• রবিবার, ১৭ মে ২০২৬, ১২:৪০ পূর্বাহ্ন
Headline
পায়ের নিচে পৃথিবী বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড সুপার এল নিনোর ছায়া ও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনা: চরম ভাবাপন্ন আবহাওয়ার ঝুঁকিতে বাংলাদেশ নাইজেরিয়ায় স্কুলে বন্দুকধারীদের তাণ্ডব: ক্লাস চলাকালে বহু শিক্ষার্থী অপহরণ হরমুজ প্রণালী নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে ইরানের তীব্র ক্ষোভ, বিশ্ববাসীকে ‘কঠোর বার্তা’ তেহরানের ট্রাম্প ফিরতেই বেইজিং যাচ্ছেন পুতিন: দুই পরাশক্তির বৈঠকে নজর বিশ্ব মহলের নগরের দায়িত্ব পেলে নাগরিক সেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবো: সাদিক কায়েম আস্থার চরম সংকটে দেশের আর্থিক খাত: ৬৬% ব্যাংকই দুর্বল, আসল টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে শঙ্কা নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের দল ঘোষণা পাকিস্তানের, পাঁচ নতুনের অভিষেক বিসিবির অ্যাডহক কমিটি বাতিলের দাবিতে এবার বুলবুল-ফারুকদের রিট

বিদ্যুৎ সঞ্চালনে ধারাবাহিক লোকসান: ঋণ ৬০ হাজার কোটি, সংকটে পাওয়ার গ্রিড

Reporter Name / ৫ Time View
Update : শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬

সক্ষমতা থাকলেও মিলছে না বিদ্যুৎ, অথচ গুনতে হচ্ছে ঋণের কিস্তি আর বিশাল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়। দেশের একমাত্র বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা ‘পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ’ এখন ঋণের এক বিশাল চোরাবালিতে আটকে গেছে। সঞ্চালন খাতের বিভিন্ন মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংস্থাটির ঋণের দায় বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকায়। বিপুল ঋণের সুদ এবং ধারাবাহিক লোকসানের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে প্রতিষ্ঠানটি এখন আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর ঋণ পরিশোধে অক্ষমতার কথা প্রকাশ করতে শুরু করেছে।

পাওয়ার গ্রিডের সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে এই সংকট এতটাই তীব্র যে, দ্রুত বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন না এলে দেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে।

পাহাড়সম ঋণ ও মেগা প্রকল্পের ফাঁদ

পাওয়ার গ্রিড সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার লক্ষ্যে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন সংস্থার ঋণে সঞ্চালন লাইন ও সাবস্টেশন নির্মাণ করে আসছে সংস্থাটি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সঞ্চালন লাইন, পটুয়াখালী-গোপালগঞ্জ, আমিনবাজার-গোপালগঞ্জ, দিনাজপুর ও গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মতো দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনগুলো বিপুল ঋণ নিয়েই তৈরি করা হয়েছে।

গত বছরের জুন পর্যন্ত কোম্পানিটির দীর্ঘমেয়াদী মেয়াদি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। বর্তমানে সংস্থাটির প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ডজন খানেরও বেশি (১৪টি) প্রকল্প চলমান রয়েছে। এর ওপর ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার (ডলারের দাম) বৃদ্ধিজনিত কারণে সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৩ হাজার ৮৪৩ কোটি টাকা।

৩০ হাজার মেগাওয়াটের সক্ষমতা, কিন্তু বেশির ভাগই অলস

সংস্থার কোম্পানি সচিব মো. জাহাঙ্গীর আজাদ এক হতাশাজনক তথ্যচিত্র তুলে ধরে বলেন, “পাওয়ার গ্রিড বর্তমানে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিশাল সক্ষমতা তৈরি করেছে। কিন্তু দেশে সেই তুলনায় জেনারেশন বা উৎপাদন না হওয়ায় বেশির ভাগ সক্ষমতা আমাদের বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকলেও সাবস্টেশন ও লাইন রক্ষণাবেক্ষণ, বিপুল জনবলের বেতন এবং ঋণের সুদ কিন্তু নিয়মিতই পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে আমরা লোকসান থেকে বের হতে পারছি না।”

