো গ্লাসে তা ঢালতে ঢালতে বলল, ভয় নেই, মাতাল হবে না। এটাকে ‘ডেজার্ট’ ওয়াইনও বলা হয়। অ্যালকোহল নেই বললেই চলে। ব্রিটেনের প্রথম প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম পিট এটা আর্থাইটিসের চিকিৎসার জন্য খেতেন। সো ডোন্ট ওরি, ডিয়ার হ্যান্ডসাম।”
আজ তাকে উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। সম্ভবত সাতদিনের রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার চাপ শেষ হতে যাচ্ছে বলে।
‘বনি এম’ এর ‘বাই দা রিভার অব ব্যাবিলন’ এর বদলে আজ নিজের মনে গাইছে ‘ডরিস বে’ এর গান ধরলো,
We were sailing along on Moonlight Bay
We could hear the voices ringing
They seemed to say, “You have stolen her heart
“আমরা উড়িয়েছি পাল জ্যোৎস্নার স্রোতে
আমরা শুনছি রিনিঝিনি নূপুর ধ্বনি।
এ ঝংকার বলছে,
তুমি তার হৃদয় লুটে নিয়েছো”