এ ছাড়া নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সঞ্চালন না হওয়ায় আয়ের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, শাহজিবাজার কিংবা ময়মনসিংহের আরপিসিএলের মতো গ্যাসভিত্তিক বড় কেন্দ্রগুলো নিয়মিত বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারেনি। ফলে বাধ্য হয়ে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, পটুয়াখালী বা রামপালের মতো দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে ঢাকায় বিদ্যুৎ আনতে হচ্ছে। এতে সঞ্চালন লাইনে ‘ট্রান্সমিশন বা সিস্টেম লস’ অনেক বেড়ে গেছে, যা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর হিসাব অনুযায়ী ৩.৩১ শতাংশে পৌঁছেছে।

টানা লোকসানের খতিয়ান

পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৪৮৭ কোটি ৬৫ লাখ টাকা

গত তিন অর্থবছরের কর-পরবর্তী নিট লোকসানের চিত্র:

  • ২০২২-২৩ অর্থবছর: ৭১২ কোটি টাকা লোকসান

  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: ৬১১ কোটি টাকা লোকসান

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ২১১ কোটি টাকা লোকসান (এই অর্থবছরে ঋণের সুদের পেছনেই ব্যয় হয়েছে ১,৫০৭ কোটি টাকা এবং প্রশাসনিক ব্যয় ছিল ৯৪ কোটি টাকা)।

সংস্থার আর্থিক হিসাব বলছে, আগামী ২০২৫-২৬ থেকে ২০৩০-৩১ অর্থবছরের মধ্যে ডেট সার্ভিস লায়াবিলিটি (ডিএসএল) বা ঋণের আসল ও সুদের বকেয়ার পরিমাণ দাঁড়াবে ৩৫,৭৯৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে কর-পরবর্তী মুনাফা নূন্যতম ৩.৬৭ শতাংশ না হলে এই বকেয়া ও শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে।

বাঁচতে চায় ‘হুইলিং চার্জ’ বাড়িয়ে, গণশুনানি ২০ মে

এই মরণদশা থেকে বাঁচতে পাওয়ার গ্রিড এখন একমাত্র পথ দেখছে বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল বা ‘হুইলিং চার্জ’ বাড়ানো। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবদুর রশিদ খান বলেন, “গত কয়েক বছর হুইলিং চার্জ বৃদ্ধি করা হয়নি, অন্যদিকে প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। আমরা সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরে চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছি।”

আগামী ২০ মে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) এই বিষয়ে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। পাওয়ার গ্রিড ভোল্টেজ লেভেল অনুযায়ী ৩টি লেভেলে ট্যারিফ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে:

  • ২৩০ কেভি লেভেলে: বিদ্যমান ০.৩০৫৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪৮৩১ টাকা

  • ১৩২ কেভি লেভেলে: বিদ্যমান ০.৩০৮৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪৮৭৭ টাকা

  • ৩৩ কেভি লেভেলে: বিদ্যমান ০.৩১৪৪ টাকা থেকে বাড়িয়ে ০.৪৯৬৯ টাকা

গ্রাহক পর্যায়ে বাড়বে দাম, সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা

পাওয়ার গ্রিডের এই ঘাটতি মেটাতে যদি হুইলিং চার্জ বাড়ানো হয়, তবে তার চড়া মূল্য দিতে হবে সাধারণ গ্রাহকদের। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, “হুইলিং চার্জ অধিক হারে বাড়িয়ে আর্থিক ঘাটতি মেটালে তা বিদ্যুতের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ে বড় প্রভাব ফেলবে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে দাম বাড়িয়ে চাপ সৃষ্টি করবে।”

তিনি আরও যোগ করেন, “পরিকল্পনা অনুযায়ী যথাসময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও সেগুলোর সঠিক ব্যবহার না হলে বুঝতে হবে এখানে চরম অদক্ষতার মতো বিষয় রয়েছে। যেহেতু এই ঋণগুলোর বিপরীতে রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টি রয়েছে, তাই এর চূড়ান্ত দায় কিন্তু সরকারের ওপরই বর্তাবে।”

১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠার পর এ পর্যন্ত পাঁচবার সঞ্চালন ট্যারিফ পেয়েছে পাওয়ার গ্রিড। কিন্তু সমন্বয়হীন মেগা প্রকল্প আর অদূরদর্শী পরিকল্পনার খেসারত হিসেবে ২০২৬ সালে এসে দেশের এই একমাত্র সঞ্চালন লাইনের আর্থিক দেউলিয়াত্ব পুরো বিদ্যুৎ খাতকেই এক বড় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category